ক্যাপ্টেন এতই সরল ও আমুদে মানুষ, এবং নিজেকে নিয়ে এতই তুষ্ট যে খুশি মনে তার দিকে তাকিয়ে পিয়েরও বুঝি চোখ টিপল। সম্ভব মহাবীর কথাটা থেকেই মস্কোর কথা ক্যাপ্টেনের মনে পড়ে গেল।
ভালো কথা, দয়া করে বলুন তো, মেয়েরা সবাই মস্কো ছেড়ে চলে গেছে একথা কি সত্যি? অদ্ভুত কথা তো! এখানে থাকতে তাদের কিসের ভয়?
রুশরা প্যারিসে প্রবেশ করলে কি ফরাসি মহিলারা প্যারিস ছেড়ে চলে যেতেন না? পিয়ের শুধাল। হা, হা, হা! পিয়েরের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে ফরাসিটি মুচকি হেসে বলল। কথার মতো কথা বটে! প্যারিস!…কিন্তু প্যারিস প্যারিস…।
প্যারিস-পৃথিবীর রাজধানী, পিয়ের তার কথাটা শেষ করে দিল।
ক্যাপ্টেন পিয়েরের দিকে তাকাল। কথার মাঝখানে থেমে গিয়ে চোখে হাসি ফুটিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাটা তার অভ্যাস।
দেখুন, আপনি যদি না বলে দিতেন যে আপনি রুশ তাহলে আমি বাজি ধরে বলতাম যে আপনি একজন প্যারিসীয়! আপনার মধ্যে সেই জিনিসটি আছে…সেটা যে কি তা ঠিক জানি না, তবে সেই… গুণের কথাটা বলে সে আবার নিঃশব্দে পিয়েরের দিকে তাকিয়ে রইল।
পিয়ের বলল, আমি প্যারিসে গিয়েছি। সেখানে তিন বছর কাটিয়েছি।
তা বটে, দেখলেই সেটা বোঝা যায়। প্যারিস! যে লোক প্যারিসকে চেনে না সে তো বর্বর। দু লীগ দূর থেকেও একজন প্যারিসিয়কে দেখে আপনি বলে দিতে পারেন। প্যারিস হচ্ছে তালমা, লা দুচেনয়, পোতিয়ের, সর্বোন, রাজপথ। আগের কথার তুলনায় পরের কথাগুলি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দেখে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল : পৃথিবীতে মাত্র একটি প্যারিসই আছে। প্যারিসে কাটিয়েও আপনি রুশই রয়ে গেছেন। দেখুন সেজন্য আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা একটুও কমেনি!
পেটে কিছুটা মদ পড়েছে, নানা দুশ্চিন্তায় অনেকগুলি দিনও কেটেছে, তাই এই আমুদে স্বভাবের লোকটির সঙ্গে কথা বলতে পিয়েরের ভালোই লাগছে।
মহিলাদের কথাতেই যাওয়া যাক–শুনেছি তারা খুবই মনোরমা। ফরাসি বাহিনী মস্কোতে এসেছে বলই তাদের তৃণভূমিতে গিয়ে মাথা গুঁজে থাকতে হবে, এটা বড়ই দুঃখের কথা। মেয়েরা কী সুযোগই না হারালেন! আপনাদের চাষীরা, অবশ্য তাদের কথা আলাদা, কিন্তু আপনাদের মতো সভ্য মানুষদের তো আমাদের ভালোভাবেই জানা উচিত। ভিয়েনা, বার্লিন, মাদ্রিদ, নেপলস, রোম, ওয়ারস, পৃথিবীর সবগুলি রাজধানী আমরা দখল করেছি…সকলে আমাদের ভয় করে, কিন্তু ভালোবাসে। যারা জানে তাদের কাছে আমরা তোক ভালো। তারপর সম্রাট… এখানে পিয়ের তাকে বাধা দিল।
সম্রাট, পিয়ের আর একবার কথাটা উচ্চারণ করল, সহসা তার মুখটা বিষণ্ণ ও বিব্রত হয়ে উঠল, সম্রাটও কি…?
সম্রাট? তিনি তো উদারতা, করুণা, ন্যায়, শৃঙ্খলা, প্রতিভার প্রতিমূর্তি–এই তো ম্রাটের পরিচয়! আমি রাম্বেল একথা বলছি…স্থির জানবেন, আট বছর আগে আমি ছিলাম তার শত্রু। আমার বাবা ছিলেন বিদেশ থেকে আগত একজন কাউন্ট।…কিন্তু এই মানুষটি আমাকে জয় করেছেন। তিনি আমাকে হাত করে ফেলেছেন। যে জাঁকজমক ও গৌরব দিয়ে তিনি ফ্রান্সকে মুড়ে দিয়েছেন সেদৃশ্য তো আমি ভুলতে পারি না। যখন বুঝতে পারলাম তিনি কি চান-যখন দেখলাম যে তিনি আমাদের জন্য একটা ফুলের বিছানা পাতার আয়োজন করছেন, তখন নিজেকে বললাম : এই তো রাজা, আর তার সেবায় আত্মনিয়োগ করলাম! বুঝেছেন! হা প্রিয় বন্ধু, অতীত-বর্তমান সর্বযুগের তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ।
অপরাধীর ভঙ্গিতে তাকিয়ে পিয়ের তো-তো করে বলল, তিনি কি মস্কো এসেছেন?
