দোকানের মালিক দরোজার কাছেই একটা কামারকে মারছিল; মজুররা এসে পড়তে কামারটা মালিকের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সপাটে পথের উপর পড়ে গেল।
আর একটি কামার বুক দিয়ে মালিককে ঠেলে দরজা দিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করল।
আস্তিন-গুটানো ছেলেটা কামারের মুখে এক ঘুষি মেরে চিৎকার করে বলল, ওরা আমাদের সঙ্গে লড়তে এসেছে হে!
সেইসময় প্রথম কামারটি উঠে নিজের ছড়ে-যাওয়া মুখটাকে আঙুল দিয়ে আঁচড়ে রক্ত বের করে কান্নাভরা গলায় চিৎকার করে বলল :
পুলিশ! খুন!!…একটা লোককে ওরা খুন করেছে!
কাছাকাছি আর একটা ফটক দিয়ে বেরিয়ে এসে একটি স্ত্রীলোক চেঁচাতে শুরু করল, হায় কপাল!…একটা লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে–খুন করেছে!…
রক্তাক্ত কামারটিকে ঘিরে ভিড় জমে গেল।
দোকানের মালিককে ডেকে একজন বলল, মানুষের অনেক কিছু তো লুঠ করেছ-তাদের শেষ শার্টটা পর্যন্ত নিয়েছ। ওরে চোর, একটা মানুষকে কেন খুন করেছিস?
লম্বা ছেলেটা একবার দোকানির দিকে, একবার কামারের দিকে তাকিয়ে যেন ভাবতে লাগল এবার কার সঙ্গে লড়বে।
হঠাৎ দোকানির দিকে ফিরে বলল, এই খুনী! ওকে বেঁধে ফেল বাছারা।
যে লোকটি এগিয়ে এসেছিল তাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে এবং মাথার টুপিটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দোকানের মালিক চেঁচিয়ে বলল, আমাকে তো বাঁধতে চাইবেই!
যেন তার এই কাজের একটা রহস্যময় ক্ষতিকর তাৎপর্য আছে এই কথা ভেবে মজুররা ইতস্তত করে থেমে গেল।
আইনের খবর আমি ভালোই জানি স্যাঙাত্রা! ব্যাপারটাকে পুলিশের ক্যাপ্টেনের কাছে নিয়ে যাব। তার কাছে আমি যেতে পারব না ভেবেছ? আজকালকার দিনে ডাকাতি করার অধিকার কারো নেই! টুপিটা তুলে নিয়ে দোকানি বলল।
তাহলে চলে এস। তাহলে চলে এস! মদের দোকানি ও লম্বা ছেলেটা পরপর কথাটা বলল। দুইজন একসঙ্গে পথে নামল।
রক্তমাখা কামারটিও চলল তাদের পাশে। চেঁচিয়ে কথা বলতে বলতে কারখানার মজুররাও তাদের পিছু পিছু চলল।
মরসিকার মোড়ে জুতো তৈরির সাইনবোর্ড ঝোলানো বন্ধ-জানালা একটা বড় বাড়ির বিপরীত দিকে জনা বিশেক শুকনো, ক্লান্ত, বিষণ্ণ-মুখ মুচি ওভারল ও ছেঁড়া লম্বা কোট পরে দাঁড়িয়েছিল।
একটি শুটকো মজুর ভুরু কুঁচকে পাতলা দাড়ি দুলিয়ে বলছে, তার তো উচিত লোকদের প্রাপ্য ঠিকমতো দেওয়া। কিন্তু সে আমাদের রক্ত চুষে খেয়েছে, আর এখন ভাবছে আমাদের তাড়াতে পারলেই বাঁচে। সপ্তাহ ভরে আমাদের ভুল বুঝিয়েছে, আর আজ আমাদের এই সংকটের মধ্যে ফেলে সটকে পড়েছে।
রক্তমাখা লোকটিসহ ভিড়কে দেখে মুচিরা কথা থামিয়ে সাগ্রহ কৌতূহলে চলমান ভিড়ের সঙ্গে মিশে গেল।
এরা সব কোথায় চলেছে?
কেন, নিশ্চয় পুলিশের কাছে!
