নতুন বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই অস্থির পদক্ষেপে ফটক ছেড়ে নিজের ঘরে চলে গেল; সোফায় শুয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল।
.
অধ্যায়-৩০
২ সেপ্টেম্বর যে প্রথম অগ্নিকাণ্ডটি শুরু হল, পলাতক মস্কোবাসীরা এবং পশ্চাদপসরণকারী সৈনিকরা ভিন্ন ভিন্ন পথ থেকে বিভিন্ন মনোভাব নিয়ে সেটা দেখতে দেখতে চলল।
রস্তভ পরিবার সে রাতটা কাটাল মস্কোর চোদ্দ মাইল দূরবর্তী মিতিশচিতে। ১লা সেপ্টেম্বর এত দেরি করে তারা যাত্রা করল, গাড়ি-ঘোড়া ও সৈন্যরা এমনভাবে পথঘাট আটকে রেখেছে, এতবেশি জিনিসপত্র ভুল করে ফেলে আসার দরুন চাকরদের আবার ফেরৎ পাঠাতে হল, তারা স্থির করল মস্কো থেকে তিন মাইল দূরের একটা জায়গায় রাত কাটাবে। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল দেরিতে, আর পথেও বারবার এমন বিলম্ব ঘটতে লাগল যে তারা মাত্র বড় মিতিশচি পর্যন্তই পৌঁছতে পারল। সেদিন সন্ধ্যা দশটায় রস্ত পরিবারের লোকজন এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণরত আহতদের সেই বড় গ্রামটার উঠোনে ও বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হল। রস্তভ পরিবারের চাকর ও কোচয়ান এবং আহত অফিসারদের আর্দালিরা মনিবদের সেবা-শুশ্রষা শেষ করে রাতের খাবার খেল, ঘোড়াগুলোকে দানাপানি দিল, তারপর বারান্দায় বেরিয়ে এল।
পার্শ্ববর্তী একটা কুটিয়ে ভাঙা কব্জি নিয়ে শুয়েছিল রায়েভস্কির অ্যাডজুটান্ট। তীব্র যন্ত্রণায় সে করুণস্বরে অনবরত আর্তনাদ করছে; হেমন্ত রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে সে আর্তনাদ ভয়ংকর হয়ে বাজতে লাগল। প্রথম রাতটা সে রস্তভদের সঙ্গে একই উঠোনে কাটিয়েছে। কাউন্টেস বলল, তার কাতরানির শব্দে সে চোখের পাতা বুজতে পারেনি। তাই আহত লোকটির কাছ থেকে দূরে থাকবার জন্য কাউন্টেস মিতিশচিতে আরো খারাপ একটা কুটিরে উঠে গেল।
রাতের অন্ধকারে একটি চাকরের নজরে পড়ল, বারান্দার সামনে দাঁড়ানো একটু উঁচু গাড়ির মাথার উপরে আর একটা আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে। একটা আভা অনেক আগে থেকেই চোখে পড়েছিল; সকলেই জানত ঘোট মিতিশচি পুড়ছে–মামোনভের কসাকরা সেখানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
দেখ, দেখ ভাইসব, ওই একটা আগুন! জনৈক আর্দালি বলে উঠল।
সকলেরই দৃষ্টি সেই আগুনের দিকে পড়ল।
কিন্তু ওরা তো বলল মামোনভের কসাকরা ছোট মিতিশচিতে আগুন লাগিয়েছে।
কিন্তু ওটা তো মিতিশচি নয়, সেখান থেকে অনেক দূরে।
দেখ, দেখ, মনে হচ্ছে ওটা নির্ঘাৎ মস্কো!
