১৮০৯ সালে একটি জার্মান ছাত্র যখন ভিয়েনাতে নেপোলিয়নের প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ সবই পিয়ের জানে। সে জানে যে ছাত্রটিকে গুলি করে মারা হয়েছিল। নিজের পরিকল্পনা মতো কাজ করতে হলে নিজের জীবনের যে ঝুঁকি নিতে হবে সেই চিন্তাই তাকে আরো বেশি উত্তেজিত করে তুলল।
দুটি প্রবল অনুভূতি দুর্বার বেগে পিয়েরকে এই উদ্দেশ্যের দিকে টানছে। প্রথম অনুভূতিটি হচ্ছে-সকলের আসন্ন বিপদের মুখে ত্যাগ ও কষ্ট ভোগের প্রয়োজনীয়তা; এই একই অনুভূতি তাকে ২৫ তারিখে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মোঝায়েস্ক-এ, আর সেখান থেকে যুদ্ধের একেবারে ঘন আর্বতের মাঝখানে এবং এখনো তাকে নিজের বাড়ি থেকে বের করে এনেছে, চিরাভ্যস্ত বিলাস ও আরামের পরিবর্তে তাকে শুতে দিয়েছে শক্ত সোফায় আর খেতে দিচ্ছে গেরাসিমের সঙ্গে একই খাদ্য। অপর অনুভূতিটি হচ্ছে যা কিছু গতানুগতিক, কৃত্রিম ও মানবিক-যাকে অধিকাংশ মানুষ জাগতিক পরমার্থ বলে মনে করে–তার প্রতি রুশ মনের স্বাভাবিক অস্পষ্ট বিরাগ।
এদিকে আজ যদি সে অন্য সকলের মতো মস্কো ছেড়ে চলে যায় তাহলে তার বাড়ি থেকে পলায়ন, এই চাষীর কোট, এই পিস্তল, রস্তভদের কথা, তার ঘোষণা যে সে মস্কোতেই থাকবে,-সবই যে অর্থহীন হয়ে পড়বে; শুধু তাই নয়, সবই হবে ঘৃণাৰ্হ ও হাস্যকর, আর সেটাই পিয়েরের পক্ষে অসহ্য।
যেমন হয়ে থাকে, পিয়েরের শারীরিক অবস্থাও তার মানসিক অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। অনভ্যস্ত মোটা খাবার, কদিনের অনবরত ভদকা পান, মদ ও চুরুটের অভাব, নোংরা পোশাক, শয্যাবিহীন ঘোট সোফায় প্রায় নিদ্রাহীন দুটি রাত যাপন-সব কিছু মিলে তাকে এমন একটা উত্তেজনার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে যেটা পাগলামিরই নামান্তর।
.
দুপুর দুটো। ফরাসিরা মস্কোতে ঢুকে পড়েছে। পিয়ের তা জানে, তবু কাজের পথে না গিয়ে সে শুধু মনে মনে তার পরিকল্পনার বিস্তারিত বিবরণ নিয়েই চিন্তা করছে। কল্পনায় আঘাত হানবার কথা অথবা নেপোলিয়নের মৃত্যুর কথা যত না ভাবছে তার চাইতে অনেক বেশি করে, অসাধারণ স্পষ্টতা ও বিষণ্ণ আনন্দের সঙ্গে কল্পনা করছে নিজের ধ্বংস ও বীরত্বপূর্ণ কষ্টসহিষ্ণুতার কথা।
ভাবছে, হ্যাঁ, একাকি, সকলের জন্য, আমি হয় এ কাজ করব, নয়তো মরব। হ্যাঁ, এগিয়ে যাব…তারপর সহসা…পিস্তল, না ছুরি?…একই কথা! বলব, আমি নই, বিধাতার হাতই তোমাকে শাস্তি দিল…সে কল্পনা করল, নেপোলিয়নকে মারবার সময় এই কথাগুলি তাকে বলবে। এবার আমাকে ধর, মৃত্যুদণ্ড দাও! মাথাটা নুইয়ে বিষণ্ণ অথচ কঠিন মুখে সে নিজেকেই বলতে লাগল।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পিয়ের যখন এইভাবে নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল তখন পড়ার ঘরের দরোজা খুলে দ্বারপথে দেখা দিল মকার আলেক্সিভিচের মূর্তি; আগে সে ছিল কত ভীরু, কিন্তু এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
ড্রেসিং-গাউনটা বাঁধা হয়নি, মুখটা রক্তিম ও বিকৃত। মনে হয় মদ খেয়েছে। পিয়েরকে দেখে প্রথমে কিছুটা বিচলিত হল, কিন্তু পিয়েরের মুখের বিমূঢ় ভাব লক্ষ্য করে সঙ্গে সঙ্গে সাহস ফিরে পেল; স্খলিত পায়ে ঘরের মাঝখানে এগিয়ে গেল।
দৃঢ় কর্কশ গলায় বলল, ওরা ভয় পেয়েছে। আমি বলছি, আমি আত্মসমর্পণ করব না, আমি বলছি…ঠিক বলিনি স্যার?
