কোথায় সে? সে খোঁজ করল। বলতে বলতেই সে দেখতে পেল একটি যুবক বাড়িটার মোড় ঘুরে দুই দল অশ্বারোহীর মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে। তার ঘাড়টা সরু ও লম্বা, অর্ধেক কামানো মাথায় আবার ছোট ছোট চুল গজিয়েছে। যুবকটির পরনে শেয়ারের লোমের পাড়বসানো নীল কাপড়ের ছেঁড়া জামা, একদিন হয়তো সেটা সৌখিন ছিল, শনপাটের নোংরা কয়েদির ট্রাউজার, আর পাতলা, নোংরা ছেঁড়া বুট। দুটি দুর্বল পায়ে ভারি শেকল বাঁধা, যার ফলে তার চলতে কষ্ট হচ্ছে।
আঃ! বলে রস্তপচিন, তাড়াতাড়ি যুবকটির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বারান্দার একেবারে নিচের সিঁড়িটা দেখিয়ে বলল, ওকে এখানে নিয়ে এস।
শিকলের ঝন ঝন শব্দ তুলে যুবকটি নির্দেশিত জায়গার দিকে এগিয়ে গেল। কোটের কলারটা গলায় চেপে বসায় একটা আঙুল দিয়ে সেটাকে ঠেলে ধরে ঘাড়টাকে দুইবার এদিক-ওদিকে ঘোরাল, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কাজে অনভ্যস্ত হাত দুটি জোড় করে বিনীতভাবে দাঁড়াল।
কয়েক সেকেন্ড সব চুপ। শুধু পিছনের সারির যে লোকগুলো সেই একটি জায়গার দিকে এগিয়ে আসতে চাপ দিচ্ছে, তাদের দীর্ঘশ্বাস, আর্তনাদ ও পা ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
যুবকটি যতক্ষণ সিঁড়িতে তার নির্দিষ্ট জায়গায় এল ততক্ষণ পর্যন্ত রস্তপচিন ভুরু কুঁচকে এক হাতে মুখটা মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে রইল।
কণ্ঠস্বরে একটা ধাতব শব্দ তুলে বলল, বাছারা! এই লোকটি, এই ভেরেশচাগিনই সেই শয়তান যার কৃতকর্মের ফলে মস্কো আজ ধ্বংস হতে বসেছে।
লোমের পট্টি দেওয়া কোট পরা যুবকটি একটু ঝুঁকে বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে; আঙুলগুলো সামনের দিকে একত্র করা। মাথাটা অর্ধেক কামানোর ফলে বিকৃতদর্শন শীর্ণ তরুণ মুখখানি অসহায়ভাবে ঝুলে পড়েছে। কাউন্টের প্রথম কথাগুলি শুনেই সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার দিকে তাকাল; যেন কিছু বলতে চাইল, অথবা অন্তত তার চোখে চোখ রাখতে চাইল। যুবকটির লম্বা সরু গলার একটা শিরা দড়ির মতো ফুলে উঠে কানের কাছে নীল হয়ে গেল; হঠাৎ তার মুখটা লাল হয়ে উঠল।
সকলের দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ। সেও জনতার দিকে তাকাল; তাদের মুখের ভাব দেখে কিছুটা আশান্বিত হয়ে একটুকরো ভীরু, বিষণ্ণ হাসি ফুটল তার মুখে মাথাটা নিচু করে সিঁড়িতে পা দিল।
সে জারের প্রতি, তার দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, বোনাপার্তের দলে ভিড়েছে। একমাত্র সেই রাশিয়ার নামে কলংক লেপন করেছে, মস্কোকে ধ্বংস করেছে, কর্কশ, জোরালো গলায় কথাগুলি বলে রস্তপচিন হঠাৎ ভেরেশচাগিনের দিকে তাকাল; তখনো সে একই বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সে দৃশ্য দেখে জ্বলে উঠে রস্তপচিন হাত তুলে জনতাকে সম্বোধন করে চিৎকার করে বলে উঠল :
ওকে নিয়ে তোমরা যা ভালো মনে কর তাই কর! ওকে তোমাদের হাতেই তুলে দিলাম!
