ইয়োর এক্সেলেন্সি, কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দি আছেন, মেশকভ, ভেরেশচাগিন…।
ভেরেশচাগিন! তাকে এখনো ফাঁসি দেওয়া হয়নি? রস্তপচিন চেঁচিয়ে উঠল। তাকে আমার কাছে নিয়ে এস!
.
অধ্যায়-২৫
সকাল নটা নাগাদ মস্কোর ভিতর দিয়ে সৈন্যদের চলাচল শুরু হয়ে গেল। তখন থেকে আর কেউ নির্দেশের জন্য কাউন্টের কাছে এল না। যারা যেতে পারল নিজের থেকেই চলে গেল, আর যারা থেকে গেল তারাও নিজেরাই কর্তব্য স্থির করল।
সকোলনিকি যাবার জন্য গাড়ি আনতে বলে কাউন্ট পড়ার ঘরে গিয়ে দুইহাত জোড় করে বিষণ্ণ, বিবর্ণ মুখে চুপচাপ বসে রইল।
দেশ যখন শান্ত ও গোলযোগহীন থাকে তখন প্রত্যেক শাসকই ভাবে যে একমাত্র তার চেষ্টাতেই তার শাসনাধীন লোকগুলি চলাফেরা করে, আর এই অপরিহার্যতার চেতনার মধ্যেই সব শাসক তার সব চেষ্টা ও শ্রমের প্রধান পুরস্কার খুঁজে পায়। ইতিহাসের সমুদ্র যখন শান্ত থাকে তখন শাসক-কর্তৃপক্ষ তার তার ভঙ্গুর নৌকোখানিকে একটা আঁকড়ার সাহায্যে জল-জাহাজের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে নিজে চলতে থাকে আর স্বাভাবিকভাবেই কল্পনা করে যে তার চেষ্টাতেই জাহাজখানা চলছে। কিন্তু যেই ঝড় ওঠে, সমুদ্র বিক্ষুব্ধ হয়, জাহাজ চলতে থাকে, তখন আর সে ভ্রান্ত ধারণা থাকা সম্ভব নয়। জাহাজ তখন নিজের প্রচণ্ড গতিতেই এগিয়ে চলে, নৌকোর আঁকড়াটা আর সেই চলমান জাহাজ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই শাসক আর শাসক থাকে না। শক্তির উৎস থাকে না, সে হয়ে যায় একটি তুচ্ছ, অকর্মণ্য, দুর্বল মানুষ।
রস্তপচিনেরও তাই মনে হচ্ছে, আর সেইজন্যেই সে আরো চটে গেছে।
যে পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্টকে জনতা থামিয়েছিল সে যখন রস্তপচিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ঠিক তখনই একজন অ্যাডজুটান্ট এসে খবর দিল যে ঘোড়ার সাজ পরানো হয়েছে। দুজনের মুখই বিবর্ণ; তার নির্দেশ মতোই কাজ করা হয়েছে এ-সংবাদ জানিয়ে সুপারিন্টেন্ডেন্ট কাউন্টকে খবর দিল যে অনেক লোক তার উঠোনে ভিড় করেছে; তারা দেখা করতে চায়।
একটি কথাও না বলে রস্তপচিন উঠে তাড়াতাড়ি পা ফেলে তার বিলাসবহুল বৈঠকখানায় ঢুকে ব্যালকনির দরোজার কাছে গেল, হাতলে হাত রাখল, আবার ছেড়ে দিল, তারপর জানালার ধারে গেল; সেখান থেকে বাইরের জনতাকে আরো ভালোভাবে দেখা যায়। লম্বা ছেলেটি সকলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ঘোরাচ্ছে, আর কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন বলছে। রক্তমাখা কামারটি বিষণ্ণ মুখে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধ জানালার ভিতর দিয়ে বহুকণ্ঠের গুঞ্জনধ্বনি শোনা গেল।
জানালার কাছ থেকে ফিরে এসে রস্তপচিন বলল, আমার ঘোড়া কি হাজির?
