ঈষৎ খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটা শিস দিতে দিতে ক্যাপ্টেন ঘরের মধ্যে ঢুকল।
ফরাসি লোকটির যে বকবকানি শুনে এতক্ষণ সে মজা পাচ্ছিল, এখন তাতে তার বিরক্তি দেখা দিল। তার শিস, চালচলন, গোঁফে চাড়া দেবার ভঙ্গি, সবই আপত্তিকর মনে হতে লাগল। আমি এখনই চলে যাব, তার সঙ্গে আর একটি কথাও বলব না, পিয়ের ভাবল। একথা ভাবলেও সে কিন্তু সেখানেই বসে রইল। একটা আশ্চর্য দুর্বলতা তাকে যেন সেখানে বেঁধে রেখেছে; উঠে চলে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না।
অপরদিকে ক্যাপ্টেন তখন খুব খুশি। দুবার সে ঘরময় পায়চারি করল। যেন কোনো চিন্তায় বেশ মজা পেয়েছে এমনিভাবে চোখ দুটি চকচক করছে, গোঁফটা হাসিতে বেঁকে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে বলে উঠল, ঐ উৰ্তেমবেগারদের কর্নেলটি খুব মজার লোক। লোকটি জার্মান, কিন্তু তবু বেশ ভালো লোক।…কিন্তু জার্মান তো। পিয়েরের দিকে মুখ করে বসে বলল, ভালো কথা, আপনি তাহলে জার্মান ভাষা জানেন?
পিয়ের নীরবে তার দিকে তাকাল।
আচ্ছা, আশ্রয়ের জার্মান প্রতিশব্দ কি?
পিয়ের বলল, আশ্রয়? ওটার জার্মান প্রতিশব্দ unterkunft.
কীভাবে কথাটা উচ্চারণ করেন? সন্ধিগ্ধ গলায় ক্যাপ্টেন তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করল। Unterkunft, পিয়ের পুনরায় বলল।
ওন্তেরকফ, বলে হাসি-হাসি চোখে ক্যাপ্টেন কয়েক সেকেন্ড পিয়েরের দিকে তাকিয়ে রইল। এই জার্মানরা পাক্কা বুদ্ধ, আপনিও কি তাই মনে করেন না সিয় পিয়ের?
তারপরেই খুশি মনে বলল, আচ্ছা, বরং এই মস্কো বোর্দু আর এক বোতল নেওয়া যাক। শরীরটা গরম করতে মোরেল আর একটা ছোট বোতল অবশ্যই দেবে। মোরেল! সে হাঁক দিল।
মোরেল একটা মোমবাতি ও মদের বোতল এনে দিল। মোমবাতির আলোয় পিয়েরের দিকে তাকিয়ে তার মুখের বিপর্যস্ত ভাব দেখে ক্যাপ্টেন বিস্মিত হল। আন্তরিক সহানুভূতির সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে রাষেল তার উপর ঝুঁকে দাঁড়াল।
পিয়েরের হাতটা ছুঁয়ে বলল, এই যে, আমরা এখনো বিষণ্ণ। আমি কি আপনাকে বিচলিত করেছি? না, সত্যি আমার বিরুদ্ধে আপনার কিছু বলার কাছে কি? হয়তো বর্তমান পরিস্থিতিই এরজন্য দায়ী।
পিয়ের জবাব দিল না, সাদর দৃষ্টিতে ফরাসিটির চোখে চোখ রাখল; তার সহানুভূতিপূর্ণ চাউনি তাকে খুশি করেছে।
সত্যি বলতে কি, আমার ঋণের কথা না তুলেও বলতে পারি, আপনাকে আমি বন্ধু বলেই মনে করি। আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন? এটা জীবন-মরণের সম্পর্ক। বুকে হাত রেখে একথা বলছি, বুকে আঘাত করে সে বলল।
আপনাকে ধন্যবাদ, পিয়ের বলল।
তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ক্যাপ্টেনের মুখটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সেক্ষেত্রে আমাদের বন্ধুত্বের জন্য পান করছি, খুশিমনে দুটি গ্লাসে মদ ঢেলে সে চেঁচিয়ে বলল।
পিয়ের একটা গ্লাস হাতে নিয়ে সেটা খালি করে ফেলল। রাম্বেলও তার গ্লাসটা খালি করে আবার পিয়েরের হাতে চাপ দিল; টেবিলের উপর কনুই রেখে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বসে রইল।
তারপর বলতে শুরু করল, হ্যাঁ প্রিয় বন্ধু, ভাগ্যের এমনি খেয়ালীপনা। কে বলতে পারত যে আমি একদিন সৈনিক হব, বোনাপার্তের অধীনে একটা অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন হব? অথচ আমি তারই সঙ্গে মস্কো এসেছি। আপনাকে বলা দরকার বন্ধু যে আমাদের বংশ ফ্রান্সের অন্যতম প্রাচীন বংশ।
ফরাসিসুলভ সহজ, সরল, দিলখোলাভাবে ক্যাপ্টেন পিয়েরকে শোনাল তার পূর্বপুরুষ, তার শৈশব, যৌবন ও পরিণত জীবনের কথা, তার আত্মীয়স্বজন এবং আর্থিক ও পারিবারিক অবস্থার কথা।
কিন্তু এসবই তো জীবনের পরিবেশ, আসল কথা তো ভালোবাসা-ভালোবাসা। ঠিক বলিনি মঁসিয় পিয়ের? ক্রমেই সে উত্তেজিত হয়ে উঠছে। আর এক গ্লাস দেব?
