ডাক্তার হাত ধুতে বারান্দার চলে গেল।
খানসামা তার হাতে জল ঢেলে দিল। সেইসময় ডাক্তার তাকে বলল, তোমাদের তো বিবেক বলে কিছু নেই। একমুহূর্ত আমি নজর রাখিনি…এ যে কী যন্ত্রণা জান তো; উনি যে কি করে সহ্য করছেন ভেবে পাই না।
খানসামা বলল, প্রভু যীশু খৃস্টের দোহাই, বিছানার নিচে কিছু রাখা হোক!
মিতিশচিতে কালিচে-গাড়িটা থাকবার পরে প্রিন্স আন্দ্রু যখন তাকে কুটিরে নিয়ে যেতে বলল, তখনই সে প্রথম বুঝতে পারল সে কোথায় আছে, তার কি হয়েছে, সে আঘাত পেয়েছে এবং কেমন করে পেয়েছে। কুটিরে নিয়ে যাবার সময় সে আবার যন্ত্রণায় জ্ঞান হারায় পুনরায় জ্ঞান ফিরে পাবার পরে চা খেতে খেতে সব কথা তার নতুন করে মনে পড়ে গেল। একটা নতুন ধরনের চিন্তা এসে তার মনে সুখের ভরসা যোগাল। মনে হল, সুখের একটা নতুন উৎস সে খুঁজে পেয়েছে, আর সে সুখ সুভাষিতাবলির সঙ্গে জড়িত। সেইজন্যই একখানা বই সে চেয়েছে। পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দেবার সময় আবার সব গোলমাল হয়ে গেল। তৃতীয় বারের মতো যখন জ্ঞান ফিরে পেল তখন চারদিকে রাতের নিস্তব্ধতা। কাছাকাছি সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। বারান্দা থেকে একটা ঝিঁঝি ডেকে উঠল; রাস্তায় কে যেন চেঁচিয়ে গান করছে; টেবিলে, দেবমূর্তির উপরে ও দেয়ালে আরশুলাগুলো খসখস করে চলাফেরা করছে; বিছানার মাথার কাছে এবং পাশের মোমবাতিটাকে ঘিরে একটা বড় মাছি ফরফর করে উড়ছে; মোমবাতির পলতেটা পুড়ে গিয়ে ব্যাঙের ছাতার আকার নিয়েছে।
তার মনের অবস্থাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। একটি সুস্থ মানুষ সাধারণত একই সঙ্গে অসংখ্য বিষয় ভাবতে পারে, অনুভব করতে পারে, স্মরণ করতে পারে; কিন্তু দরকার হলে একটি চিন্তাধারাকে বেছে নিয়ে সমস্ত মনোযোগকে তার উপর নিবদ্ধ করার ক্ষমতাও সে রাখে। একটি সুস্থ মানুষ গভীরতম চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে একজন আগন্তুকের সঙ্গে দু-একটা ভদ্রতার কথা বলে আবার নিজের চিন্তায় ফিরে যেতে পারে। কিন্তু সে ব্যাপারে প্রিন্স আন্দ্রুর মনটা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তার মনের সব ক্ষমতাই আগের চাইতে বেশি সক্রিয় ও পরিচ্ছন্ন, কিন্তু সে ক্ষমতা কাজ করে তার ইচ্ছার বাইরে। একই সঙ্গে বহু বিচিত্র বিষয় নিয়ে সে ভাবতে পারে; কিন্তু কাজ করতে করতেই সহসা একটা অপ্রত্যাশিত ধারণা এমনভাবে তার মনে বাসা বাধে যে সেটাকে সরিয়ে দেবার কোনো শক্তিই তার থাকে না।
নিস্তব্ধ কুটিরের আধো অন্ধকারে শুয়ে রতপ্ত বিস্ফারিত চোখ মেলে সামনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ, এমন একটা নতুন সুখ আমার কাছে প্রকাশ পেয়েছে যা থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখা যায় না। সে সুখের আসন জড়বস্তুর বাইরে, সে সুখ একমাত্র আত্মার, সে সুখ ভালোবাসার। সব মানুষই তাকে বুঝতে পারে, কিন্তু তাকে সম্যক ধারণা করা, তার ব্যবস্থা করা একমাত্র ঈশ্বরের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু ঈশ্বরই বা কীভাবে সে বিধানের প্রয়োগ করলেন? আর কেনই বা ঈশ্বরপুত্র…?
