আন্না মিখায়লভনা তাদের একজনকে জিজ্ঞাসা করল, এটা কি প্রিন্সেসদের ঘরে যাবার পথ?
যেন এখন সবকিছুই চলতে পারে এমনি ভাব দেখিয়ে পরিচারকটি জোর গলায় বলল, হ্যাঁ, বাদিকের দরজা ম্যাম।
ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছে পিয়ের বলল, কাউন্ট হয়তো আমাকে ডেকে পাঠান নি। আমি বরং আমার নিজের ঘরেই চলে যাই।
আন্না মিখায়লভনা তার উঠে আসার অপেক্ষায় একটু দাঁড়াল।
সেদিন বিকেলে ছেলের সঙ্গে কথা বলার সময় যেমনটি করেছিল সেই ভাবে পিয়েরের কাঁধে হাত রেখে মহিলা বলল, দেখ বাবা, বিশ্বাস কর যে তোমার চাইতে আমার দুঃখটা কিছু কম নয়। কিন্তু মানুষের মতো হও!
চশমার উপর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে পিয়ের বলল, কিন্তু সত্যি বলছি, আমার চলে যাওয়াই ভালো।
আহা, তোমার প্রতি যদি অন্যায় কিছু হয়েই থাকে সেটা ভুলে যাও। শুধু ভাব যে তিনি তোমার বাবা…হয়তো এখন তিনি মৃত্যু-যন্ত্রণায় ভুগছেন। মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রথম থেকেই তোমাকে আমি ছেলের মতো ভালোবেসেছি। আমার উপর ভরসা রেখো পিয়ের। তোমার স্বার্থ আমি ভুলব না।
পিয়ের একটা কথাও বুঝল না, কিন্তু এ সব যে ঘটতে বাধ্য সেই ধারণা তার মনে দৃঢ়তর হল। বাধ্য ছেলের মতো সে আন্না মিখায়লভনাকে অনুসরণ করল। মহিলা ততক্ষণে দরজাটা খুলে ফেলেছে।
দরজা দিয়ে একটা পিছনের ছোট ঘরে ঢোকা গেল। সেখানে এক কোণে বসে প্রিন্সের একটি বুড়ো চাকর মোজা বুনছিল। বাড়ির এ দিকটায় পিয়ের কখনো আসে নি, এ সব ঘরের অস্তিত্বের কথাও সে জানে না। ট্রের উপরে একটা ডিক্যান্টার নিয়ে একটি দাসী তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, তাকে আদর করে সোনা, মণি বলে ডেকে আন্না মিখায়লভনা প্রিন্সেসদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিল; তারপর পিয়েরকে নিয়ে পাথরের দালান ধরে এগিয়ে চলল। বাঁদিকে প্রথম দরজাটা দিয়ে প্রিন্সেসদের মহলে যাবার পথ। ডিক্যান্টার হাতে দাসীটি তাড়াতাড়িতে দরজাটা বন্ধ করে যায় নি (সেই সময়ে বাড়িতে সবকিছুতেই একটা তাড়াহুড়া চলছে); পিয়ের ও আন্না মিখায়লভনা যেতে যেতে পাশের সেই ঘরটার দিকেই চোখ ফেলল যেখানে প্রিন্স ভাসিলি ও বড় প্রিন্সেস ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে কথা বলছিল। তাদের যেতে দেখে প্রিন্স ভাসিলি আচমকা সরে বসল। আর প্রিন্সেস লাফ দিয়ে উঠে বেপরোয়াভাবে গায়ের সব জোর দিয়ে দরজাটাকে সশব্দে বন্ধ করে দিল।
কাজটা প্রিন্সেসের স্বভাবের পক্ষে এতই বেমানান এবং প্রিন্স ভাসিলির মুখে যে ভয়ের ভাব খেলে গেল সেটাও তার মর্যাদার পক্ষে এতই খাপছাড়া যে পিয়ের থেমে গিয়ে প্রশ্ন দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকাল। আন্না মিখায়লভনা কোনো রকম বিস্মিত হল না; ঈষৎ হেসে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল মাত্র; যেন বলতে চাইল যে এই রকম কিছুই সে আশা করেছিল।
