ওকে জিজ্ঞাসা করা উচিত…ওই তো তিনি স্বয়ং!…ঠিক, ওকেই জিজ্ঞাসা করা হোক! কেন করব না? উনি সব বুঝিয়ে বলবেন…হঠাৎ ভিড়ের পিছন দিক দেখে এই ধরনের নানা কথা কানে এল। দুই দল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে পুলিশ-সুপারিন্টেডেন্ট স্কোয়ারের দিকে যাচ্ছিল; সকলেরই দৃষ্টি গেল তার গাড়ির উপর।
কাউন্ট রস্তপচিনের হুকুমে পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্ট সকালেই গিয়েছিল বজরা পুড়িয়ে দিতে; সেই ব্যাপারে বহু টাকা পকেটস্থ করেই সে ফিরছে। একদল লোককে এগিয়ে আসতে দেখে সে কোয়ানকে গাড়ি থামাতে। বলল।
লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, এরা সব কারা?
কোনো জবাব না পেয়ে আবার চিৎকার করে বলল, এরা সব কারা?
পশমি কোট-পরা দোকানি জবাব দিল, ইয়োর অনার, হাইয়েস্ট এক্সেলেন্সি কাউন্টের ঘোষণা মতে এরা জীবন পণ করে দেশের সেবা করতে চায়; এটা কোনোরকম দাঙ্গাহাঙ্গামা নয়,কিন্তু যেহেতু হাইয়েস্ট এক্সেলেন্সি বলেছেন…
পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্ট বলল, কাউন্ট তো চলে যাননি, এখানেই আছেন; তোমাদের সম্পর্কেও একটা ঘোষণা প্রচার করা হবে।…চালাও! কোচয়ানকে হুকুম দিল।
সুপারিন্টেন্ডেন্টের কথাগুলি যারা শুনতে পেল, লোকজন এসে তাদের চারদিকে ভিড় করল; চলমান গাড়িটার দিকে তাকাল।
সেইমুহূর্তে পুলিশ-সুপারিন্ডেন্ডেন্টও শংকিত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে কোয়ানকে কি যেন বলল। ঘোড়াগুলো গতি বাড়িয়ে দিল।
লম্বা যুবকটি চেঁচিয়ে বলল, সব ফাঁকিবাজি হে! ওর পিছু নাও! ওকে যেতে দিও না হে বাছারা! আমাদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে তবে চলে যাক। ওকে ধর! চিৎকার করতে করতে সকলে গাড়িটার পিছনে ছুটতে লাগল।
উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে বলতে ভিড়ের লোকজন পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্টকে অনুসরণ করে লুবিয়াংকা স্ট্রিটের দিকে চলল।
ভিড়ের মধ্যে নানা কণ্ঠস্বরে বারবারই উচ্চারিত হতে লাগল, ঐ দেখ, ভদ্রলোক আর ব্যবসায়ীরা ভেগেছে, আর আমাদের রেখে গেছে মরতে। ওরা কি মনে করে আমরা কুকুরের দল?
.