সহসা তার চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল, প্রিন্স আন্দ্রু শুনতে পেল (সেটা বাস্তব না স্বপ্ন তা সে জানে না) একটা মৃদু ফিসফিস স্বর অনবরত তালে তালে বলছে পিতি-পিতি-পিতি, তারপর তিতি, তারপর আবার পিতি পিতি-পিতি, এবং আবার তি-তি। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, মুখের উপর, ঠিক মাঝখানটাতে সেই ফিসফিস শব্দের তালে তালে অতি সূক্ষ্ম সূচ ও ভাঙা কুঁচি দিয়ে একটা আশ্চর্য বায়বীয় কিছু গড়ে উঠেছে। মনে হল তাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে যাতে এই বায়বীয় জিনিসটা ভেঙে না পড়ে; কিন্তু তবু সেটা ভেঙে যেতে লাগল এবং সেই তালবদ্ধ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আবার ধীরে ধীরে গড়ে উঠল; প্রিন্স আন্দ্রু নিজের মনেই বলতে লাগল–সেটা বড় হচ্ছে, বড় হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে, বড় হচ্ছে। সেই ফিসফিসানি শুনতে শুনতে এবং সূচীশিল্পের গলা জিনিসটাকে দেখতে দেখতে সে চকিতে আরো দেখতে পেল মোমবাতিটাকে ঘিরে একটা লাল আলোর বৃত্ত, শুনতে পেল আরশোলাদের ফরফর শব্দ, এবং তার বালিশে মুখের উপর উড়ন্ত একটা মাছির গুনগুনানি। মাছিটা যতবার মুখের উপর পড়ছে ততবার সেখানটায় জ্বালা করছে, অথচ কী আশ্চর্য, মাছিটা সেই বায়বীয় জিনিসটাকে আঘাত করা সত্ত্বেও সেটা ভেঙে যাচ্ছে না। কিন্তু এসব ছাড়া আরো একটা বড় ব্যাপার সেখানে ছিল। দরজার কাছে একটা শাদামতো কিছু একটা স্কিনস্ক-এর মূর্তি; সেটাও তাকে পীড়া দিতে লাগল।
সে ভাবল, ওইতো টেবিলের উপর আমার শার্টটা, ওই তো আমার পা দুটো, ওই তো দরজা, কিন্তু ওটা অনবরত বড় হচ্ছে কেন, ছড়িয়ে পড়ছে কেন, আর কেনই বা পিতি-পিতি-পিতি আর তি-তি…? যথেষ্ট হয়েছে, দয়া করে চলে যাও! যন্ত্রণাকাতর গলায় প্রিন্স আন্দ্রু কাকে যেন মিনতি জানাল। আর সহসা চিন্তা ও অনুভূতিগুলি আবার তার মনের উপরে ভেসে উঠল বিশেষ স্পষ্টতায় ও শক্তিতে।
পরিষ্কারভাবে সে আবার ভাবল, হা-ভালোবাসা। কিন্তু সে ভালোবাসা নয় যা ভালোবাসে কোন কিছুর জন্য, গুণের জন্য, উদ্দেশ্যের জন্য, আর অন্য কোনো কারণের জন্য, কিন্তু সেই ভালোবাসা যা আমি–সুখের মুখে দাঁড়িয়ে–প্রথম জেনেছি যখন আমার শত্রুকে দেখেও তাকে ভালোবেসেছি। সেই ভালোবাসার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে যা আত্মারই একান্ত সত্তা, যার কোনো পাত্রের দরকার হয় না। সেই আনন্দের অনুভূতি আমি আবার লাভ করেছি। প্রতিবেশীকে ভালোবাসা, শত্রুকে ভালোবাসা, সব কিছুকে ভালোবাসা, তার সব আত্মপ্রকাশের মধ্যে ঈশ্বরকে ভালোবাসা। প্রিয়জনকে তুমি ভালোবাসতে পার মানবিক ভালোবাসা দিয়ে, কিন্তু শত্রুকে ভালোবাসা যায় একমাত্র ঐশ্বরিক ভালোবাসা দিয়ে। তাই তো শত্রুকে ভালোবেসে এত আনন্দ আমি পেয়েছি। তার কি হয়েছে? সে কি বেঁচে আছে…?