পিয়েরের চাউনির উত্তরে সে বলল, মানুষ হতে শেখ বাবা। তোমার স্বার্থ আমি দেখব। সে আরো দ্রুত পা চালিয়ে দিল।
পিয়ের এ সবকিছুই বুঝতে পারছে না; তার স্বার্থ দেখার মানে কি তাও না; কিন্তু সে ধরে নিয়েছে যে যা হচ্ছে তাই হতে বাধ্য। দালান পার হয়ে কাউন্টের অভ্যর্থনা-ঘরের পাশের একটা বড় স্বল্পালোকিত ঘরে তারা ঢুকল। এ ঘরটা পিয়েরের কাছে পরিচিত; কিন্তু এখানেও দেখা গেল একটা শূন্য স্নানের টব; কার্পেটের উপর পানি ছড়িয়ে আছে। ধুনোচি হাতে একজন ডিয়েকন ও একটি চাকরের সঙ্গে তাদের দেখা হল। কিন্তু তাদের লক্ষ্য না করেই দুজন পা টিপে টিপে চলে গেল। তারা অভ্যর্থনা-ঘরে ঢুকল। এ ঘরটা পিয়েরের পরিচিত। দুটো বড় ইতালিয় জানালা সবজি-ঘরের দিকে খোলা, বড় বড় আবক্ষ মূর্তি, আর ক্যাথারিন দি গ্রেটের একটা পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতি। সেই একই সব লোক একই অবস্থায় বসে পরস্পর ফিসফিস করে কথা বলছে। সকলে চুপ করে চোখ তুলে তাকাল–তাদের সামনে বিবর্ণা অশ্রুমুখী আন্না মিখায়লভনা আর মাথা নিচু করে ভীরু অনুসরণকারী পিয়েরের শক্ত-সমর্থ দেহ।
আন্না মিখায়লভনার মুখ দেখেই বোঝা গেল, চরম মুহূর্ত যে সমাগত সে বিষয়ে সে খুবই সচেতন। সে বুঝতে পারছে, যেহেতু এমন একজনকে সঙ্গে নিয়ে সে এসেছে যার সঙ্গে মুমূর্ষ লোকটি দেখা করতে ইচ্ছুক, কাজেই নিজের প্রবেশ সম্পর্কে সে নিশ্চিত। ঘরের চারদিকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে, কাউন্টের স্বীকৃতি গ্রহণকারীকে দেখতে পেয়ে সে সেই দিকে এগিয়ে গেল এবং প্রথমে তার ও পরে অপর একজন পুরোহিতের আশীর্বাদ গ্রহণ করল।– একজন পুরোহিতকে সে বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আপনি ঠিক সময়েই এসেছেন। আমরা আত্মীয়স্বজনরা
এত উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছি। আবোরা নরম গলায় বলল, এই যুবকটি কাউন্টের ছেলে। কী ভয়ংকর মুহূর্ত!
এই কথা বলেই সে ডাক্তারের কাছে গেল।
বলল, প্রিয় ডাক্তার, এই যুবকটি কাউন্টের ছেলে। কোনো আশা আছে কি?
ডাক্তার তাড়াতাড়ি উপরের দিকে চোখ তুলে নীরবে কাঁধে ঝাঁকুনি দিল। আন্না মিখায়লভনা কাঁধ ও চোখের সেই একই ভঙ্গি করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল; তারপর ডাক্তারের কাছ থেকে পিয়েরের কাছে সরে গেল। বিশেষ শ্রদ্ধায় ও মমতায় বিষণ্ণ গলায় তাকে বলল :
তাঁর করুণায় বিশ্বাস রেখো একটা ছোট সোফা দেখিয়ে তাকে বসতে বলে মহিলা নীরবে দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল। সকলেরই দৃষ্টি সেই দরজার দিকে। দরজায় কাঁচ করে একটু শব্দ হল; মহিলা দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।
