কেউ ভেরেশচাগিনকে আঘাত করল, তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলল, কেউ বা ঝাঁপিয়ে পড়ল লম্বা যুবকটির উপর। যারা পায়ের নিচে চাপা পড়ল আর যারা লম্বা ছেলেটাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করল তাদের মিলিত আর্তনাদে জনতার রোষবহ্নি আরো প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। রক্তাপুত যুবকটিকে তাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেবার আগেই ক্রুদ্ধ জনতা মারতে মারতে তাকে প্রায় মেরে ফেলবার উপক্রম করে ফেলেছে। আর কাজটাকে অদ্রুিত শেষ করার চেষ্টা সত্ত্বেও যারা ভেরেশচাগিনকে আঘাত করছে, গলা টিপে ধরছে, টানা-হেঁচড়া করছে তারা তাকে একেবারে শেষ করতে পারল না, কারণ ভিড়ের লোকজন চারদিক থেকে চাপ সৃষ্টি করে মাঝখানে এমনভাবে জমাট বেঁধে গেছে যে তারা না পারছে তাকে মেরে ফেলতে, না পারছে তাকে ছেড়ে দিতে।
আরে, একটা কুড় ল দিয়ে মার!…বিশ্বাসঘাতক, খৃষ্টকে বেচে দিয়েছে…এখনো প্রাণে বেঁচে আছে…নাছোড়বান্দা…ঠিক দাওয়াই দেওয়া হয়েছে। কষ্ট না দিলে চোর শায়েস্তা হয় না। টাঙ্গি চালাও!…সে কি–তবু বেঁচে আছে?
আক্রান্ত যুবকটি যখন লড়াইতে ক্ষান্ত দিল, তার চিৎকার যখন একটা একটানা লম্বা মৃত্যু-গোঙানিতে পরিণত হল, তখনই ধরাশায়ী রক্তাক্ত দেহটার চারপাশ থেকে ভিড় সরে যেতে লাগল। প্রত্যেকেই একবার এগিয়ে এসে নিজেদের কৃতকর্মের ফল দেখে ভয়ে, বিস্ময়ে ও ধিক্কারে পিছিয়ে যেতে লাগল।
হে প্রভু! মানুষ কি আজ বন্যপণ্ড হয়ে গেছে! কেমন করে এ এখনো বেঁচে আছে? ভিড়ের মধ্যে নানা কণ্ঠস্বর শোনা যেতে লাগল। আর একেবারেই ছেলেমানুষ…নিশ্চয় কোনো ব্যবসায়ীর ছেলে। কী মানুষ সব!…আর তারা বলছে ও সঠিক লোক নয়…কেমন করে নয়?…হে প্রভু! ঐ তো আরো একজনকে মেরেছে–সকলেই বলছে তার প্রায় হয়ে এসেছে…হায়রে মানুষ…তাদের কি পাপের ভয় নেই?…সেই একই জনতা এখন যন্ত্রণাদীর্ণ ক্ষোভের সঙ্গে মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে বলছে; লোকটির সরু গলাটা অর্ধেক কেটে ফেলা হয়েছে; কালসিটে-পড়া মুখটা রক্তে ও ধুলোয় মাখামাখি।
একজন কষ্টসহিষ্ণু পুলিশ অফিসার হিজ এক্সেলেন্সি বাড়ির উঠোনে একটা মৃতদেহ পড়ে থাকা ভালো দেখায় না বিবেচনা করে অশ্বারোহী সৈনিকদের সেটাকে সরিয়ে ফেলতে বলল। দুইজন অশ্বারোহী সৈনিক বিকৃত ঠ্যাং ধরে মাটির উপর দিয়ে টানতে টানতে মৃতদেহটাকে নিয়ে গেল। রক্তাক্ত, ধূলি-কলংকিত, আধা কামানো মাথা ও লম্বা গলাটা মাটির উপর দিয়ে একেবেঁকে এগিয়ে গেল। জনতা আতঙ্কে চোখ ফিরিয়ে নিল।
যেমুহূর্তে ভেরেশচাগিন মাটিতে পড়ে গেল এবং জনতা বর্বর উল্লাসে তাকে ঘিরে ধরল তখন সহসা রস্তপচিনের মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল; পিছনের ফটকে যেখানে তার জন্য গাড়ি দাঁড়িয়েছিল সেদিকে না গিয়ে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সেসব না বুঝেই মাথা নিচু করে দ্রুত পা ফেলে সে বারান্দা ধরে একতলার ঘরগুলোর দিকে যেতে লাগল। কাউন্টের মুখ শাদা হয়ে গেছে, নিচের চোয়ালের তীব্র কাঁপুনিকে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না।
