এসব সরিয়ে ফেল! কড়িকাঠ ও মৃতদেহগুলি দেখিয়ে একজন অফিসার হুকুম করল, আর ফরাসি সৈন্যরা আহতদের পাঠিয়ে দিয়ে মৃতদেহগুলিকে আলিসার উপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
এই লোকগুলি কারা তা কেউ জানল না। ওদের সরিয়ে ফেল! ওদের সম্পর্কে শুধু এইটুকুই বলা হল। আর আলিসার উপর দিয়ে তাদের ছুঁড়ে ফেলা হল, এবং পরে যাতে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে সেজন্য পরে সেখান থেকেও সরিয়ে দেওয়া হল। একমাত্র থিয়েই তাদের স্মৃতির প্রতি কয়েকটি উচ্ছ্বসিত পংক্তি উৎসর্গ করেছে : এই হতভাগ্যরা পবিত্র দুর্গ দখল করেছিল, অস্ত্রাগার থেকে নিজেরাই বন্দুক সগ্রহ করে ফরাসিদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল। তাদের অনেকেই তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল; ক্রেমলিনকে মুক্ত করা হয়েছিল তাদের উপস্থিতি থেকে।
মুরাৎকে জানানো হল, রাস্তা পরিষ্কার। ফরাসিরা ফটকের ভিতর ঢুকে পড়ল, সেনেট স্কোয়ারে তার খাটাল। সেনেট ভবনের জানালা দিয়ে সৈনিকরা জ্বালানির জন্য চেয়ার ছুঁড়ে ফেলতে লাগল স্কোয়ারের মধ্যে, আর তাই দিয়ে সেখানে আগুন জ্বালানো হল।
অন্য সেনাদলগুলি ক্রেমলিনের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে মরসেকা, লুবিয়াংকা ও পক্ৰোভকা স্ট্রিট বরাবর শিবির ফেলল। অন্যরা আস্তানা পাতল ভজদভিঝেংকা, নিকোলস্কি ও তিরস্কয় স্ট্রিটে। কোনো বাড়ির মালিককে খুঁজে না পাওয়ায় শহরে স্বাভাবিক ব্যবস্থামতো ফরাসিদের কোথাও অধিবাসীদের কাঁধে চাপানো গেল না; সকলেই তাঁবুতে বাসা বাঁধল।
ফরাসিরা ছিন্নবাস, ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত এবং মূল সংখ্যার তিনভাগের একভাগে পরিণত হলেও সুন্দর শোভাযাত্রা সহকারেই মস্কোতে প্রবেশ করল। সেনাদল শ্রান্ত ও ক্ষীণবল, তবু সংগ্রামশীল ও ভয়ংকর। কিন্তু বিভিন্ন আস্তানায় চলে যাবার আগে পর্যন্তই তারা ছিল সৈনিক। কিন্তু যে মুহূর্তে বিভিন্ন রেজিমেন্টের সৈন্যরা ঐশ্বর্যবানদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলিতে ছড়িয়ে পড়ল তখন থেকেই সেনাবাহিনী কোথায় হারিয়ে গেল, তার জায়গায় দেখা দিল এমন কিছু জীব যারা পরিচয়হীন,না নাগরিক না সৈন্য, তাদের বলা চলে লুঠেরার দল। পাঁচ সপ্তাহ পরে সেই মানুষগুলিই যখন মস্কো ছেড়ে চলে গেল তখন আর তারা একটা সেনাদল হয়ে গড়ে উঠতে পারল না। তারা তখন একদল উচ্ছল লুঠেরা, যার কাছে যা মূল্যবান বা দরকারি মনে হল সেই জিনিসই হাতিয়ে নিয়ে তারা চলে গেল। মস্কো ছেড়ে যাবার সময় কারো লক্ষ্যই আর জয় করা নয়, তাদের একমাত্র লক্ষ্য যে যা পেয়েছে সেটাকে হাতে রাখা। একটা বাঁদর যেমন সরু গলা কলসির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মুঠোভর্তি বাদাম পেয়ে সেগুলো হারাবার ভয়ে কিছুতেই মুঠি খোলে না এবং মারা যায়, সেইরকম ফরাসিরা যখন মস্কো ছেড়ে গেল তখন তাদেরও মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠল, কারণ লুঠের মাল সঙ্গে নিয়েই তারা চলল, আর যা তারা চুরি করেছে তা ফেলে যাওয়াও বাদরের বাদাম ফেলে যাওয়ার মতোই অসম্ভব। প্রতিটি রেজিমেন্ট মস্কোর একটা অঞ্চলে ঢুকবার দশ মিনিট পরেই একটি