দেশের বাড়িতে পৌঁছে গৃহস্থালীর ব্যাপারে নানান নির্দেশাদি দিতে শুরু করে কাউন্ট সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেল।
আধঘণ্টা পরেই দ্রুতগামী অশ্বচালিত গাড়িতে চেপে সকোলনিকির মাঠের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে তার মনে অতীতকে নিয়ে কোনো চিন্তাই এল না, এখন তার চিন্তা শুধু যা ঘটবে তাকে নিয়ে। সে শুনেছে কুতুজভ এখন ইয়াউজা সেতুতে আছে; তাই সেখানেই সে চলেছে। কুতুজভের ধোঁকাবাজির জন্য তাকে যে ক্রুদ্ধ, হুল ফোঁটানো কথাগুলি শোনাবে সেটাই মনে মনে আওড়াচ্ছে। সেই বুড়ো শেয়ালকে সে বুঝিয়ে দেবে, শহর পরিত্যাগ করে যে দুর্গতিকে সে ডেকে এনেছে, যেভাবে রাশিয়ার সর্বনাশ ঘটিয়েছে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়বে তারই বাহাতুরে বুড়োর মাথার উপর। কুতুজভ যা যা বলবে মনে মনে সেগুলি ভাবতেই রস্তপচিন রাগে গাড়ির মধ্যেই মুখ ফিরিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
সকোলনিকির মাঠও পরিত্যক্ত। শুধু একেবারে শেষপ্রান্তে অতিথিশালা ও পাগলাগারদের সামনে শাদা পোশাকপরা কিছু লোক দেখা যাচ্ছে, আর তাদের মতোই আরো কিছু লোক মাঠে হাঁটতে হাঁটতে যার যার মতো চিৎকার করছে, হাত-পা নাড়ছে। তাদের মধ্যে একজন কাউন্ট রন্তপচিনের গাড়িচলার পথটা পার হবার জন্য সেইদিকেই ছুটে আসছে। এইসব ছাড়া-পাওয়া পাগলগুলোকে বিশেষ করে যে পাগলটা তাদের দিকে দৌড়ে আসছে তাকে দেখে স্বয়ং কাউন্ট, তার কোচয়ান ও অশ্বারোহী সৈনিকরা আতঙ্কে ও কৌতূহলে সেইদিকে ড্রেসিং-গাউন পরে লম্বা কম গলায় চিৎকার কর দাড়ি,
ঝোলা ড্রেসিং-গাউন পরে লম্বা সরু পা ফেলে এপাশ-ওপাশ দুলতে দুলতে পাগলটা সবেগে ছুটছে, তার দৃষ্টি রস্তপচিনের উপর নিবদ্ধ, কর্কশ গলায় চিৎকার করতে করতে সে ইশারায় তাকে থামতে বলছে। পাগলটার গম্ভীর, বিষণ্ণ মুখটা শুকনো ও হলদে, মুখে অসমান দাড়ি, চোখের জাফরান-হুঁদ শাদা অংশের মধে উজ্জ্বল কালো মণি দুটো নিচের পাতার কাছে অস্থিরভাবে ঘুরছে।
থাম! ঘোড়া থামাও, আমি বলছি, তীক্ষ্ণ স্বরে সে চিৎকার করে উঠল; হাত-পা নেড়ে প্রতিটি কথার উপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে সে অনবরত চেঁচাতে লাগল।
কালিচে-গাড়িটাকে ধরে ফেলে সে তার পাশে পাশে দৌড়তে লাগল।
তিনবার তারা আমাকে খুন করেছে, তিনবার আমি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে উঠেছি। তারা আমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে, ক্রুশে বিদ্ধ করেছে…আমি আবির্ভূত হবই…হবই…হবই। তারা আমার দেহটাকে ছিঁড়েছে। ঈশ্বরের রাজ্যের পতন ঘটানো হবে। তিনবার আমি তার পতন ঘটাব, আবার তিনবার তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করব! ক্রমেই গলা চড়াতে চড়াতে সে চেঁচাতে লাগল।