জনতা নিপ; ক্রমেই একে অন্যের আরো কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। এইভাবে পরস্পর ঠেলাঠেলি করা, এই রুদ্ধ বাতাসে শ্বাস টানা, একটুও নড়াচড়া করবার জায়গা না পেয়ে একটা অজ্ঞাত, দুর্বোধ্য ও ভয়ংকর কিছুর জন্য অপেক্ষা করা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে। যারা সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যারা সবকিছু দেখেছে ও শুনেছে, তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে চোখ ও মুখ বিস্ফারিত করে দাঁড়িয়ে আছে, আর যারা পিছন থেকে এগিয়ে আসতে চেষ্টা করছে তাদের ঠেলে রাখছে।
রস্তপচিন চিৎকার করে বলল, ওকে মার!…বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু হোক, রাশিয়ার নামে সে যেন আর কলঙ্ক লেপন করতে পারে না পারে! ওকে কেটে ফেল। আমি হুকুম দিচ্ছি।
যত না মুখের কথায় তার চাইতে বেশি রস্তপচিনের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনে জনতা আর্তনাদ করে ঢেউয়ের মতো এগিয়ে গিয়েও আবার থেমে গেল।
সেই ক্ষণিক নিস্তব্ধতার মাঝখানে ভেরেশচাগিন ভীরু অথচ নাটকীয় স্বরে বলে উঠল, কাউন্ট! আমাদের দুইজনের মাথার উপরে একই আকাশ… মাথাটা তুলল; সরু গলার মোটা শিরাটা আবারও রক্তে ভরে উঠল; মুখের উপর অঙ্ক্ষিত রঙের ছোপ পড়ে আবার মিলিয়ে গেল।
যা বলতে চেয়েছিল তা বলা হল না।
ভেরেশচাগিনের মতোই বিবর্ণ মুখে রস্তপচিন চিৎকার করে বলল, ওকে কেটে ফেল! আমি হুকুম দিচ্ছি।
নিজের তরবারি কোষমুক্ত করে অশ্বারোহী অফিসার চেঁচিয়ে বলল, তরবারি খোল!
জনতার মধ্যে আবার একটা ঢেউ উঠল; সে ঢেউ প্রথম সারিতে পৌঁছে তাকে বারান্দার প্রথম ধাপে পৌঁছে দিল। লম্বা যুবকটি মুখে প্রস্তরকঠিন ভাব ফুটিয়ে হাত তুলে ভেরেশচাগিনের পাশে দাঁড়াল।
অশ্বারোহী অফিসার ফিসফিসিয়ে বলল, ওকে তরবারির আঘাত হান!
ক্রোধে বিকৃত মুখ একটি সৈন্য তার তরবারির ভোতা দিক দিয়ে ভেরেশচাগিনের মাথায় আঘাত করল।
কেন যে তাকে এভাবে আঘাত করা হল সেটা বুঝতে না পেরে ভীরু বিস্ময়ে ভীত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে ভেরেশচাগিন আঃ! বলে চিৎকার করে উঠল। ভিড়ের মধ্যেও অনুরূপ সবিস্ময়ে আর্তনাদ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। বিষণ্ণ গলায় কে যে বলে উঠল হায় প্রভু!
বিস্ময়সূচক শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাবার পরেই ভেরেশচাগিন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আর্তনাদ করে উঠল, আর সেই আর্তনাদ হল মারাত্মক। মানুষের অনুভূতির যে প্রাচীর এতক্ষণ জনতাকে সংযত রেখেছিল এবার চরম সীমায় পৌঁছে সেটা ভেঙে পড়ল। অপরাধ শুরু হয়েছিল, এবার তাকে সম্পূর্ণ করতে হবে। তিরস্কারের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ জনতার ভয়ংকর ক্রুদ্ধ গর্জনের তলে ডুবে গেল। সপ্তম ও সর্বশেষ আঘাত যেভাবে একটা জাহাজকে চুরমার করে দেয়, তেমনই অপ্রতিহত শেষ ঢেউটি পিছন থেকে ধেয়ে এসে প্রথম সারির উপর আছড়ে পড়ল, তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল, ডুবিয়ে দিল। অশ্বারোহী সৈনিকটি আবার আঘাত হানতে উদ্যত হল। ভেরেশচাগিন আতঙ্কে আর্তনাদ করে দুই হাতে মাথাটা ঢেকে ভিড়ের দিকে ছুটে গেল। লম্বা যুবকটির সঙ্গে ধাক্কা খেতেই সেও দুই হাতে তার সরু গলাটা চেপে ধরে বেপরোয়া ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠে তাকে নিয়েই অগ্রসরমান জনতার পায়ের নিচে পড়ে গেল।
