অবশেষে দ্রুত অঙ্গভঙ্গি সহকারে জ্বলজ্বলে মুখে পোল্যান্ডের সেই সাম্প্রতিক কাহিনীটি সে বলে গেল যা আজও ক্যাপ্টেনে স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে : সে জনৈক পোলের জীবন রক্ষা করলে সেই পোল নিজে যুদ্ধের চাকরি নিয়ে চলে যাবার সময় মোহময়ী স্ত্রীকে রেখে গেল তারই আশ্রয়ে। ক্যাপ্টেনের সুখের অন্ত নেই, মোহিনী পোলিশ মহিলা তার সঙ্গেই পালিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু উদারতার অনুপ্রেরণায় ক্যাপ্টেন স্ত্রীকে স্বামীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল : আমি আপনার জীবন রক্ষা করেছি, এবার আপনার সম্মান রক্ষা করলাম! কথাগুলি বলে ক্যাপ্টেন চোখ মুছল, একবার কেঁপে উঠল, যেন এই মর্মস্পর্শী স্মৃতির ফলে তার মনে যে দুর্বলতা জেগেছে তাকেই দূর করে দিল।
একটু রাত হলে মদের প্রভাবে প্রায়ই যেমনটি হয়ে থাকে, পিয়ের বেশ মনোযোগ দিয়ে ক্যাপ্টেনের কাহিনীগুলি শুনল, সবই বুঝতেও পারল, আর কেন কে জানে সহসা নিজের স্মৃতিগুলো একের পর এক তার মনের সামনে ভিড় করে এল। এইসব ভালোবাসার গল্প শুনতে শুনতে অপ্রত্যাশিতভাবে নাতাশার প্রতি ভালোবাসার কথা তার মনে পড়ে গেল; কল্পনায় সেই ভালোবাসার ছবিগুলোকে সে রাম্বেলের কাহিনীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগল। ভালোবাসা ও কর্তব্যের সংঘাতের কাহিনী শুনতে শুনতে পিয়ের যেন চোখের সামনে দেখতে পেল সুখারেভ জল-গম্বুজের নিচে প্রেমিকার সঙ্গে তার শেষ সাক্ষাতের বিস্তারিত দৃশ্যাবলী। সাক্ষাতের সময়ে কিন্তু তার মনে কোনো প্রভাব পড়েনি,-সেসব কথা সে একবারও মনে করেনি। অথচ এখন তার মনে হচ্ছে সেই সাক্ষাতের মধ্যে অত্যন্ত গুরুতর ও কাব্যময় কিছু ছিল ।
পিতর কিরিলভিচ, এখানে আসুন! আমরা আপনাকে চিনতে পেরেছি, এই মুহূর্তে যেন সেই কথাগুলি সে শুনতে পাচ্ছে, চোখের সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছে তার চোখ, তার হাসি, তার ভ্রমণসঙ্গী ওড়না, তার একগুচ্ছ কুন্তল…তার মনে হল এ সবকিছুই যেন বিষণ্ণতা দিয়ে মোড়া।
মোহিনী পোলিশ মহিলার কাহিনী শেষ করে ক্যাপ্টেন জানতে চাইল, প্রেমের জন্য ত্যাগস্বীকার এবং প্রকৃত স্বামীর ঈর্ষার কোনো অভিজ্ঞতা কোনদিন পিয়েরের হয়েছে কি না।
এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পিয়ের মাথাটা তুলল, নিজের মনের কথা প্রকাশ করবার একটা প্রয়োজনীয়তা বোধ করল। বলতে লাগল, নারীর প্রতি ভালোবাসাকে সে বোঝে স্বতন্ত্রভাবে। বলল, সারাজীবন সে একটিমাত্র নারীকেই ভালোবেসেছে এবং এখনো ভালোবাসে, আর সে নারী কখনো তার হবে না।
ক্যাপ্টেন বলল, Tiens!