জনতা যখন ভেরেশচাগিনকে ঘিরে ধরেছিল তখনকার মতোই কাউন্ট রস্তপচিনের মুখটা হঠাৎ শাদা হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে নিল। কাঁপা গলায় কোচয়ানকে বলল, চালাও..আরো জোর! কালিচে-গাড়িটা যত দ্রুত সম্ভব উড়ে চলল, কিন্তু অনেকক্ষণ পর্যন্ত পাগলটার হতাশ আর্তকণ্ঠ তার কানে বাজতে লাগল, ক্রমেই দূর। হতে দূরে অস্পষ্টতর হয়ে এল; তার চোখের সামনে আর কিছু নেই, শুধু ভাসতে লাগল লোমের পটি বসানো কোট পরা সেই বিশ্বাসঘাতকের বিস্মিত, ভয়ার্ত, রক্তাক্ত মুখটা।
এই মানসিক ছবিটা এত টাটকা যে রস্তপচিনের মনে হল সেটা বুঝি তার বুকের মধ্যে কেটে বসেছে, সেখানে রক্ত ঝরাচ্ছে। এইমুহূর্তে তার স্পষ্ট মনে হল, সেই স্মৃতির রক্তাক্ত চিহ্ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাবে না, বরং সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তীব্রতর নিষ্ঠুরতায় ও বেদনায় তার বুকের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকবে। নিজের কথাগুলি এখনো তার কানে বাজছে : ওকে কেটে ফেল। আমি হুকুম দিচ্ছি!…
সে ভাবল, এ কথাগুলি কেন বলেছিলাম? হঠাৎই বলে ফেলেছি…বলার কোনো দরকার ছিল না। তাহলে তো কিছুই ঘটত না। যে অশ্বারোহী সৈনিকটি আঘাত করেছিল তার ভীত, ক্রুদ্ধ মুখটা সে যেন দেখতে পেল; লোমের পটি দেওয়া কোট-পরা ছেলেটির সেই নীরব, ভীরু তিরস্কারের দৃষ্টিটা যেন তার দিকেই পড়ে আছে। কিন্তু আমি তো নিজের জন্য একাজ করিনি। একাজ করতে আমি বাধ্য হয়েছিলাম…ক্ষিপ্ত জনতা, বিশ্বাসঘাতক, জনকল্যাণ, সে ভাবতে লাগল।
সৈন্যরা তখনো ইয়াউজা সেতুতে ভিড় করে আছে। দিনটা গরম। সেতুর পাশে একটা বেঞ্চিতে বসে কুতুজভ হাতের চাবুকটা দিয়ে বালির উপর আঁকিবুকি টানছে, এমন সময় একটা কালিচে সশব্দে এসে হাজির হল। টুপিতে পালক লাগানো, জেনারেলের ইউনিফর্মধারী একটি লোক কুতুজভের সামনে হাজির হয়ে ফরাসিতে কি যেন বলল। লোকটি কাউন্ট রস্তপচিন। কুতুজভকে বলল, সে এসেছে কারণ রাজধানী মস্কো আর নেই, সেখানে আছে শুধু সৈন্যরা।
প্রশান্ত মহামহিম যদি আমাকে না বলতেন যে আর একটা যুদ্ধ না করে তিনি মস্কো পরিত্যাগ করবেন না, তাহলে সমস্ত ব্যাপারটাই অন্যরকম হত; এসব ঘটতই না, সে বলল।
সে যা বলছে তার অর্থ বুঝতে না পেরে কুতুজভ এমনভাবে রস্তপচিনের দিকে তাকাল যেন এইমুহূর্তে লোকটির মুখে কি লেখা আছে সেটা পড়বার চেষ্টাই সে করছে। রস্তপচিন বিচলিত হয়ে চুপ করল। ঈষৎ মাথা নেড়ে স্থিরনিবদ্ধ দৃষ্টি রস্তপচিনের মুখের উপর থেকে না সরিয়েই কুতুজভ ধীরে ধীরে নিচু গলায় বলতে লাগল :
না! একটা যুদ্ধ ছাড়া আমি মস্কো পরিত্যাগ করব না!