পিয়ের আবারো গ্লাসটা খালি করে তৃতীয়বার ভরে নিল।
চকচকে চোখে পিয়েরের দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন তার ভালোবাসার কাহিনী বলতে শুরু করল, আঃ, নারী, নারী!
অফিসারটির সুদর্শন আত্মতৃপ্ত মুখ দেখে এবং যে সাগ্রহ উৎসাহ নিয়ে সে নারীঘটিত ব্যাপার বলতে শুরু করল তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে এধরনের ব্যাপারের কিছু ঘাটতি ছিল না। ভালোবাসার যে ইন্দ্রিয়জ বৈশিষ্ট্যকে ফরাসিরা ভালোবাসার বিশেষ আকর্ষণ ও কাব্যময়তা বলে মনে করে যদিও তার কোনো অভাব রাম্বেলের ভালোবাসার গল্পগুলিতে ছিল না, তবু তার কাহিনীকে এমন দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে সে বলতে লাগল যেন একমাত্র সেই ভালোবাসার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং তার আকর্ষণকে অনুভব করেছে। তাছাড়া, এমন আকর্ষণীয় করে সে নারীর বর্ণনা দিতে লাগল যে পিয়ের আগ্রহের সঙ্গেই তার সব কথা শুনতে লাগল।
একটা কথা পরিষ্কার–যে প্রেম ফরাসিদের এত প্রিয় সেটা একদিকে যেমন সেই নিচ, সরল অনুভূতি নয় যা একসময় পিয়ের তার স্ত্রীর প্রতি অনুভব করত, আবার অন্যদিকে সেই রোমান্টিক ভালোবাসাও নয় যা সে নাতাশার বেলায় অনুভব করেছে; যে প্রেমকে ফরাসিরা পূজা করে তা হচ্ছে প্রধানত নারীর প্রতি একটা অস্বাভাবিক সম্পর্ক এবং পরস্পরবিরোধী অনুভূতির এমন একটা সঙ্গম যা প্রেমকে করে তোলে মোহময়।
তাই ক্যাপ্টেন অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্কা মার্কুইস-পত্নীর প্রতি ভালোবাসার কাহিনী বলল। আবার তারই নিষ্পাপ যোড়শী কন্যার প্রতি ভালোবাসার কাহিনীও শোনাল। মাতা ও কন্যার মধ্যে উদারতার দ্বন্দ্বে শেষপর্যন্ত যেভাবে মা নিজে ত্যাগ স্বীকার করে মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিল সেকথা দূর অতীতের স্মৃতি হলেও আজও তা ক্যাপ্টেনকে শিহরিত করে তুলল। তারপর সে এমন একটি ঘটনা বলল যেখানে স্বামী নিয়েছিল প্রেমিকের ভূমিকা আর সে-অর্থাৎ প্রেমিক-নিয়েছিল স্বামীর ভূমিকা; তাছাড়া যে জার্মেনিতে আশ্রয়কে বলে Unterkunft এবং যেখানে স্বামীরা খায় সোরক্রোত (বাঁধাকপির ঝোল) আর তরুণীরা হয় অতি সুন্দরী সেই দেশের স্মৃতি থেকে বেশ কয়েকটি মজার গল্পও শোনাল।
