গুলির শব্দ শুনে সৈন্যরা উঠোন থেকে বারান্দায় ছুটে এসেছে; কি হয়েছে শুনে নিয়ে তারা অপরাধীকে শাস্তি দিতে উদ্যত হল, কিন্তু অফিসার কড়া গলায় তাদের বাধা দিল।
দরকার হলেই তোমাদের ডাকা হবে, সে বলল।
সৈন্যরা বেরিয়ে গেল। আর্দালিটি ইতিমধ্যেই রান্নাঘরে ঢুকেছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে বলল, ক্যাপ্টেন, রান্নাঘরে ঝোল ও পাঁঠার ঠ্যাং আছে। আপনাকে খেতে দেব কি?
হ্যাঁ, আর কিছু মদ, ক্যাপ্টেন জবাব দিল।
.
অধ্যায়-২৯
ফরাসি অফিসার যখন পিয়েরকে নিয়ে ঘরে ঢুকল তখন পিয়ের আবার ভাবল, সে যে ফরাসি নয়-সেটা তাকে নিশ্চিত করে বলে দেওয়া তার কর্তব্য, কিন্তু অফিসার তার কথায় কানই দিল না। লোকটি এত বিনয়ী, ভদ্র, ভালো মানুষ, এবং তার প্রাণরক্ষা করার জন্য পিয়েরের প্রতি এমন আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ যে পিয়ের তার কথা না রেখে পারল না, তার সঙ্গে গিয়ে বৈঠকখানায় বসল। পিয়ের যখন বারবার বলতে লাগল যে সে ফরাসি নয়, তখন ক্যাপ্টেন খুব অবাক হয়ে গেল; এত বড় একটা সুখ্যাতিকে মানুষ কেমন করে অগ্রাহ্য করতে পারে তা সে বুঝতেই পারল না; যাহোক, সে কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, পিয়ের যদি একান্তই রুশ পরিচয়ে থাকতে চায় তো তাই থাকুক, কিন্তু তার প্রাণ রক্ষার জন্য সে পিয়েরের প্রতি চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে।
পিয়েরের ভালো অথচ নোংরা পোশাক এবং তার আঙুলের আংটির দিকে তাকিয়ে অফিসার বলল, ফরাসিই হোন আর ছদ্মবেশী রুশ প্রিন্সই হোন, আপনার জন্যই আমি জীবনে বেঁচে আছি, আর তাই আপনার কাছে বন্ধুত্বের প্রস্তাব করছি। অপমান কিংবা উপকার, একজন ফরাসি কোনোদিন এর কোনোটাই ভোলে না। আপনি আমার বন্ধু হোন। এই আমার একমাত্র বলার কথা।
অফিসারের কণ্ঠস্বরে, তার মুখের ভাবে ও ভঙ্গিতে এমন সৎস্বভাব ও আভিজাত্য প্রকাশ পেল যে তার হাসির জবাবে ঈষৎ হেসে পিয়ের নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল।
৭ই সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের জন্য মহাবীর পদকপ্রাপ্ত, তেরশো লাইট রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন রাম্বেল, সে আত্মপরিচয় ঘোষণা করল; গোঁফের নিচেকার ঠোঁট দুটি আত্মতুষ্টির অপ্রতিরোধ্য হাসিতে বেঁকে গেল। এবার আপনি দয়া করে বলবেন কি, একটা পাগলের বুলেট শরীরে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে থাকার পরিবর্তে কার সঙ্গে এমন মধুর আলাপনের সৌভাগ্য আমার হয়েছে?
