সেদিন সকালে যেমুহূর্তে সে শুনেছে যে আহত প্রিন্স আন্দ্রু সেখানেই আছে তখনই সে স্থির করেছে তাকে দেখতে যাবে। কেন যাবে তা সে জানে না, তাকে দেখলে নিজে কষ্ট পাবে তাও জানে, তবু তার মনে হয়েছে যে দেখা করা দরকার।
রাতে তার সঙ্গে দেখা করার আশা নিয়েই সে সারাটা দিন কাটিয়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তটি যখন সমাগত তখন তার মন আশঙ্কায় ভরে উঠেছে-না জানি কি দেখবে। কীভাবে সে পঙ্গু হয়েছে? কতটা অক্ষত আছে। তার অবস্থাও কি অবিরাম আর্তনাদকারী অ্যাডজুটান্টের মতো? হ্যাঁ। ঠিক সেই রকমই হবে। কল্পনায় সে যেন তাকে মূর্তিমান আর্তনাদরূপেই দেখতে পেল। একটা দুর্বার আবেগে সামনে এগিয়ে গেল। অতি সাবধানে এক পা এক পা করে এগিয়ে হোট ঘরটার মাঝখানে পৌঁছে গেল। ঘরে একটা তল্পিও রয়েছে। আর একটি লোক–তিমোখিন-দেবমূর্তির নিচে বেঞ্চিটার এক কোণে শুয়ে আছে। অন্য দুজন–ডাক্তার ও খানসামা-শুয়ে আছে মেঝেতে।
উঠে বসে খানসামা ফিসফিস করে কি যেন বলল। আহত পায়ের ব্যথায় তিমোখিন জেগেই ছিল; শাদা সেমিজ, ড্রেসিং-জ্যাকেট ও রাত-টুপি পরা একটি মেয়ের বিচিত্র ছায়ামূর্তি দেখে সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। খানসামা ঘুম-ঘুম ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল, তুমি কি চাও? ব্যাপার কি? তখন নাতাশা দ্রুতপায়ে এক কোণে শুয়ে থাকা বস্তুটির দিকে এগিয়ে গেল। তাকে দেখতে মোটেই মানুষের মতো নয়, তবু সে তাকে দেখবেই। খানসামাকে পার হয়ে এগিয়ে গিয়ে মোমবাতির আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল দু হাত লেপের বাইরে রেখে প্রিন্স আন্দ্রুই শুয়ে আছে–ঠিক যেরকমটি সে তাকে অনেকবার দেখেছে।
সে আগেকার মতোই আছে, কিন্তু তার মুখের জ্বরতপ্ত বর্ণ, তার দিকে উসের সঙ্গে ফেরানো চোখের ঝিকিমিকি দৃষ্টি, বিশেষ করে শিশুর মতো নরম গলা তার মধ্যে এমন একটা নিষ্পাপ শিশুসুলভ ভাব ফুটিয়ে তুলেছে যা সে আগে কখনো দেখেনি। প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে এগিয়ে গিয়ে যৌবনসুলভ দ্রুত ও নমনীয় ভঙ্গিতে তার সামনে নতজানু হল।
প্রিন্স আন্দ্রু হেসে তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল।
.