সৈনিক বা অফিসারের আর পাত্তা পাওয়া গেল না। সামরিক ইউনিফর্ম ও চটের বুটপরা লোকগুলিকে দেখা গেল এ ঘর থেকে ও ঘরে হেসে হেসে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মদের ঘরে এবং ভাড়ার ঘরেও সকলকে খাবারদাবার নিয়ে ব্যস্ত দেখা গেল, কেউবা ভাঙছে গাড়ি ঘরের তালা। কেউ বা আস্তাবলের দরোজা, কেউ বা রান্নাঘরে আগুন জ্বালিয়ে আস্তিন গুটিয়ে ময়দা মাখছে, রুটি সেঁকছে, আবার মেয়েদের ও বাচ্চাদের কখনো ভয় দেখাচ্ছে, কখনো তাদের নিয়ে মজা করছে, আদর করছে। দোকান ও বাড়িগুলোতে এধরনের মানুষ অনেক আছে, কিন্তু একটিও সৈনিক কোথাও নেই।
ফরাসি কমান্ডাররা হুকুমের পর হুকুম জারি করল, সৈন্যদের শহরে ছড়িয়ে পড়া নিষিদ্ধ করা হল, অধিবাসীদের উপর অত্যাচার-উৎপীড়ন অথবা লুঠতরাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হল, সেই সন্ধ্যায় সৈন্যদের নাম-ডাকবার কথাও ঘোষণা করা হল। কিন্তু এতসব ব্যবস্থা সত্ত্বেও যেসব মানুষ একটু আগে পর্যন্তও ছিল একটা সেনাদল তারাই প্রচুর আরাম ও জিনিসপত্র সমন্বিত ঐশ্বর্যশালী পরিত্যক্ত শহরটার বুকে জলস্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ল। একদল ক্ষুধার্ত গরু-মোষ যখন ফসলহীন মাঠ পার হয় তখন তাদের সহজেই বাগে রাখা যায়, কিন্তু যেই তারা একটা ফসলভরা মাঠে পৌঁছয় অমনি তারা হাতের বাইরে চলে যায়, ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ে; ফরাসি সৈন্যরা সেইভাবেই সমৃদ্ধ শহরটার বুকে ছড়িয়ে পড়ল।
মস্কোর অধিবাসীরা কেউ নেই; জল যেরকম বালির ভিতর দিয়ে চুঁইয়ে নিচে পড়ে, সৈন্যরাও সেইরকম ক্রেমলিন থেকে বেরিয়ে দুর্বার গতিতে শহরের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। একটা অশ্বারোহী সেনাদল কোনো ব্যবসায়ীর বাড়িতে ঢুকে সেখানে ঘোড়া রাখবার মতো যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অন্য আর একটা বাড়িতে গিয়ে ঢুকল। কারণ সেটাকে আরো একটু ভালো বলে মনে হল। অনেকেই কয়েকটা বাড়ি দখল করে নিয়ে খড়ি দিয়ে তাদের নাম লিখে রাখল, আর তাই নিয়ে অন্য দলের সঙ্গে ঝগড়া করল, এমন কি লড়াই পর্যন্ত করল। বাসস্থান ঠিক করার আগেই সৈন্যরা শহর দেখতে পথে বেরিয়ে পড়ল; যখন শুনল যে সবকিছুই পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে তখন তারা সেইসব জায়গার উদ্দেশ্যে ছুটল যেখানে মূল্যবান জিনিসপত্র মিলবে। অফিসাররা ছুটল সৈন্যদের বাধা দিতে, কিন্তু তারাও সেই একই কাজে লেগে গেল। সামান্য কিছু অধিবাসী যারা মস্কোতেই ছিল তারা লুঠের হাত থেকে বাঁচবার জন্য কমান্ডিং অফিসারদের নিজ নিজ বাড়িতে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এল। প্রচুর ঐশ্বর্য; তার কোনো সীমা নেই; ফরাসিরা যেসব অঞ্চল দখল করেছে তার চারপাশে রয়েছে আরো কত অনাবিষ্কৃত বেদখল অঞ্চল; তারা ভাবল সেখানে হয়তো আরো ধনরত্ন পাওয়া যাবে। মস্কো যেন ক্রমেই সেনাদলকে পাকে পাকে বেশি করে ঘিরে ধরল। শুকনো মাটিতে যখন জল ঢালা হয় তখন জল ও মাটি দুইই অদৃশ্য হয়ে যায়, দেখা দেয় কাদা; ঠিক সেইরকম একটা সমৃদ্ধ পরিত্যক্ত শহরে ক্ষুধার্ত সেনাদলের প্রবেশের ফলে দেখা দিল অগ্নিকাণ্ড ও লুঠতরাজ; সেনাদল ও সমৃদ্ধ শহর দুইই ধ্বংস হল।
