এই কথাগুলি বলার সময় কুতুজভ মনে মনে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কিছু ভাবছিল অথবা ইচ্ছা করেই সে কথাগুলি বলল; রস্তপচিন কিন্তু আর কোনো কথা না বলেই দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। আর কী আশ্চর্যের কথা, মস্কোর শাসনকর্তা গর্বোদ্ধত কাউন্ট রস্তপচিন একটা কসাক চাবুক হাতে নিয়ে সেতুর কাছে গিয়ে হাজির হল এবং পথ-অবরোধকারী গাড়িগুলোকে হটিয়ে দিতে সমানে চিৎকার করতে লাগল।
১১.৩ মুরাৎ-এর সৈন্যরা
অধ্যায়-২৬
বিকেল চারটে নাগাদ মুরাৎ-এর সৈন্যরা মস্কোতে ঢুকতে শুরু করল। সকলের আগে অশ্বপৃষ্ঠে উতেমবের্গ হুজারদের একটা দল, তাদের পিছনে অসংখ্য দলবল নিয়ে নেপলস-এর রাজা স্বয়ং।
আর্বাত স্ট্রিটের মাঝামাঝি সেন্ট নিকলাসের অলৌকিক দেবমূর্তির গির্জার কাছে পৌঁছে মুরাৎ থামল; লে ক্রেমলিন দুর্গের অবস্থা জানবার জন্য যে অগ্রবর্তী সেনাদলকে পাঠানো হয়েছে তাদের খবরের জন্যই সে অপেক্ষা করতে লাগল।
যারা মস্কোতেই থেকে গেছে তাদের একটা দল মুরাতের চারপাশে ভিড় করল। পালক ও সোনার পোশাকে সজ্জিত লম্বা-চুল এই বিচিত্র সেনাপতিটিকে দেখে তারা বিস্ময়বিমূঢ়ভাবে তার দিকে তাকাতে লাগল।
নিচুগলায় তাদের বলতে শোনা গেল, ইনিই কি ওদের জার না কি? তা লোকটি মন্দ নয়?
একজন অশ্বারোহী দোভাষী তাদের দিকে এগিয়ে গেল।
মাথার টুপি খুলে ফেল…সব টুপি খুলে ফেল। ভিড়ের মধ্যে একজনের মুখ থেকে আরেকজনের মুখে মুখে কথাটা ফিরতে লাগল। দোভাষী বুড়ো দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করল ক্রেমলিন অনেক দূরে কি না। অনভ্যস্ত পোলিশ উচ্চারণে বিব্রত দারোয়ান বুঝতেই পারল না যে দোভাষী রুশ ভাষাতেই কথা বলছে তার কথা কিছুই বুঝতে না পেরে সে ভিড়ের মধ্যে সরে পড়ল।
মুরাৎ দোভাষীর কাছে এগিয়ে এসে বলল, ওদের জিজ্ঞাসা কর রুশসৈন্যরা কোথায় আছে। একজন রুশ কথাটা বুঝতে পারল, আর সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই একযোগে দোভাষীর প্রশ্নের জবাব দিতে লাগল। অগ্রবর্তী সেনাদল থেকে ফিরে এসে একজন ফরাসি অফিসার জানাল, দুর্গের ফটকে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে, আর সম্ভবত সেখানে একদল সৈন্য লুকিয়ে ওৎ পেতে আছে।
ভালো কথা! বলে মুরাৎ দলের একজনের দিকে ফিরে হুকুম দিল, ফটকের উপর গোলাবর্ষণের জন্য চারটে হাল্কা কামান সেইদিকে নিয়ে যাওয়া হোক।
মুরাতের পিছন পিছন কামানগুলি এগিয়ে চলল; আৰ্বাত পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ভজদভিঝেংকা স্ট্রিটের শেষ প্রান্তে পৌঁছে তারা থেমে গেল; স্কোয়ারের মধ্যে সৈন্য সমাবেশ করল। কয়েকজন ফরাসি অফিসার কামান বসানোর কাজের তত্ত্বাবধান করতে করতে ছোট দুরবীণে চোখ লাগিয়ে ক্রেমলিনকে দেখতে লাগল।