আমি বলছি, আমাদের যে মেরেছে সেটা কি সত্যি
তোমার কি মনে হয়? ওরা কি বলছে তাই শোন।
অনেক প্রশ্ন ও উত্তর শোনা গেল। বর্ধিত ভিড়ের সুযোগ নিয়ে খুঁড়িখানার মালিক পিছনে কেটে পড়ে দোকানে ফিরে গেল।
শত্রু যে সরে পড়েছে সেটা লক্ষ্য না করে লম্বা যুবকটি খোলা হাতটা ঘোরাতে ঘোরাতে অনবরত বকতে লাগল। তাকে ঘিরেই সকলে ভিড় করে চলল।
সরকারকে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, আইন চালাতে হবে, সরকার তো আছেই সেইজন্যে। ভালোমানুষ খৃস্টানরা, আমি ঠিক বলিনি? প্রায় অদৃশ্য হাসি হেসে যুবকটি বলল। সে ভেবেছে সরকার বলে কিছু নেই! সরকার ছাড়া কখনো চলে? সরকার না থাকলে তো সকলেই আমাদের লুঠ করত।
ভিড়ের ভিতর থেকে অনেকে বলে উঠল, কি বাজে কথা বলছ? তারা কি এইভাবে মস্কো ছেড়ে দেবে? তারা ঠাট্টা করে কি বলল, আর তাই তুমি বিশ্বাস করলে! প্রচুর সৈন্য কি যাচ্ছে না? সত্যি কি তাকে (নেপোলিয়নকে) আসতে দেবে! সরকার কি এইজন্যেই আছে! বরং জনসাধারণ কি বলছে তাই শোন।
চীনা-টাউনের প্রাচীরের পাশে একটা ছোট দল পশমি কোট-পরা একটি লোককে ঘিরে ভিড় করেছে। লোকটির হাতে একটা কাগজ।
সম্রাটের আদেশ-পত্র, সম্রাটের আদেশ-পত্র পড়া হচ্ছে! ভিড়ের ভিতর থেকে অনেকের গলা শোনা গেল। সকলে পাঠকের দিকে ছুটতে শুরু করল।
পশমি কোট-পরা লোকটি ৩১শে আগস্ট তারিখের ইস্তাহার পড়ছে। চারদিকে থেকে লোককে ভিড় করে আসতে দেখে লোকটি কিছুটা বিচলিত বোধ করল, কিন্তু লম্বা ছেলেটি ভিড় ঠেলে তার কাছে হাজির হয়ে পড়ার দাবি জানাতে সে কাঁপা গলায় ইস্তাহারটা গোড়া থেকে পড়তে লাগল।
কাল ভোরেই আমি প্রশান্ত মহামহিমের কাছে যাব, (বিজয়ীর হাসি হেসে ভুরু কুঁচকে লম্বা ছেলেটা বলল, প্রশান্ত মহামহিম) এই শয়তানদের সমূলে বিনাশ করতে তার সঙ্গে পরামর্শ করব, কাজ করব, সেনাবাহিনীকে সাহায্য করব। তাদের ধ্বংস করার কাজে আমরাও অংশগ্রহণ করব, এইসব অতিথিদের জাহান্নামে পাঠাব। ডিনারের সময় ফিরে এসেই কাজ শুরু করব। এই শয়তানদের একেবারে তচনচ করে ছাড়ব।
শেষের কথাগুলি যখন পড়া হল তখন চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। লম্বা ছেলেটি বিষণ্ণভাবে মাথাটা নুইয়ে রেখেছে। স্পষ্ট বোঝা গেল যে শেষের অংশটা কেউই বুঝতে পারেনি। বিশেষ করে ডিনারের সময় ফিরে এসে কথাটায় পাঠক ও শ্রোতা সকলেই অসন্তুষ্ট হয়েছে। এসব সাধারণ কথা তো যে কেউ বলতে পারে, একজন উচ্চতম কর্তৃপক্ষের ইস্তাহারে একথা থাকা উচিত হয়নি।
সকলেই নিরাশ হয়ে চুপ করে রইল। লম্বা যুবকটি ঠোঁট নাড়তে নাড়তে এ-পাশে ও-পাশে দুলতে লাগল।
