ফরাসিরা ঢোকামাত্রই যাতে লুকিয়ে পড়তে পারে সেজন্য সে আধখোলা দরোজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ফরাসিরা ঢোকার পরেও পিয়ের সরে গেল না-একটা দুর্বার কৌতূহল তাকে সেখানেই আটকে রাখল।
তারা দুইজন এসেছে। একজন অফিসার–দীর্ঘদেহ, সুদর্শন, সৈনিকসুলভ চেহারা–অপরজন সম্ভবত আর্দালি, রোদে পোড়া, বেঁটে, সরু, তোবড়ানো গাল, ভাবলেশহীন মুখ। একটা লাঠিতে ভর দিয়ে ঈষৎ খুঁড়িয়ে অফিসারটি সামনে এগিয়ে এল। কয়েক পা এগিয়ে থামল, বুঝল যে বাসাটা ভালোই, ফটকে দাঁড়ানো সৈন্যদের দিকে ফিরে চড়া গলায় ঘোড়াগুলো রাখবার হুকুম দিল। তারপর একঝটকায় কনুইটা তুলে গোঁফে তা দিল, আস্তে টুপিটা স্পর্শ করল।
চারদিকে তাকিয়ে হেসে ফরাসিতে বলল, সকলকে জানাই শুভদিন।
কেউ কোনো জবাব দিল না।
অফিসারটি গেরাসিমকে শুধাল, তোমার মনিব বাড়িতে আছে?
ভীত সপ্রশ্ন চোখে গেরাসিম অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল।
করুণার হাসি হেসে অফিসার বলল, বাসা, বাসা, বাসাবাড়ি! ফরাসিরা ভালোমানুষ। আরে, হল কি! দেখ, আমাদের চটিও না হে বুড়ো! ভয়ার্ত নিঃশব্দ গেরাসিমের কাঁধে চাপড় দিয়ে সে বলল।
আচ্ছা, এ বাড়িতে কি কেউ ফরাসি বলতে পারে না?
চারদিকে তাকিয়ে পিয়েরের চোখে চোখ পড়তে সে আবার ফরাসিতে প্রশ্ন করল। পিয়ের দরোজা থেকে সরে গেল।
অফিসার পুনরায় গেরাসিমের দিকে ঘুরে ঘরগুলি দেখাতে বলল।
মনিব বাড়ি নেই-বুঝতে পারছি না…আমাকে, আপনি… কথাগুলিকে বোধগম্য করার জন্য আরো বিকৃত করে গেরাসিম বলল।
ফরাসি অফিসারটি গেরাসিমের নাকের কাছে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে হেসে হেসে জানাল যে সেও তার কথা বুঝতে পারছে না, তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে পিয়েরের দিকে এগিয়ে গেল। পিয়েরের ইচ্ছা সরে গিয়ে লুকিয়ে পড়বে, কিন্তু সেইমুহূর্তে সে দেখতে পেল মকার আলেক্সিভিচ পিস্তলটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের খোলা দরোজায় এসে দাঁড়িয়েছে। পাগলের মতো ধূর্ত চোখে ফরাসি লোকটির দিকে তাকিয়ে মকার আলেক্সিভিচ পিস্তল তুলে তার দিকেই তাক করল।
ঘোড়া টিপবার চেষ্টা করে মাতাল লোকটি চিৎকার করে উঠল, ওদের খতম কর! সে চিৎকার শুনে অফিসারটি ঘুরে দাঁড়াল, আর ঠিক সেইমুহূর্তে পিয়ের মাতালটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিয়ের যখন পিস্তলে হাত রেখে সেটা চেপে ধরল, তখনই মকার আলেক্সিভিও বন্দুকের ঘোড়র উপর আঙুল রাখল। কানে তালা লাগানো একটা শব্দ হল, কালো ধোয়ায় সবকিছু ঢেকে গেল। ফরাসি লোকটি বিবর্ণ মুখে দরোজার দিকে ছুটে গেল।
ফরাসি ভাষার জ্ঞান লুকিয়ে রাখার ইচ্ছা ভুলে গিয়ে পিয়ের পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অফিসারের দিকে ছুটে গেল এবং তার সঙ্গে ফরাসিতেই কথা বলল।
আপনি আঘাত পাননি তো?