সে থামল; হঠাৎ টেবিলের পিস্তলটা চোখে পড়ায় অপ্রত্যাশিত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সেটা তুলে নিয়ে ছুটে বারান্দায় চলে গেল।
গেরাসিম ও দারোয়ান মকার আলেক্সিভিচের পিছন পিছনই এসেছিল; তারা তাকে থামিয়ে পিস্তলটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করল। বারান্দায় বেরিয়ে এসে পিয়ের এই আধপাগল বুড়ো লোকটার দিকে করুণা ও বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাল। মকার আলেক্সিভিচ ভুরু কুঁচকে পিস্তলটা আঁকড়ে ধরে কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল; তার মাথায় নিশ্চয় কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজের ছবি ঢুকেছে।
অস্ত্র নাও! আটক কর! না, এটা তোমরা পাবে না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। ভালো মানুষের মতো-দয়া করুন স্যার, ওসব যেতে দিন! দয়া করে…কনুই দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে মকার আলেক্সিভিচকে দরোজার দিকে নিয়ে যেতে যেতে গেরাসিম বলতে লাগল।
কে তুমি? বোনাপার্ত!…মকার আলেক্সিভিচ চেঁচিয়ে বলল।
কথাটা ঠিক হল না স্যার। দয়া করে আপনার ঘরে চলুন, বিশ্রাম নিন। পিস্তলটা আমাকে দিন।
সরে যা হীন ক্রীতদাস! আমাকে ছুঁস না! এটা দেখছিস? মকার আলেক্সিভিচ পিস্তলটা ঘুরিয়ে বলল।
গেরাসিম ফিসফিস করে দারোয়ানকে বলল, ধরে ফেল!
তারা দুইজনে মকার আলেক্সিভিচের হাতে ধরে টানতে টানতে দরোজার দিকে নিয়ে চলল।
একটা ধস্তাধস্তির বিশৃঙখল শব্দ ও একটা কর্কশ মাতালের কণ্ঠস্বরে বারান্দাটা ভরে উঠেছে।
সহসা আরো একটা শব্দ, একটা মর্মভেদী নারীকণ্ঠের আর্তনাদ ধ্বনিত হল, আর রাঁধুনিটি ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে এল।
তারা এসে পড়েছে! হা ভগবান! হে প্রভু, তারা চারজন, অশ্বারোহী! রাঁধুনি চেঁচিয়ে বলল।
গেরাসিম ও দারোয়ান মকার আলেক্সিভিচকে ছেড়ে দিল; নিস্তব্ধ বারান্দায় শোনা যেতে লাগল সামনের দরোজায় কয়েকটি হাতের খটখট শব্দ।
.
অধ্যায়-২৮
পিয়ের স্থির করেছে যতদিন তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হয় ততদিন নিজের পরিচয় গোপন রাখবে এবং সে যে ফরাসি জানে সেটাও প্রকাশ করবে না।