ক্রেমলিনে সান্ধ্য-উপাসনার ঘণ্টা বাজছে; সে শব্দ শুনে ফরাসিরা সচকিত হয়ে উঠল; তারা ধরে নিল ওটা সৈন্যদের প্রতি সংকেত-ধ্বনি। কয়েকজন পদাতিক সৈনিক কুতাফিয়েভ ফটকের দিকে ছুটে গেল। সেখানে কড়িকাঠ ও কাঠের পর্দা বসানো হয়েছে, আর অফিসার ও সৈন্যরা সেদিকে ছুটে যেতেই ফটকের নিচ থেকে দুটো বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হল। কামানের পাশে দণ্ডায়মান একজন সেনাপতি অফিসারকে কিছু নির্দেশ দিতেই সে আবার তার সৈন্যদের নিয়ে সেখানে ছুটে গেল।
ফটক থেকে আরো তিনটে গুলির শব্দ এল। একটা গুলি লাগল জনৈক ফরাসি সৈনিকের পায়ে, আর পর্দার পিছন থেকে কয়েকটি গলার অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গে যেন কোনো হুকুম এসেছে এমনিভাবে ফরাসি সেনাপতি, অফিসার ও সৈনিকদের মুখের আনন্দ-প্রশান্তির পরিবর্তে দেখা দিল সগ্রাহ ও কষ্ট সহ্য করার সংহত প্রস্তুতির দৃঢ়তা। মার্শাল থেকে সাধারণ সৈনিক পর্যন্ত প্রত্যেকের কাছেই এ জায়গাটা আর ভজদভিঝেংকা, বা মখাভায়া, বা কুতাফিয়েভ স্ট্রিট, অথবা ত্রয়স্তা ফটক নয়, এটা একটা নতুন রণক্ষেত্র যা হয়তো অচিরেই রক্তক্ষয়ী হয়ে দেখা দেবে। সকলেই সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হল। ফটক থেকে ভেসে আসা চিৎকার থেমে গেল। কামানগুলো এগিয়ে চলল, গোলন্দাজ সৈনিকরা মশালের ছাই ঝেড়ে ফেলল, একজন অফিসার হুকুম দিল : কামান দাগ! তারপরই শোনা গেল দুটো গোলা ছুটে আসার শোঁ-শোঁ শব্দ। গোলা দুটি আছড়ে পড়ল ফটকের পাথরে ও কাঠের কড়ি ও পর্দার উপর; স্কোয়ারের উপর দেখা দিল দুটো ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
সেই গোলার শব্দের প্রতিধ্বনি পাথরে-গড়া ক্রেমলিনের মাথার উপর থেকে মিলিয়ে যাওয়ার কয়েকমুহূর্ত পরেই ফরাসিরা তাদের মাথার উপরে একটা বিচিত্র শব্দ শুনতে পেল। হাজার হাজার কাক প্রাচীরের উপর দিয়ে উড়ে এসে বাতাসে পাক খেতে লাগল, আর কর্কশ গলায় ডাকতে ডাকতে সশব্দে পাখা ঝাঁপটাতে লাগল। সেই শব্দের সঙ্গে মিশে ফটক থেকে ভেসে এল একটি মাত্র মানুষের চিৎকার, এবং ধোয়ার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল চাষীর কোট-পরা খোলা মাথার একটি মূর্তি। একটা বন্দুক বাগিয়ে ধরে সে ফরাসিদের দিকে তাক করল। ফরাসি অফিসার আর একবার হুকুম দিল, কামান দাগ! আর একই সঙ্গে শোনা গেল একটা বন্দুকের ও দুটো কামানের শব্দ। ফটকটা আবার ধোঁয়ায় ঢেকে গেল।
পর্দার ওপাশে কিছুই নড়ছে না; ফরাসি পদাতিক সৈন্য ও অফিসাররা ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ফটকের পথের উপর তিনজন আহত হয়ে ও চারজন মরে পড়ে আছে। চাষীর কোট-পরা দুটি লোক প্রাচীরের নিচ থেকে জনামেংকার দিকে ছুটে গেল।