ফরাসিটি তার অপরাধীসুলভ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল।
না, তিনি কাল আসবেন, বলে সে আবার নিজের কথায় ফিরে গেল।
ফটকে কিছু লোকের চেঁচামেচিতে তাদের কথায় বাধা পড়ল। মোরেল এসে জানাল, কিছু উর্তেবের্গ হুজার এসে এ-বাড়ির উঠোনে ঘোড়া রাখতে চাইছে। এই গোলযোগটি দেখা দিয়েছে তার কারণ ফরাসিতে তাদের যা বলা হয়েছে হুজাররা তা বুঝতে পারেনি।
ক্যাপ্টেন তাদের বড় সার্জেন্টকে ডেকে এনে কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করল, সে কোন রেজিমেন্টের লোক, তার কমান্ডিং অফিসার কে, আর কোন অধিকারে পূর্বেই দখল-করা একটা বাসা বেদখল করতে সে এসেছে। জার্মানটি ফরাসি ভাষা যৎসামান্য জানে; প্রথম দুটি প্রশ্নের জবাবে রেজিমেন্টের নাম ও কমান্ডিং অফিসারের নাম বলে দিল, কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি ঠিক-ঠিক বুঝতে না পেরে নিজের জার্মান ভাষার সঙ্গে ভাঙা-ভাঙা ফরাসি মিশিয়ে বলল যে সে তার রেজিমেন্টের কোয়ার্টার-মাস্টার, আর তার কমান্ডারই একটার পর একটা বাড়ি দখল করার হুকুম দিয়েছে। পিয়ের জার্মান ভাষা জানে; সে জার্মানটির কথা ভাষান্তর করে ক্যাপ্টেনকে শোনাল, আর ক্যাপ্টেনের জবাব জার্মান ভাষায় উৰ্তেমবের্গ হুজারকে শুনিয়ে দিল। প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরে জার্মানটি নতি স্বীকার করে তার সৈন্যদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেল। ক্যাপ্টেন বারান্দায় বেরিয়ে হাঁক দিয়ে কিছু হুকুম জারি করল।
ঘরে ফিরে এসে দেখল দু হাতের মধ্যে মাথা রেখে পিয়ের সেই একই জায়গায় বসে আছে। তার মুখে যন্ত্রণার চিহ্ন। সেইমুহূর্তে সত্যি সে যন্ত্রণাক্লিষ্ট। ক্যাপ্টেন বেরিয়ে গেলে সে যখন ঘরের মধ্যে একা, তখন হঠাৎ সে যেন নিজেকে ফিরে পেল, নিজের অবস্থা বুঝতে পারল। মস্কো বেদখল হয়েছে, আনন্দিত বিজয়ী পক্ষ মস্কোর প্রভু হয়ে বসেছে এবং তার উপর মাতব্বরী করছে, আসল কথা সেটা নয়। সে অবস্থাটাও বেদনাদায়ক, তবু এই মুহূর্তে পিয়েরের যন্ত্রণার কারণ সেটা নয়। নিজের দুর্বলতার বোধই তাকে কষ্ট দিচ্ছে। যে গভীর বিষণ্ণতার মধ্যে তার বিগত দিনগুলি কেটেছে, তার পরিকল্পনামতো কাজ হাসিল করার পক্ষে যে বিষণ্ণতা একান্ত প্রয়োজন, কয়েকপাত্র মদ আর এই সৎস্বভাবের মানুষটির সঙ্গে আলোচনা তার মন থেকে সেই বিষণ্ণতাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। পিস্তল, ছুরি ও চাষীর কোট প্রস্তুত। পরদিনই নেপোলিয়ন শহরে ঢুকবে। পিয়ের এখনো মনে করে যে এই দুষ্কৃতকারীকে হত্যা করা দরকার, করা উচিত, কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে যে সেকাজ সে করতে পারবে না। কেন তা সে জানে না, কিন্তু কেমন একটা আভাস সে পেয়েছে যে অভিপ্রায় মতো কাজটি সে করবে না। এই দুর্বলতা স্বীকার করতে তার বাধছে, কিন্তু অস্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে এই দুর্বলতাকে জয় করতে সে পারবে না; প্রতিহিংসা, হত্যা ও আত্মোৎসর্গের যে মানসিক বিষণ্ণতা তাকে পেয়ে বসেছিল, প্রথম মানুষটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ফলেই তা ধুলোর মতো মিলিয়ে গেছে।