অধ্যায়-৩২
বরদিনোর প্রান্তরে একটা অ্যাম্বুলেন্স ঘাঁটিতে আশ্রয় পাবার পরে প্রিন্স আন্দ্রুর সাতটা দিন কেটে গেছে। ডাক্তাররা বলেছিল, জ্বর-জ্বর ভাব ও আঘাতপ্রাপ্ত পাকস্থলীর প্রদাহের ফলে তার মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু সপ্তম দিনে সে বেশ মৌজ করে চা ও পাউরুটি খেল, আর ডাক্তারও দেখল যে তার শরীরের উত্তাপ নেমে গেছে। সকালেই তার জ্ঞানও ফিরে এসেছে। মস্কো ছাড়বার পরে প্রথম রাতটা বেশ গরমই ছিল, আর সেও ছিল একটা কালিচে-গাড়িতে কিন্তু মিতিশচিতে পৌঁছে আহত লোকটি নিজেই বলল, তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে একটু চা খেতে দেওয়া হোক। কুটির স্থানান্তরের দরুন যন্ত্রণায় সে আবার আর্তনাদ করতে লাগল; জ্ঞানও হারাল। শিবির-শয্যায় শুইয়ে দেবার পরে অনেকক্ষণ সে চোখ বুঝে চুপচাপ পড়ে রইল। তারপর চোখ মেলে ধীরে ধীরে বলল : আমার চা? প্রাত্যহিক জীবনের এই তুচ্ছ কথাটা তার মনে আছে দেখে ডাক্তার অবাক হয়ে গেল। প্রিন্স আন্দ্রুর নাড়ি দেখে অবস্থার উন্নতি হয়েছে বুঝতে পেরে ডাক্তার যেমন বিস্মিত হল, তেমনই অসন্তুষ্টও হল। অসন্তুষ্টির কারণ অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, রোগী যদি এখন মারা না যায় তাহলে পরে আরো অনেক বেশি কষ্ট পেয়ে মরবে। প্রিন্স আন্দ্রুর রেজিমেন্টের লাল-নাক মেজর তিমোখিন মস্কোতেই তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে; বরদিনের যুদ্ধে একটা পা আহত হওয়ায় সেও প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গেই চলেছে। তাদের সঙ্গে আছে একটি ডাক্তার, প্রিন্স আন্দ্রুর খানসামা, তার কোচয়ান ও দুটি আর্দালি।
প্রিন্স আন্দ্রুকে একটু চা দেওয়া হল। সাগ্রহে সেটা খেয়ে সে জ্বরো জ্বরো চোখে সামনের দিকে তাকাল; যেন কোনো কিছু মনে করতে ও বুঝতে চেষ্টা করছে।
আর চাই না। তিমোখিন কি এখানে আছেন? সে শুধাল।
তিমোখিন বেঞ্চিটা ধরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এল।
আমি এখানেই আছি ইয়োর এক্সেলেন্সি।
আপনার ঘাটা কেমন আছে?
আমার স্যার? ভালো আছে। আপনার অবস্থা কেমন?
প্রিন্স আন্দ্রু আবার কি যেন মনে করতে চেষ্টা করল।
একটা বই কি পাওয়া যাবে না? সে শুধাল।
কি বই?
সুভাষিতাবলী; আমার কাছে নেই।
ডাক্তার তাকে কথা দিল, একটা বই যোগাড় করে দেবে; তারপর সে কেমন আছে জানতে চাইল। প্রিন্স আন্দ্রু অনিচ্ছাসত্ত্বেও যথাযথভাবে সব প্রশ্নের জবাব দিল; তারপর একটা তাকিয়া দিতে বলল, কারণ বিছানায় শুয়ে সে আরাম পাচ্ছে না, কষ্ট বোধ হচ্ছে। যে আলখাল্লাটা দিয়ে তার শরীর ঢাকা ছিল ডাক্তার ও খানসামা সেটাকে তুলে দিল; ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে আসা পচা মাংসের দুর্গন্ধে মুখ বিকৃত করে তারা সেই ভয়ংকর জায়গাটা পরীক্ষা করতে লাগল। ডাক্তার খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে ড্রেসিংটা বদলে দিতে গিয়ে আহত লোকটিকে পাশ ফিরিয়ে দিল, আর তাতেই যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আর্তনাদ করতে করতে সে আবার অজ্ঞান হয়ে প্রলাপ বকতে শুরু করল। বার বার বলতে লাগল, বইটা এনে তার বিছানার নিচে রাখা হোক।
বলল, তাতে আপনাদের অসুবিধাটা কোথায়? বইটা আমার সঙ্গে নেই। দয়া করে একখানা বই এনে মুহূর্তের জন্য বিছানার নিচে রেখে দিন, সে করুণ সুরে অনুরোধ জানাল।
