শত্রু যখন একটা শহরে ঢোকে তখন মস্কোতে অথবা রাশিয়ার অন্য কোনো জায়গায় কখনো গণ অভ্যুত্থানের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। ১লা ও ২রা সেপ্টেম্বর তারিখেও দশ হাজারের বেশি মানুষ মস্কোতে ছিল, কিন্তু শাসনকর্তার নির্দেশে তার বাড়ির সামনে সমবেত কিছু লোকের উজ্জ্বলতা ছাড়া আর কোথাও কিছু ঘটেনি। একথা তো খুবই পরিষ্কার যে বরদিনের যুদ্ধের পর মস্কো পরিত্যাগ করা যখন নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল, অন্ততপক্ষে তার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তখন অস্ত্রশস্ত্র বিলিয়ে এবং ইস্তাহার বিলি করে জনসাধারণকে উত্তেজিত না করে রস্তপচিন যদি পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন, গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ও টাকাপয়সা সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করত এবং লোকজনদের খোলাখুলি বলে দিত যে শহরটাকে পরিত্যাগ করা হবে, তাহলে জনসাধারণের মধ্যে একটা গোলযোগের আশংকা করার কারণ অনেক কমে যেত।
দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হলেও রস্তপচিন ছিল আশাবাদী ও আবেগপ্রবণ; সবসময় ঊর্ধ্বতম শাসকমহলেই সে চলাফেরা করত; যাদের পরিচালক বলে সে নিজেকে ভাবত সেই জনসাধারণের সঙ্গে তার সম্যক পরিচয় ছিল না। যদিও সে জানত যে দুর্দিন আসছে, তবু একেবারে শেষমুহূর্ত পর্যন্তও সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত না যে মঙ্কোকে ছেড়ে যেতে হবে, আর তাই সেজন্য সে প্রস্তুতও ছিল না। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই অধিবাসীরা মস্কো ছেড়ে গেল। সরকারি আপিসগুলো সরিয়ে দেওয়া হল কর্মচারীদের দাবিতে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাউন্টকে সে দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। তীব্র কল্পনাবিলাসী মানুষের বেলায় যেমনটি হয়ে থাকে, মস্কো ছেড়ে চলে যেতে হবে এ-কথাটা অনেকদিন আগে থেকেই জানলেও রন্তপচিন সেটা জানত বুদ্ধি দিয়ে, কিন্তু অন্তরে তা বিশ্বাস করত না, আর তাই এই নতুন পরিস্থিতির জন্য কোনো মানসিক প্রস্তুতিও সে নেয়নি।
তার যতকিছু কাজকর্ম (কার্যক্ষেত্রে তা কতদূর ফলপ্রসূ হয়েছিল সেটা অন্য প্রশ্ন) সব কিছুরই লক্ষ্য ছিল জনগণের মনে দেশাত্মবোধক ফরাসি-বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা।
কিন্তু ঘটনাবলী যখন প্রকৃত ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল, যখন ফরাসি-বিদ্বেষের বুলিতে আর কুললো না, এমন একটা যুদ্ধের ভিতর দিয়ে সে বিদ্বেষকে প্রকাশ করাও সম্ভব হল না, মস্কোর একমাত্র প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আত্মবিশ্বাসের যখন আর কোনো দামই রইল না, যখন সব মানুষ এককাট্টা হয়ে সবকিছু ছেড়ে স্রোতের মতো মস্কো ছেড়ে যেতে লাগল এবং সেই নেতিবাচক কাজের ভিতর দিয়েই তাদের জাতীয়তাবোধের প্রমাণ রাখল, তখন জননেতার যে ভূমিকা রস্তপচিন বেছে নিয়েছিল অকস্মাৎ সেটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে দেখা দিল। অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে বড়ই হাস্যকর, দুর্বল ও নিঃসঙ্গ মনে হল; পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল যেন।
ঘুম থেকে জেগে উঠে কুতুজভের সেই অনুতাপ, অবশ্যপালনীয় চিঠি পেয়ে সে আরো বেশি বিরক্ত হয়ে উঠল। যেসব সরকারি সম্পত্তি বিশেষভাবে তার হেফাজতে রাখা আছে সেসবই এখনো মস্কোতেই রয়েছে; সে সবকিছু সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়।
এরজন্য কে দায়ী? কে এই সংকট ডেকে এনেছে? রস্তপচিন স্মৃতিমন্থন শুরু করল। নিশ্চয় আমি নই। আমি তো তৈরি হয়েই ছিলাম। মস্কো ছিল আমার হাতের মুঠোয়। আর তারা কি না তার এই হাল করে ছাড়ল! যত সব পাষণ্ড! বিশ্বাসঘাতক! কাদের যে সে পাষণ্ড ও বিশ্বাসঘাতক বলল তা সে নিজেই ভালো করে জানে না।
মস্কোর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব লোক তার কাছে এসেছিল, রস্তপচিন সারারাত তাদের জন্য হুকুম জারি করল। যারা তার কাছাকাছি থাকে তারা কোনোদিন কাউন্টকে এত বিষণ্ণ ও বিরক্ত দেখেনি।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, রেজিস্ট্রার বিভাগের ডিরেক্টর খবর পাঠিয়েছেন…পরিষদ থেকে, সেনেট থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ফাউন্ডলিং হাসপাতাল থেকে, সহযোগী বিশপের কাছ থেকে লোক এসেছে…খবরের জন্য…ফায়ার ব্রিগেড সম্পর্কে আপনার কি নির্দেশ? কারা-শাসনকর্তার কাছ থেকে…পাগলা গারদের সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছ থেকে…সারারাত এই ধরনের ঘোষণা কাউন্টের কাছে অনবরত আসতে লাগল।
এই সবরকম প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত ও ক্রুদ্ধ জবাবে সে শুধু জানাল, এখন আর তার হুকুমের কোনো দরকার নেই, তার সব সযত্বরচিত পরিকল্পনা এবার অন্য কেউ নষ্ট করে ফেলেছে। এখন যা কিছু ঘটবে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সেই একজনকেই বহন করতে হবে।
রেজিস্ট্রার বিভাগের প্রশ্নের জবাবে সে বলল আঃ, সেই মাথা-মোটা লোকটাকে বলে দাও, তার সব দলিলপত্র রক্ষা করতে তাকেই এখানে থাকতে হবে। ফায়ার ব্রিগেড সম্পর্কে বোকার মতো প্রশ্ন করছ কেন? তাদের সঙ্গে তো ঘোড়া আছে, তারা ভলালাদিমির চলে যাক; ঘোড়াগুলো যেন ফরাসিদের হাতে না পড়ে।
ইয়োর এক্সেলেন্সি, পাগলা গারদের সুপারিন্টেন্ডেন্ট এসেছেন : তাঁকে কি হুকুম দেবেন?
আমার হুকুম? তারা চলে যাক। বাস।…আর পাগলদের শহরে ছেড়ে দেওয়া হোক। যখন পাগলরাই আমাদের সৈন্যদের চালাচ্ছে, তখন নিশ্চয় ঈশ্বরের এই ইচ্ছা যে অন্য পাগলদের মুক্তি দেওয়া হোক।
কারাগারের দণ্ডিত বন্দিদের সম্পর্কে একটা প্রশ্নের উত্তরে রস্তপচিন রেগে শাসনকর্তাকে বলল : আপনি কি আশা করেন তাদের পাহারা দেবার জন্য আপনাকে আমি দুই ব্যাটেলিয়ন সৈন্য দেব? সৈন্য পাব কোথায়? তাদের ছেড়ে দিন, বাস, মিটে গেল!
