ফরাসিরা বলে, রস্তপচিনের হিংস্র দেশপ্রেমই মস্কোর অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী, রুশরা বলে দায়ী ফরাসিদের বর্বরতা। আসলে কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করে মস্কোর অগ্নিকাণ্ডকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। মস্কোকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ সেখানকার যে অবস্থা হয়েছিল তাতে একশ ত্রিশটি নিম্নমানের অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থাকুক আর নাই থাকুক, কাঠের তৈরি যে কোনো শহরই পুড়তে বাধ্য। খড়কুটোর তূপের উপর কয়েক দিন ধরে অনবরত আগুনের ফুলকি পড়লে সেটা যেমন পুড়তে বাধ্য ঠিক তেমনই পরিত্যক্ত মস্কোর অগ্নিদগ্ধ হওয়াও ছিল অনিবার্য। বাড়ির মালিকরা যখন বাড়িতে বাস করে এবং একটা পুলিশ বাহিনী উপস্থিত থাকে তখনো যে কাঠের তৈরি শহরে অগ্নিকাণ্ড ছাড়া একটা দিনও কাটে না, সেই শহরের অধিবাসীরা যখন ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, সেসব দখল করেছে সৈন্যরা, তারা পাইপ টানছে, সেনেট ভবনের চেয়ার দিয়ে সেনেট স্কোয়ারেই আগুন জ্বালাচ্ছে, দিনে দুইবার করে খানা পাকাচ্ছে, তখন কি সে শহরে আগুন না লেগে পারে! রস্তপচিনের হিংস্র দেশপ্রেম এবং ফরাসিদের বর্বরতাকে এ ব্যাপারে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। মস্কোতে আগুন লাগিয়েছিল সৈন্যদের পাইপ, রান্নাঘরের ও শিবিরের আগুন, আর পরের বাড়ি দখল করেছিল যে শত্রু সৈন্যরা তাদের অসতর্কতা। গৃহদাহের ঘটনা যদি ঘটেও তাকে তবু সেটাকেই কারণ বলে ধরা চলে না, কারণ গৃহদাহের কোনো ঘটনা না ঘটলেও মস্কো অগ্নিদগ্ধ হতই।
ফরাসিদের পক্ষে রস্তপচিনের হিংস্রতাকে দায়ী করা এবং রুশদের পক্ষে শয়তান বোনাপার্তকে দায়ী করা যতই লোভনীয় হোক, একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে অগ্নিকাণ্ডের সেরকম কোনো প্রত্যক্ষ কারণ ছিল না, কারণ মালিকরা যখন কোনো গ্রাম, কারখানা, বা বাড়ি ছেড়ে যায় এবং অপরিচিত লোকদের সেখানে বাস করতে ও পরিজ রান্না করতে দেওয়া হয়, তখন সেই গ্রাম, কারখানা বা বাড়িতে যেমন আগুন লাগতে বাধ্য, তেমনই মস্কোর অগ্নিকাণ্ডও ছিল অনিবার্য। একথা সত্য যে অধিবাসীরাই মস্কোকে পুড়িয়েছিল, কিন্তু পুড়িয়েছিল সেই অধিবাসীরা যারা মস্কো ছেড়ে চলে গিয়েছিল, মস্কোতে যারা তখনো ছিল তারা নয়। বার্লিন, ভিয়েনা এবং অন্যসব শহরের মতো শকবলিত মস্কো যে অক্ষুণ্ণ থাকল না তার সহজ কারণ তার অধিবাসীরা শহরকে ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল, শহরে থেকে তারা রুটি ও নুন দিয়ে ফরাসিদের অভ্যর্থনা করেনি, শহরের চাবি তাদের হাতে তুলে দেয়নি।
.
