সে বলল, দেখ নাতাশা, কী ভয়ংকরভাবে আগুন জ্বলছে!
কি জ্বলছে? নাতাশা শুধাল। ওঃ, হ্যাঁ, মস্কো।
সোনিয়া পাছে দুঃখ পায় তাই সে জানালার দিকে মুখটা ফেরাল, এমনভাবে মুখটা বাড়াল যে কিছুই দেখতে পেল না, তারপর আবার আগের মতোই বসে পড়ল।
কিন্তু তুমি কি কিছুই দেখলে না!
হ্যাঁ, ঠিক দেখেছি, নাতাশা জবাব দিল।
কাউন্টেস ও সোনিয়া দুজনই বুঝতে পারল যে এখন নাতাশার কাছে মস্কো, বা মস্কোর অগ্নিকাণ্ড, বা অন্য কোনো কিছুরই কোনো গুরুত্ব নেই।
কাউন্ট ফিরে এসে বেড়ার ওপাশে শুয়ে পড়ল। কাউন্টেস মেয়ের কাছে এগিয়ে গেল, তার অসুখ করলে যেরকম করে থাকে সেইভাবে হাতের পিঠটা দিয়ে নাতাশার মাথাটা স্পর্শ করল, জ্বর হয়েছে কি না বুঝবার জন্য তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল, শেষপর্যন্ত তাকে চুমো খেল।
বলল, তুমি যে ঠাণ্ডা হয়ে গেছ। তোমার সারা শরীর কাঁপছে। তুমি বরং শুয়ে পড় গে।
শুয়ে পড়ব? ঠিক আছে, শুয়ে পড়ব। এখনই শুয়ে পড়ব, নাতাশা বলল।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রিন্স আন্দ্রু তাদের দলের সঙ্গেই যাচ্ছে-সকালে একথা শোনার পরেই নাতাশার মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছিল : সে কোথায় যাচ্ছিল? কেমন করে আহত হল? আঘাত কি গুরুতর? সে কি তাকে একবার দেখতে পারে না? কিন্তু তাকে যখন বলা হল যে প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখতে পাবে না, তার আঘাত গুরুতর, কিন্তু জীবনের কোনো আশঙ্কা নেই, তখন সে প্রশ্ন করা ছেড়ে দিল, কথা বলা বন্ধ করল; অপরের কোনো কথাতেই তার বিশ্বাস নেই; তার ধারণা হল সে যত যাই বলুক ওই একই জবাব তাকে শুনতে হবে। সারা পথ সে গাড়ির এক কোণে চোখ বড় বড় করে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। মনে মনে সে একটা মতলব আঁটছে, একটা কিছু করার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে, অথবা নিয়ে ফেলেছে। কাউন্টেস মেয়ের হাবভাব ভালোই জানে; কিন্তু তার মতলবটা যে কি সেটা না জানায় আরো শঙ্কিত হয়ে যন্ত্রণা পেতে লাগল।
নাতাশা, লক্ষ্মী মেয়ে, পোশাক ছেড়ে ফেল; আমার বিছানায়ই শুয়ে পড়।
খাটে কেবল কাউন্টেসের জন্যই বিছানা পাতা হয়েছে। মাদাম শোস দুটি মেয়েকে নিয়ে মেঝেতে খড়ের উপর শোবে।
না মামণি, আমি এখানে মেঝেতেই শোব, বিরক্ত হয়ে জবাব দিয়ে নাতাশা জানালার কাছে গিয়ে সেটা খুলে দিল। খোলা জানালা দিয়ে অ্যাডজুটান্টটির আর্তনাদ আরো স্পষ্ট হয়ে কানে আসছে। রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে সে মাথাটা বাড়িয়ে দিল। কাউন্টেস দেখল, তার সরু গলাটা চাপা কান্নার আবেগে কাঁপছে, জানালার ফ্রেমের উপর দপ দপ করছে। নাতাশা জানে এ আর্তনাদ প্রিন্স আন্দ্রুর নয়; সে আছে তাদের একই উঠোনের মধ্যে বারান্দার ওপাশের একটা ঘরের একাংশে। কিন্তু এই অবিশ্রাম ভয়ংকর আর্তনাদ শুনে তার কান্না পাচ্ছে। কাউন্টেস ও সোনিয়া দৃষ্টি-বিনিময় করল।