পিয়ের তখন বুঝিয়ে বলল, এই নারীকে সে প্রথম জীবনেই ভালোবাসত, কিন্তু তখন সে তার কথা ভাবতেও সাহস করত না, কারণ সে নারী তখন ছিল খুবই ছোট, আর সে নিজেও তখন ছিল নামগোত্রহীন এক অবৈধ সন্তান। তারপর বংশ-মর্যাদা ও সম্পত্তি লাভের পরেও তার কথা ভাবতে সাহস করল না, কারণ তাকে সে বড় বেশি ভালোবাসত, তাকে স্থান দিয়েছিল পৃথিবীর সবকিছুর উপরে, বিশেষ করে নিজেরও উপরে।
এই পর্যন্ত বলে পিয়ের ক্যাপ্টেনকে শুধাল, ব্যাপারটা সে বুঝতে পেরেছে কি না।
ক্যাপ্টেন এমন একটা ভঙ্গি করল যার অর্থ–সে বুঝুক আর নাই বুঝুক, পিয়ের তার কাহিনী চালিয়ে যাক।
আধ্যাত্মিক প্রেম, মেঘের মতো… সে তো-তো করে বলল।
মদের প্রভাবে হোক, অথবা খোলাখুলি বলার ঝেকে হোক, বা এই লোকটি যে তার কাহিনীর নায়ক নায়িকাদের জানে না এবং কোনোদিন জানবেও না এই চিন্তার ফলেই হোক, অথবা এ সবকিছু মিলিয়েই হোক, একটা কিছু পিয়েরের জিভকে খুলে দিয়েছে। বহু দূরে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে সে তার জীবনের সমগ্র কাহিনী বলতে লাগল : তার বিয়ে, তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর প্রতি নাতাশার ভালোবাসা, তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, এবং তার সঙ্গে তার নিজের সরল সম্পর্কের কথা। রাষেলের নানা প্রশ্নের জবাবে যেকথা প্রথম লুকিয়েছিল তাও বলে ফেলল–নিজের পদমর্যাদা, এমন কি নামটা পর্যন্ত।
পিয়েরের কাহিনীর মধ্যে যা ক্যাপ্টেনকে সবচাইতে বেশি মুগ্ধ করল তা হল-পিয়ের খুব ধনী, মস্কোতে তার দুটো প্রাসাদোপম বাড়ি আছে, সে সবকিছু ছেড়েছে কিন্তু শহর ছাড়েনি, নাম ও বাসস্থান লুকিয়ে সেখানেই থেকে গেছে।
অনেক রাত হলে দুজন একসঙ্গে পথে বেরিয়ে এল। রাতটা আতপ্ত ও হাল্কা। পক্ৰোভকার উপরে বা দিকের বাড়িটায় আগুন জ্বলছে-মস্কোতে এই প্রথম আগুনের সূত্রপাত। ডানদিকে আকাশের বুকে কাস্তের মতো ক্ষীয়মান চাঁদ, তার বিপরীতদিকে ঝুলে পড়েছে সেই উজ্জ্বল ধূমকেতুটি যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পিয়েরের অন্তরের ভালোবাসা। গেরাসিম, রাধুনি ও দুটি ফরাসি সৈনিক ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাসি, দুটি ভিন্ন ভাষায় পরস্পরের কাছে দুর্বোধ্য ভাষায় তাদের কথাবার্তা কানে আসছে। শহরের আলোর আভার দিকে তারা তাকিয়ে আছে।
এত বড় শহরে অনেক দূরের একটিমাত্র ছোটখাট অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ভয়ের কিছু থাকতে পারে না।
অনেক উপরের নক্ষত্রখচিত আকাশ, চাঁদ, ধূমকেতু ও আগুনের আভার দিকে তাকিয়ে পিয়েরের মন আনন্দের আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। এই তো, এই তো ভালো, এর বেশি আর কি চাই? সে ভাবল। সহসা নিজের অভিপ্রায়ের কথা মনে পড়ায় তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, এত দুর্বল লাগল যে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য সে বেড়াটায় গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।