অধ্যায়–২৭
মস্কোর জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলেমিশে ফরাসিরা একসময় এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছল যেখানে ২রা সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পিয়ের নিজেও বাস করছিল।
অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একান্ত নির্জনে দুটো দিন কাটাবার পরে পিয়েরের মনের অবস্থা তখন প্রায় পাগলামির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। একটিমাত্র চিন্তাই তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই চিন্তাটি কখন কীভাবে তার মাথায় ঢুকেছে তা সে জানে না, কিন্তু অতীতের কিছুই তার মনে নেই, বর্তমানের কথাও কিছুই সে বোঝে না, যা কিছু দেখে আর যা কিছু শোনে সবই তার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হয়।
জীবনের দাবির যে জটিল জালে সে বাঁধা পড়েছে, বর্তমান অবস্থায় যার হাত থেকে সে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না, তার কবল থেকে পালাবার জন্যই সে বাড়ি ছেড়েছে। জোসেফ আলেক্সিভিচের বাড়িতে সে এসেছিল স্বৰ্গত মানুষটির বই ও কাগজপত্রের বিলি-ব্যবস্থা করার অছিলায়, কিন্তু আসলে সে এসেছিল জীবনের গোলযোগের কবল থেকে শান্তির সন্ধানে, কারণ তার মনে জোসেফ আলেক্সিভিচের স্মৃতি যে শাশ্বত, গম্ভীর, শান্ত চিন্তার সঙ্গে জড়িত সেটা তার নিজের তৎকালীন অশান্ত জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে তখন খুঁজছিল একটি শান্ত আশ্রয়, সেই আশ্রয়ই সে পেয়ে গেল জোসেফ আলেক্সিভিচের পড়ার ঘরে। পড়ার ঘরের মৃত্যুশীতল নিস্তব্ধতার মধ্যে সে যখন ধূলিমলিন লেখার টেবিলের উপর কনুই রেখে বসে থাকে তখনই একের পর এক বিগত কয়েকদিনের স্মৃতি, বিশেষ করে বরদিনো যুদ্ধের স্মৃতি-কল্পনায় তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বড়ই তুচ্ছ ও অর্থহীন বলে মনে হয়। গেরাসিম যখন তাকে দিবাস্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তুলল তখনই তার মনে হল যে জনসাধারণ কর্তৃক মস্কোকে রক্ষার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে সেও অংশ নেবে। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই সে গেরাসিমকে বলল তাকে একটা চাষীর কোট ও একটা পিস্তল যোগাড় করে দিতে। তাকে আরো জানাল যে নিজের নাম গোপন করে সে জোসেফ আলেক্সিভিচের বাড়িতেই থাকবে।
তারপর মস্কো রক্ষার কাজে জনসাধারণের সঙ্গে যোগ দেবার উদ্দেশ্য নিয়ে কোটটা কিনবার পরেই যখনই রস্তভদের সঙ্গে পিয়েরের দেখা হয়ে গেল এবং নাতাশা তাকে বলল : আপনি কি মস্কোতেই আছেন?…কী চমৎকার! তখনই চকিতে তার মনে হল যে সত্যি তো, মস্কো যদি বেদখল হয়েও যায় তবু তার পক্ষে এখানে থেকে নিয়তিনির্দিষ্ট কাজে আত্মনিয়োগ করাই তো সবচাইতে ভালো কাজ।
কোনো কিছুতেই পিছ-পা হবে না এই ধারণা নিয়েই পরদিন সে তিনপাহাড় ফটকে গেল। কিন্তু সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে যখন তার মনে স্পষ্ট ধারণা হল যে মস্কোকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হবে না তখনই হঠাৎ তার মনে হল, যে কাজকে আগে সে একটা সম্ভাবনামাত্র বলে মনে করেছিল সেটাই এখন হয়ে উঠেছে একান্ত প্রয়োজনীয় ও অনিবার্য। নাম ভাড়িয়ে তাকে মস্কোতে থাকতেই হবে, নেপোলিয়নের সঙ্গে দেখা করে তাকে হত্যা করতে হবে, হয় নিজে মরবে আর না হয় সারা ইওরোপের সব দুঃখের অবসান করবে–তার ধারণা একমাত্র নেপোলিয়নের জন্যই ইওরোপের এত দুঃখ।