পিয়ের জবাবে জানাল, নিজের নামটা সে তাকে বলতে পারছে না; তারপর মুখ লাল করে একটা নাম খুঁজে নেবার এবং নামটা লুকোবার কারণ সম্পর্কে একটা কিছু বলবার চেষ্টা করতেই ফরাসিটি তাড়াতাড়ি তাকে বাধা দিল।
আহা, ঠিক আছে! আপনার কারণ আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি একজন অফিসার…হয়তো ঊর্ধ্বতন অফিসার। আমাদের বিরুদ্ধে আপনি অস্ত্র ধরেছেন। সেটা আমার দেখার কথা নয়। আমার জীবনের জন্য আমি আপনার কাছে ঋণী। সেটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট। আপনার সেবায় আমি সদাপ্রস্তুত। আপনি কি দ্র শ্রেণীর গলায় একটা প্রশ্নের সুর এনে সে কথা শেষ করল। পিয়ের মাথা নিচু করল। আপনার নামটি যদি বলেন। আর কিছুই জানতে চাই না। মঁসিয় পিয়ের…চমৎকার! শুধু ওইটুকুই জানতে চাই।
যখন মাংস ও ওমলেট পরিবেশন করা হল, সামোভার ও ভদকা আনা হল, আর সেই সঙ্গে খানিকটা মদ, তখন রাম্বেল পিয়েরকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাল, আর নিজে একটি স্বাস্থ্যবান ক্ষুধার্ত লোকের মতো অতি গোগ্রাসে গিলতে লাগল; শক্ত দাঁত দিয়ে চিবুতে চিবুতে অনবরত ঠোঁট চাটতে চাটতে বারবার বলতে লাগল-চমৎকার! সুস্বাদু! তার মুখটা লাল হয়ে উঠল, ঘাম ঝরতে লাগল। পিয়েরও ক্ষুধার্ত, সানন্দে ডিনারে যোগ দিল। আর্দালি মোরেল একটা গরম জলের পাত্র এনে এক বোতল ক্লারেট তার মধ্যে বসিয়ে দিল। পরিতৃপ্তিসহকারে পান-ভোজনের ফলে ক্যাপ্টেন আরো ফুর্তিবাজ হয়ে সারাক্ষণ বক বক করতে লাগল।
প্রিয় মঁসিয়ে পিয়ের, ঐ পাগলাটার হাত থেকে আমাকে বাঁচাবার জন্য আমার কাছে একটা প্রতিশ্রুত মোমবাতি আপনার প্রাপ্য হয়েছে…কি জানেন, আমার দেহে ইতিমধ্যেই অনেক বুলেট ঢুকেছে। এখানে একটা ঢুকেছে ওয়াগ্রামে (সে পার্শ্বদেশ স্পর্শ করল) আর দ্বিতীয়টা স্মোলেনস্কে-গালের ক্ষতটা দেখাল-আর এই যে পাটা দেখছেন একেবারেই নড়তে-চড়তে চায় না, এটা ঢুকেছে ৭ তারিখের লা মস্কোয়ার মহাযুদ্ধে (ফরাসিরা বরদিনোর যুদ্ধকে বলত লা মস্কোয়া)। পবিত্র ঈশ্বর! সে এক চমৎকার ব্যাপার! সেই গোলাগুলির প্রবল বন্যা একটা দেখার মতো দৃশ্য। সত্যি বলছি, সেখানে আপনারা আমাদের মহামুস্কিলে ফেলেছিলেন। সে যুদ্ধের জন্য আপনারা গর্ব করতে পারেন। আর আমার কথা যদি বলেন, যদিও সেখান থেকেই আমি কাশিটা বাধিয়েছি, তবু সেখানে আরো একবার যেতে আমি প্রস্তুত। সেদৃশ্য যারা দেখেনি তাদের জন্য আমার করুণা হয়।
আমি সেখানে ছিলাম, পিয়ের বলল।
বাঃ, সত্যি? তাহলে তো আরো ভালো! সত্যি, আপনারা সাহসী শত্রু বটে। আমার পাইপের দোহাই, বড় দুৰ্গটা থেকে লড়াই ভালোই হয়েছিল, ফরাসিটি বলতে লাগল। তার জন্য আমাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। তিনবার সেখানে হানা দিয়েছিলাম–আমি যে এখানে বসে আছি এটা যেমন সত্য, সেটাও তেমনই সত্য। তিনবার আমরা কামানের সামনে হাজির হলাম, আর তিনবারই কার্ডবোর্ডের মূর্তির মতো পিছু হটে গেলাম। সত্যি, সে বড়ই সুন্দর মঁসিয় পিয়ের! ঈশ্বর সাক্ষী, আপনাদের বোমারুরা খুব ভালো। দুবার আমি তাদের খুব কাছে থেকে দেখেছি। চমৎকার লোক! আমাদের নেপলসের রাজা তো সবই জানেন, তিনিও বলে উঠলেন শাবাশ! হ্যাঁ, হ্যাঁ! তাহলে আপনিও আমাদের মতোই একজন সৈনিক। একটু থেমে সে হেসে বলল। খুব ভালো কথা, আরো ভালো কথা মঁসিয় পিয়ের! যুদ্ধের ভয়ংকর…নারীঘটিত ব্যাপারে…মহাবীর (সে চোখ টিপে হাসল), এই তো ফরাসিদের পরিচয় মঁসিয় পিয়ের, তাই নয় কি?
