সে বলল, সে তো খুব ভালো হবে! আমি কখনো কিছু চাই নি। আর এখনো চাই না।
কোল থেকে কুকুরটাকে নামিয়ে দিয়ে সে পোশাক পাট করতে লাগল।
আর এই হল কৃতজ্ঞতা–যারা তার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, এই তাদের স্বীকৃতি! প্রিন্সেস চিৎকার করে বলল। এ তো চমৎকার। খুব ভালো! আমি কিছুই চাই না প্রিন্স।
ঠিক, কিন্তু তুমি তো একা নও। তোমার বোনরা আছে…, প্রিন্স ভাসিলি বলল।
কিন্তু প্রিন্সেস তার কথায় কান দিল না।
হ্যাঁ, অনেক আগেই আমি এ সব জানতাম, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম, নিচতা, প্রবঞ্চনা, ঈর্ষা, ষড়যন্ত্র আর অকৃতজ্ঞতা–জঘন্যতম অকৃতজ্ঞতা ছাড়া এ বাড়িতে আর কিছুই আমি আশা করতে পারি না।…
উইলটা কোথায় আছে তা তুমি জান কি না? প্রিন্স ভাসিলি তবু জিজ্ঞাসা করল; তার গাল দুটো আগের চাইতে বেশি কুঁচকে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, সত্যি আমি বোকা ছিলাম! আমি মানুষকে বিশ্বাস করতাম, ভালোবাসতাম, নিজেকে বিলিয়ে দিতাম। কিন্তু যারা নিচ, যারা পাপী, তাদেরই জয় হয়! আমি জানি কে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।
প্রিন্সেস উঠতে যাচ্ছিল, প্রিন্স তাকে হাত ধরে থামাল। প্রিন্সেসের তখন এমন অবস্থা যে গোটা মানব জাতির উপরেই সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। কুদ্ধ চোখে সে সঙ্গীর দিকে তাকাল।
এখনো সময় আছে বোন। তোমাকে মনে রাখতে হবে কাতিচে যে এ সবই করা হয়েছিল না ভেবেচিন্তে, একটা রাগের মুহূর্তে, রোগের মধ্যে, আর তার পরে আর কিছুই মনে ছিল না। এখন আমাদের কর্তব্য এই ভুলকে সংশোধন করা, এই অন্যায় কাজ থেকে বিরত করে তার শেষের মুহূর্তগুলিকে শান্তিতে ভরে তোলা; যাতে এই অনুভূতি নিয়ে তাঁকে মরতে না হয় যে তাদেরই তিনি অসুখী করে রেখে যাচ্ছেন যারা…
প্রিন্সেস সুর মিলিয়ে বলল, যারা তাঁর জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছে, যদিও তিনি সে ত্যাগের মূল্য দেন নি। না দাদা, আমি সর্বদা মনে রাখব যে এই জগতে কারো কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা রাখা উচিত নয়, এ জগতে মর্যাদা বা ন্যায় বলে কিছু নেই। এ জগতে মানুষকে শুধু ধূর্ত নিষ্ঠুর হতে হবে।
শোন, শোন, অবুঝ হয়ো না। তোমার মহৎ হৃদয়কে আমি চিনি।
না, তোমার পাপীর হৃদয়।
তোমার হৃদয়কে আমি চিনি, প্রিন্স আবার বলল। তোমার বন্ধুত্বকে আমি মূল্য দেই, আর আশা করি যে আমার সম্পর্কেও তুমি সেই অভিমতই পোষণ কর। এভাবে ভেঙে পড়ো না; একদিনই হোক, আর এক ঘণ্টাই হোক, এখনো সময় আছে, এস আমরা বুদ্ধির সঙ্গে আলোচনা করি। উইল সম্পর্কে সব কথা আমাকে বল। সব চাইতে বড় কথা সেটা কোথায় আছে। তুমি নিশ্চয় জান। এই মুহূর্তে সেটা নিয়ে কাউন্টকে দেখাও। তিনি নির্ঘাৎ উইলের কথা ভুলেই গেছেন এবং সেটা নষ্ট করে ফেলতে চাইবেন। ঠিক জেনো, তার মনের বাসনাকে ঠিক ঠিক মতো পূর্ণ করাই আমার একমাত্র কামনা; শুধু সেই জন্যই আমি এখানে এসেছি। তা এবং তোমাকে সাহায্য করতেই আমি এসেছি।
এবার আমি সব বুঝতে পারছি। আমি জানি কে ষড়যন্ত্র করছে–আমি জানি! প্রিন্সেস চেঁচিয়ে বলে উঠল।
সেটা আসল কথা নয় বোন।
এ তোমাদের সেই আশ্রিতা, সেই মিষ্টি প্রিন্সেস বেস্কায়া, সেই আন্না মিখায়লভনা, যাকে আমি বাড়ির দাসী রাখতেও রাজি নই…কুখ্যাত, নিচ মেয়েমানুষ!