আস্তে নাতাশার কাঁধে হাত রেখে কাউন্টেস বলল, শুয়ে পড় লক্ষ্মীটি; শুয়ে পড় সোনা। এস, শোবে এস।
ওঃ, হা…এখনই শুয়ে পড়ব, বলে নাতাশা তাড়াতাড়ি পোশাক ছাড়তে লাগল।
পোশাক ছেড়ে ড্রেসিং-জ্যাকেটটা পরে মেঝের বিছানায় বসে সে চুল বাঁধতে লাগল। অভ্যস্ত আঙুল চালিয়ে চুল বাঁধা শেষ করে সে খড়ের উপর পাতা চাদরের উপর শুয়ে পড়ল দরজার দিকটাতে।
সোনিয়া বলল, নাতাশা, তুমি বরং মাঝখানে শোও।
নাতাশা বলল, আমি এখানেই থাকব। তুমি শুয়ে পড়। সে বালিশে মুখ ঢাকল।
কাউন্টেস, মাদাম শোস এবং সোনিয়াও তাড়াতাড়ি পোশাক ছেড়ে শুয়ে পড়ল। দেবমূর্তির সামনেকার বাতিটাই ঘরের একমাত্র আলো। কিন্তু উঠোনে এসে পড়েছে মাইল দেড়েক দূরের হোট মিতিশচির আগুনের মালো; মামোনভের কত্সকরা পথের উপর যে মদের আড্ডা বসিয়েছে সেখান থেকে ভেসে আসছে লোকজনের হল্লার শব্দ; অ্যাডজুটান্টের অবিশ্রাম আর্তনাদ তখনো শোনা যাচ্ছে।
চুপচাপ শুয়ে থেকে নাতাশা ঘরের ভিতর-বাইরের সব শব্দই শুনতে লাগল। মার প্রার্থনা, দীর্ঘশ্বাস ও বিছানায় নড়াচড়ার শব্দ, মাদাম শোসের পরিচিত নাকডাকার শিস, আর সোনিয়ার মৃদু নিঃশ্বাস। কাউন্টেস একবার নাতাশাকে ডাকল। নাতাশা সাড়া দিল না।
মনে হচ্ছে ও ঘুমিয়ে পড়েছে মামণি, সোনিয়া বলল।
একটু চুপ করে থেকে কাউন্টেস আবার কথা বলল; এবার কেউ সাড়া দিল না।
তার একটু পরেই নাতাশা মার স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। তার হোট খালি পাটা লেপের ভিতর থেকে বেরিয়ে খালি মেঝেতে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, তবু নাতাশা একটুও নাড়ল না।
যেন সকলের উপর জয়লাভের উৎসব পালন করতে দেয়ালের ফাটলের ভিতর থেকে একটা ঝিঁঝি পোকা ডেকে উঠল। অনেক দূরে একটা কাক ডাকল, কাছে আর একটা কাক তাতে সাড়া দিল। মদের আড্ডার হৈচৈ থেমে গেছে, শুধু অ্যাডজুটান্টের আর্তনাদ এখনো শোনা যাচ্ছে। নাতাশা উঠে বসল।
সোনিয়া ঘুমিয়েছ? মামণি? সে ফিসফিস করে বলল। কেউ সাড়া দিল না। নাতাশা সাবধানে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, কুশ-চিহ্ন আঁকল, ঠাণ্ডা নোংরা মেঝেতে পা ফেলে সাবধানে হাঁটতে লাগল। বিড়ালছানার মতো পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে ঠাণ্ডা হাতলটা চেপে ধরল।
দরজা খুলে চৌকাঠ পেরিয়ে বারান্দার ঠাণ্ডা মাটির মেঝেতে পা ফেলল। বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেশ আরাম লাগছে। একটি ঘুমন্ত লোকের গায়ে পা লাগতেই সে তাকে ডিঙিয়ে গেল; কুটিরের যে অংশে প্রিন্স আন্দ্রু শুয়ে আছে সেদিককার দরজাটা খুলল। অন্ধকার। ঘরের এক কোণে বিছানায় কে যেন শুয়ে আছে; পাশের বেঞ্চিটার উপর একটা লম্বা ফিতেওয়ালা চর্বিবাতি ধিকিধিকি জ্বলছে।