মনে তো হয় না। দেয়ালের ভাঙা পলস্তরা দেখিয়ে বলল, কিন্তু ভাগ্যগুণে আজ খুব বেঁচে গিয়েছি। লোকটি কে? কঠোর দৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে তাকিয়ে অফিসারটি বলল।
নিজের অভিসন্ধির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে পিয়ের তাড়াতাড়ি বলে উঠল, সত্যি, যা ঘটে গেল সেজন্য আমি হতাশ হয়ে পড়েছি। লোকটি এক হতভাগ্য পাগল; ও যে কি করেছে তা নিজেই জানে না।
অফিসারটি মকার আলেক্সিভিচের কাছে গিয়ে তার কলারটা চেপে ধরল।
মকার আলেক্সিভিচ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে; দেয়ালে হেলান দিয়ে এমনভাবে দুলছে যেন এখনই ঘুমিয়ে পড়বে।
তাকে ছেড়ে দিয়ে ফরাসিটি বলল, গুণ্ডা! এর দাম তোমাকে দিতে হবে। আমরা ফরাসিরা জয়লাভের পরে দয়া দেখাই, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের আমরা ক্ষমা করি না।
তার চোখে বিষণ্ণ মর্যাদার অভিব্যক্তি।
পিয়ের ফরাসিতেই তাকে বার বার অনুরোধ জানাল, অক্ষম মাতালটাকে যেন শাস্তি না দেওয়া হয়। মুখে সেই একই বিষণ্ণতার আভাস এনে ফরাসিটি নীরবে তার কথাগুলি শুনল, তারপর হঠাৎ হেসে পিয়েরের দিকে মুখ ফেরাল। একটা অতি নাটকীয় ভদ্রতার প্রকাশ ফুটে উঠল তার মুখে; সে হাতটা বাড়িয়ে দিল।
বলল, আপনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন। আপনি ফরাসি?
একজন ফরাসির পক্ষে এ অনুমান সন্দেহাতীত। একমাত্র ফরাসির পক্ষেই কোনো মহৎ কাজ করা সম্ভব, আর তার জীবনতেরশো লাইট রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ম. রাম্বেলের জীবন রক্ষা করা নিঃসন্দেহে একটা : মহৎ কাজ।
কিন্তু সিদ্ধান্তটি এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত অফিসারের দৃঢ় ধারণাটি যতই সন্দেহাতীত হোক, তার এই ভুল ভাঙিয়ে দেওয়া দরকারি বলেই পিয়েরের মনে হল।
সে তাড়াতাড়ি বলল, আমি একজন রুশ।
ফু, ফু, ফু। ও কথা অন্যদের বলবেন, তার নাকের কাছে আঙুল ঘুরিয়ে অফিসারটি হেসে বলল। অচিরেই আপনি আমাকে সব কথা বলবেন। একজন সহযোগীর সঙ্গে দেখা হয়ে খুব খুশি হলাম। আচ্ছা, এই লোকটাকে নিয়ে কি কা যায় বলুন তো? ভাইয়ের মতো পিয়েরকে সম্বোধন করে বলল।
শেষ প্রশ্নের জবাবে আর একবার মকার আলেক্সিভিচের পরিচয় দিয়ে পিয়ের জানাল, তাদের আসার ঠিক আগেই এই পাগলা বুড়োটা গুলিভরা পিস্তলটা হাতিয়ে নেয়, তার কাছ থেকে সেটা ছিনিয়ে নেবার সময় তারা পায়নি; কাজেই একাজের জন্য অফিসার যেন তাকে শাস্তি না দেয়।
ফরাসিটি বুক ফুলিয়ে দু হাতে একটা গম্ভীর অঙ্গভঙ্গি করল।
আপনি আমার জীবন রক্ষা করেছেন। আপনি একজন ফরাসি। আপনি বলছেন ওকে ক্ষমা করতে? আপনার প্রার্থনা মঞ্জুর। লোকটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি সোৎসাহে কথাগুলি বলে পিয়েরের হাত ধরে তাকে নিয়ে অফিসার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।