আমাদের এতটুকু সময় নষ্ট করা উচিত নয়…
আঃ, আমাকে কিছু বলল না! গত শীতের সময় মিষ্টি কথায় মন ভুলিয়ে সে এখানে এসেছিল, আমাদের সম্পর্কে, বিশেষ করে সোফিল সম্পর্কে এমন সব নিচ, লজ্জাজনক কথা বলেছিল-সে সব কথা আমি মুখেও আনতে পারি না-যার ফলে কাউন্ট অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, আর এক পক্ষকাল তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেন নি। আমি জানি তখনই তিনি এই নিচ, ঘৃণ্য কাগজটা লিখেছিলেন; কিন্তু তখন আমি ভেবেছিলাম এটা অসিদ্ধ।
আমাদের শেষপর্যন্ত দেখতে হবে–আরো আগে কেন এ কথা আমাকে বল নি?
তার প্রশ্নে কান না দিয়ে প্রিন্সেস বলল, ওটা সেই কারুকার্যকরা পোর্টফোলিওতে আছে যেটা তিনি তার বালিশের তলায় রাখেন। এবার বুঝতে পারছি! হ্যাঁ; আমার মনে যদি কোনো পাপ থাকে, মহাপাপ, তো সেটা ওই নিচ মেয়েমানুষটা প্রতি তীব্র ঘৃণা! প্রিন্সেস প্রায় আর্তনাদ করে উঠল; এখন সে একেবারেই বদলে গেছে। কিসের জন্য সে মাকড়শার মতো এখানে এসেছিল? কিন্তু আমি তাকে দেকে নেব। সময় একদিন আসবেই!
*
অধ্যায়-২২
অভ্যর্থনা-ঘরে আর প্রিন্সেসের ঘরে যখন এইসব কথাবার্তা হচ্ছিল সেই সময় একখানা গাড়ি পিয়ের (যাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল) এবং আন্না মিখায়লভনা (যে তার সঙ্গে যাওয়াটা দরকারী মনে করেছিল)-এই দুজনকে নিয়ে কাউন্ট বেজুখভের বাড়ির উঠোনে ঢুকল। চাকাগুলো যখন জানালার নিচেকার খড়ের উপর দিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগল তখন আন্না মিখায়লভনা সান্ত্বনার কথা বলে সঙ্গীর দিকে মুখ ঘোরাতেই দেখল সে ঘুমিয়ে পড়েছে; মহিলাটি তাকে ডেকে তুলল। জেগে উঠে পিয়ের আন্না মিখায়লভনার পিছন পিছন গাড়ি থেকে নামল, আর তখনই তার মনে পড়ল যে এবার তাকে মুমূর্ষ বাবার সঙ্গে দেখা করতে হবে। সে লক্ষ্য করল, সদর ফটকের পরিবর্তে তারা পিছনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সে যখন গাড়ির পাদানি থেকে নামছে সেই সময় কারিগরের মতো দেখতে দুটি লোক ফটক থেকে ছুটে গিয়ে বাড়ির দুদিককার ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। একটুক্ষণ থেমে পিয়ের লক্ষ্য করল সেই ধরনের আরো কয়েকজন বাড়িটার দুদিকে ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাদের দেখেও আন্না মিখায়লভনা বা পরিচারক, বা কোচয়ান কেউই তাদের দিকে নজর দিল না। দেখে তো ভালোই মনে হচ্ছে, এই কথা ভেবে পিয়ের মহিলাটিকে অনুসরণ করল। স্বল্পালোকিত পাথরের সিঁড়ি বেয়ে মহিলাটি দ্রুত পায়ে উপরে উঠতে লাগল; পিয়ের একটু পিছিয়ে পড়ায় তাকে ডেকে নিল। কাউন্টের কাছে যাওয়ার তার পক্ষে প্রয়োজন কেন তা সে বুঝতে পারছে না; আরো বুঝতে পারছে না কেন সে পিছনের দরজা দিয়ে যাচ্ছে; তবু আন্না মিখায়লভনার নিশ্চিত ও দ্রুত পদক্ষেপ বিবেচনা করে সে ধরেই নিল যে যাওয়াটা একান্তই প্রয়োজনীয়। সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছে গামলাবাহী দুটো লোকের সঙ্গে তাদের প্রায় ধাক্কাধাক্কি হবার যোগাড়; বুট খটখটিয়ে তারা দুজনই দৌড়ে নেমে আসছিল। পিয়ের ও আন্না মিখায়লভনাকে পথ করে দেবার জন্য লোক দুটি দেয়াল ঘেঁষে সরে দাঁড়াল; তাদের দুজনকে সেখানে দেখে একটুও অবাক হলো না।