যারা দেখছিল তাদের দুজন ঘুরে গাড়ির অপর পাশে গিয়ে পাদানিতে বসে পড়ল।
এটা তো আরো খানিকটা বাঁদিকে; আরে, ছোট মিতিশচি তো ওই দূরে, এটা তো ঠিক তার বিপরীত দিকে।
আরো কয়েকজন এসে প্রথম দুজনের সঙ্গে যোগ দিল।
একজন বলল, কি রকম জ্বলছে দেখ। আগুনটা লেগেছে মস্কোতে, হয় সুশচেভস্কি নয় তো রঘোঝস্কি অঞ্চলে।
একথার কোনো জবাব কেউ দিল না; বেশ কিছু সময় সকলেই নীরবে অনেক দূরের সেই দ্বিতীয় অগ্নিকাণ্ডের লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে রইল।
কাউন্টের খানসামা বুড়ো দানিয়েল তেরেন্তিচ সেখানে এসে মিশকাকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে উঠল।
হাঁ করে কি দেখছ অকর্মার ধাড়ি…? কাউন্ট তো ডাকতে পারেন, আর সেখানে কেউ নেই; যাও, পোশাক-পত্তরগুলো গুছিয়ে নাও।
জনৈক পরিচারক বলল, তুমি কি মনে কর দানিয়েল তেরেন্তিচ? আগুনটা মস্কোতে বলে মনে হচ্ছে না?
দানিয়েল তেরেন্তিচ জবাব দিল না। আবার অনেকক্ষণ পর্যন্ত সকলেই চুপচাপ। আগুনের আভা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে, কখনো উঠছে কখনো পড়ছে, ক্রমেই দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
আর একজন বলল, ঈশ্বর দয়া করুন…কী বাতাস, আর সবই তো শুকনো…।
ওদিকে দেখ! কী কাণ্ডকারখানাই চলছে। হে প্রভু! ঐ যে দেখতে পাচ্ছ কাকগুলিও উড়ে পালাচ্ছে। প্রভু পাপীদের করুণা করুন!
ওরা আগুন নিভিয়ে ফেলবে। কোনো ভয় নেই!
কে নেভাবে? এতক্ষণ চুপ করে থেকে এবার দানিয়েল তেরেন্তিচ বলল। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, বিবেচক। ভাইসব, ওই তো মঙ্কো…জননী মস্কো, তার শাদা… তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল; শোনা গেল একটি বৃদ্ধের চাপা কান্না।
ঐ আগুনের আভার তাৎপর্য বুঝবার জন্য তারা সকলেই যেন এরজন্যই অপেক্ষা করে ছিল। দীর্ঘশ্বাস, প্রার্থনার বাণী, আর কাউন্টের বুড়ো খানসামার চাপা কান্না শোনা যেতে লাগল।
.
অধ্যায়-৩১
কুটিরে ফিরে গিয়ে খানসামা কাউন্টকে জানাল, মস্কো জ্বলছে। ড্রেসিং গাউনটা গায়ে চড়িয়ে কাউন্ট বাইরে গেল দেখতে। সোনিয়া ও মাদাম শোস তখনো পোশাক ছাড়েনি; তারাও সঙ্গে গেল। শুধু নাতাশা ও কাউন্টেস ঘরে রইল। পেতয়া পরিবারের সঙ্গে নেই; সে এখন রেজিমেন্টের সঙ্গে ত্ৰয়েস্তার পথে।
মস্কোতে আগুন জ্বলছে শুনে কাউন্টেস কাঁদতে শুরু করল। নাতাশা বিবর্ণ মুখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেঞ্চিতেই বসে রইল, বাবার কথায় কানই দিল না। তিনটে বাড়ি দূরে অ্যাডজুটান্টের অবিশ্রাম আর্তনাদই সে শুনছে।
শীতার্ত, ভীত হয়ে উঠোন থেকে ফিরে এসে সোনিয়া বলল, ওঃ, কী ভয়ংকর! আগুনের আভা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মনে হচ্ছে গোড়া মস্কোই পুড়বে! নাতাশা, চেয়ে দেখ! এখন জানালা থেকেই দেখতে পাবে।
কিন্তু নাতাশা এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন কিছুই বুঝতে পারেনি; ঘরের কোণের স্টোভটার দিকেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। যে কারণেই হোক সোনিয়া সকালেই নাতাশাকে বলে দিয়েছে যে প্রিন্স আন্দ্রু আহত অবস্থায় তাদের সঙ্গেই যাচ্ছে; সেই থেকেই নাতাশা কেমন যেন অর্ধচেতন অবস্থায় আছে। ওদিকে কাউন্টেস সোনিয়ার উপর ভীষণ রেগে গেছে। সোনিয়া কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং যেন সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতেই এখন সে দিদির প্রতি অখণ্ড মনোযোগ দিচ্ছে।