অধ্যায়-২৪
১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুতুজভের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে কাউন্ট রন্তপচিন মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়ে মস্কোতে ফিরে গেল; তার কারণ সমর পরিষদে তাকে আমন্ত্রণ করা হয়নি এবং শহর রক্ষার যে প্রস্তাব সে দিয়েছিল কুতুজত তাকেও আমল দেয়নি। তাছাড়া, শিবিরে এসে সে যখন বুঝল যে শহরের শান্ত ভাব ও দেশপ্রেমের উত্তেজনাকে শুধু যে গৌণ ব্যাপার বলে মনে করা হচ্ছে তাই নয়, মনে করা হচ্ছে সম্পূর্ণ অবান্তর ও গুরুত্বহীন ব্যাপার বলে, তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। এইসব দেখেশুনে বিচলিত, আহত ও বিস্মিত হয়ে রক্তপচিন মস্কো ফিরে এল। নৈশাহারের পরে পোশাক না ছেড়েই সে একটা সোফায় শুয়ে পড়ল; মাঝরাতের ঠিক পরেই জনৈক সংবাদবাহক কুতুজভের একটা চিঠি নিয়ে এসে তার ঘুম ভাঙাল। চিঠিতে কাউন্টকে অনুরোধ করা হয়েছে, যেহেতু সেনাবাহিনী মস্কো ছাড়িয়ে রিয়াজান রোডের দিকে পিছিয়ে যাচ্ছে সেইজন্য পুলিশ অফিসারদের সেখানে পাঠিয়ে দেয়। রস্তপচিনের কাছে এটা কোনো খবরই নয়। মস্কো পরিত্যক্ত হবে সেকথা সে যে আগের দিন পকলোনি পাহাড়ের উপর কুতুজভের সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই জানতে পেরেছে তাই শুধু নয়, কথাটা সে জেনেছে বরদিনো যুদ্ধের পর থেকেই, কারণ সে যুদ্ধের পর থেকে সেনাপতিরা যে যখন মস্কো এসেছে সকলেই একবাক্যে বলেছে যে আর একটা যুদ্ধ করা একেবারেই অসম্ভব; তাছাড়া তখন থেকেই প্রতি রাত্রে সব সরকারি সম্পত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং রস্তপচিনের নিজের অনুমতিক্রমেই অর্ধেক বাসিন্দা মস্কো ছেড়ে চলে গেছে। তথাপি রাতের বেলা সুখন্দ্রিাটুকু ভেঙে দিয়ে সে খবরটা একটা সাধারণ চিঠির আকারে কুতুজভের হুকুমসহ আসায় সে বিস্মিত ও বিরক্ত হয়েছে।
পরবর্তীকালে নিজের স্মৃতিকথায় এই সময়কার কার্যাবলি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সে বারবার বলেছে যে দুটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বারা সে তখন পরিচালিত হয়েছে : মস্কোতে শান্তি বজায় রাখা এবং অধিবাসীদের চলে যাওয়া ত্বরান্বিত করা। এই দুটি উদ্দেশ্যকে স্বীকার করে নিলে রস্তপচিনের তৎকালীন সব কাজকর্মই নিন্দার
অতীত বলে মনে হবে। পবিত্র স্মৃতিচিহ্নসমূহ, অস্ত্রশস্ত্র, কামান-বন্দুক, গোলা-বারুদ ও শস্য-ভাণ্ডার কেন– সরিয়ে ফেলা হয়নি? কেন হাজার হাজার অধিবাসীকে ঠকিয়ে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে মস্কোকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া হবে না-তাদের সর্বনাশ করা হবে না। কাউন্ট রস্তপচিনের কৈফিয়ৎ, শহরের শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে। … সরকারি অফিসগুলো থেকে বস্তা-বস্তা অকেজো কাগজপত্র, আর লেপপিসের বেলুন ও অন্যান্য জিনিসপত্র কেন সরানো হয়েছিল? রস্তপচিনের কৈফিয়ৎ, শহরকে ফাঁকা করে রেখে যেতে। জন শান্তি বিপন্ন–একথা মেনে নিলে যে কোনো কাজেরই সমর্থন মেলে।
ত্রাসের রাজত্বের সব ভয়াবহতার একমাত্র ভিত্তি জনগণের শান্তি বিধানের কামনা।
তাহলে ১৮১২ সালে মস্কোর শান্তি বিঘ্নিত হবার ভয় কাউন্ট রস্তপচিনের মনে এসেছিল কেন? শহরে একটা বিদ্রোহ দেখা দেবার সম্ভাবনার কথা ভাববার কি কারণ ছিল? অধিবাসীরা মস্কো ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, আর পশ্চাদপসরণকারী সৈন্যরা এসে সে স্থান পূর্ণ করছিল। তার ফলে সাধারণ মানুষ দাঙ্গা বাধাবে কেন?