এই পথে ইয়োর ইক্সেলেন্সি….ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?…দয়া করে এই দিকে… পিছন থেকে একটা ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
কাউন্ট রস্তপচিন কোনো জবাব দিতে পারল না, বাধ্য ছেলের মতো মুখ ঘুরিয়ে নির্দেশিত পথে এগিয়ে গেল। পিছনের ফটকে দাঁড়িয়েছিল তার কালিচে-গাড়ি। ভিড়ের লোকদের উন্মাদ কণ্ঠস্বর তখনো শোনা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি আসনে বসে কোয়ানকে বলল, সকোলনিকিতে তার পল্লীভবনের দিকে গাড়ি চালাতে।
মিয়াসনিৎস্কি স্ট্রিটে পৌঁছে যখন উন্মত্ত জনতার চিৎকার আর শোনা গেল না তখন কাউন্টের অনুশোচনা শুরু হল। অধীনস্থ কর্মচারীদের সামনে যে উত্তেজনা ও ভীতি সে প্রকাশ করেছে সেকথা মনে করে সে দুঃখিত হল। ফরাসিতে নিজেকেই বলতে লাগল, হাঙ্গামাকারী জনতা কী ভয়ংকর বিরক্তিকর। তারা যেন নেকড়ে বাঘ, মাংস না খেলে তাদের তৃপ্তি হয় না। কাউন্ট! আমাদের দুজনেরই মাথার উপরে আছেন একই ঈশ্বর!-ভেরেশচাগিনের কথাগুলি হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, আর একটা অসন্তুষ্টির স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে লাগল। কিন্তু এটা তার ক্ষণিকের অনুভূতিমাত্র; কাউন্ট রস্তপচিনের মুখে দেখা দিল আত্ম-নিন্দার হাসি। ভাবল, আমার তো অন্য কর্তব্যও ছিল। জনগণকে তো শান্ত করতে হবে। জনকল্যাণের জন্য আরো অনেকে প্রাণ দিয়েছে-এখনো দিচ্ছে।…আমি যদি শুধুমাত্র থিয়োডোর ভাসিলিয়েভিচ হতাম তাহলে আমার কর্মধারা হত সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, কিন্তু প্রধান সেনাপতি হিসেবে আমার জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করা কর্তব্য।
গাড়ির নরম গদিতে বসে ঈষৎ দুলতে দুলতে এবং জনতার সেই ভয়ঙ্কর হল্লা আর কানে না আসাতে রস্তপচিনের শরীরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল, আর সেইসঙ্গে মনটাকেও শান্ত করে তুলবার উপযুক্ত করার কাজে ব্যাপৃত হল।
সে যা করেছে তার জন্য নিজের বিচার-বুদ্ধি তাকে দোষী তো করলই না, বরং একটি অপরাধীকে শাস্তি দেবার এবং সেইসঙ্গে উন্মত্ত জনতাকে শান্ত করবার এমন একটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে বলে আত্মতুষ্টিতে তার মন ভরে উঠল।
ভেরেশচাগিনকে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, রস্তপচিন ভাবতে লাগল (যদিও সেনেট তাকে কঠোর সশ্রম দণ্ডমান দিয়েছিল) সে তো একটি বিশ্বাসঘাতক, গুপ্তচর। আমি তো তাকে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দিতে পারি না, তাই এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছি : ক্ষিপ্ত জনতাকে শান্ত করতে তাদের হাতে একটি শিকার তুলে দিয়েছি, আর সেইসঙ্গে একজন দুষ্কৃতকারীকে শাস্তি দিয়েছি।