হাজির ইয়োর এক্সেলেন্সি, অ্যাডজুটান্ট বলল।
রস্তপচিন আবার ব্যালকনির দরোজায় গেল।
কিন্তু ওরা কি চায়? পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্টকে জিজ্ঞাসা করল।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, ওরা বলছে যে আপনার হুকুমমতো ওরা ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য তৈরি হয়েছে, আর তাই ওরা বিশ্বাসঘাতকতার কথা কি যেন বলছে। জনতা খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ইয়োর এক্সেলেন্সি–আমি কোনোরকমে ওদের হাত এড়িয়ে চলে এসেছি। ইয়োর এক্সেলেন্সি, আমার পরামর্শ যদি, শোনেন তো বলি…
আপনি যেতে পারেন। কি করতে হবে সেকথা বলার জন্য আপনাকে দরকার হবে না! রস্তপচিন সক্রোধে বলল।
জনতার দিকে চোখ রেখে সে ব্যালকনির দরোজায় দাঁড়িয়ে রইল।
এসব কিছুর জন্য যে লোকটি দায়ী তার বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ ক্রোধে সে ভাবতে লাগল, তারাই তো রাশিয়ার এই হাল করেছে। আমার এই হাল করেছে। ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ওই এক উচ্ছল জনতা, সমাজের আবর্জনা : তাদের বোকামির জন্যই ওরা মাথা তুলতে পেরেছে! ওরা একটা শিকার খুঁজছে। একথাটা তার মনে হল কারণ সে নিজেই এমন একটি শিকার খুঁজছে যার উপর মনের ঝালটা মেটানো যায়।
গাড়ি কি হাজির? সে আবার শুধাল।
হ্যাঁ ইয়োর এক্সেলেন্সি। ভেরেশচাগিন সম্পর্কে আপনার কি হুকুম? সে তো বারান্দায় অপেক্ষা করছে, অ্যাডজুটান্ট বলল।
যেন এক অপ্রত্যাশিত স্মৃতির আঘাতে রস্তপচিন বলে উঠল, আঃ!
তাড়াতাড়ি দরোজা খুলে দৃঢ় পদক্ষেপে সে বাইরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সব কথা থেমে গেল, মাথার সব টুপি নেমে গেল, সব চোখ পড়ল কাউন্টের উপর।
কাউন্ট হঠাই উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল, শুভ সকাল বাছারা! তোমরা এখানে এসেছ বলে ধন্যবাদ। একমুহূর্তের মধ্যেই আমি তোমাদের কাছে যাচ্ছি, কিন্তু আগে শয়তানদের সঙ্গে ফয়সালা করতে হবে। যে শয়তানরা মস্কোর সর্বনাশ করেছে তাদের শাস্তি দিতেই হবে। আমার জন্য অপেক্ষা করে থাক।
তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে সরে গিয়ে কাউন্ট সশব্দে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল।
ভিড়ের মধ্যে সমর্থন ও সন্তোষের একটা গুঞ্জন বয়ে গেল। তিনি শয়তানদের সঙ্গে একটা ফয়সালা করবেনই, তোমরা দেখে নিও। আর তোমরা বলছ যে ফরাসিরা…আইন কাকে বলে সেটা তিনিই তোমাদের দেখিয়ে দেবেন। তারা এমনভাবে কথা বলতে লাগল যেন এই লোকটির উপর ভরসা না রাখার জন্য একে অন্যকে তিরস্কার করছে।
কয়েক মিনিট পরে একজন অফিসার দ্রুতপায়ে সামনের দরোজা দিয়ে বেরিয়ে এসে কি যেন হুকুম করল, আর অশ্বারোহীর দল সারি দিয়ে দাঁড়াল। জনতা সাগ্রহে ব্যালকনি থেকে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। ক্রুদ্ধ, দ্রুত পা ফেলে রস্তপচিন সেখানে বেরিয়ে এসে এমনভাবে চারদিকে তাকাতে লাগল যেন কাউকে খুঁজছে।
