উঠোনে নেমে একটু থেমে ভাবতে লাগল এখন কোথায় যাবে-চাকরদের ঘরে গিয়ে ভাসিলিচের সঙ্গে চা খাবে, না কি ভাড়ার ঘরে গিয়ে সেটাকে একটু গোছগাছ করবে।
শান্ত রাজপথে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। কে যেন ফটকে এসে থামল। ছিটকিনির শব্দ হল, কে যেন সেটা খুলবার চেষ্টা করছে।
মাভ্রা কুজমিনিচনা ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
কি চাই?
কাউন্ট–কাউন্ট ইলিয়া অন্দ্রিভিচ রস্তভ।
কিন্তু আপনি কে?
একজন অফিসার, তার সঙ্গে দেখা করতে চাই, নম্র, মার্জিত রুশ গলায় জবাব এল।
মাভ্রা কুজমিনিচনা ফটক খুলে দিল। আঠারো বছর বয়সের একটি অফিসার উঠোনে ঢুকল; রস্তভদের মতোই গোল তার মুখের আদল।
মাভ্রা কুজমিনিচনা সাদরে বলল, তারা তো চলে গেছেন স্যার। কাল সন্ধ্যাবেলায় চলে গেছেন।
তরুণ অফিসারটি ঢুকবে কি ঢুকবে না ইতস্তত করে জিভ দিয়ে চুক-চুক শব্দ করল।
বলল, আঃ, বড়ই মুস্কিল হল! আমার গতকালই আসা উচিত ছিল। কী দুঃখের কথা!
এদিকে মাভ্রা কুজমিনিচনা ছেলেটির মুখের রস্ত পরিবারের আদল, তারা ছেঁড়া কোট ও ছেঁড়া বুটের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল।
বলল, কাউন্টের সঙ্গে কি জন্য দেখা করতে চাইছেন?
দেখুন, মানে…কোনো লাভ নেই! বিরক্ত স্বরে কথাটা বলে চলে যাবার জন্যই সে ফটকে হাত দিল।
ইতস্তত করে আবার থামল।
তারপর হঠাৎ বলে উঠল, দেখুন, আমি কাউন্টের একজন আত্মীয়; তিনি আমার প্রতি খুব সদয়। দেখতেই তো পাচ্ছেন আমার জামা-জুতো সবই শতচ্ছিন্ন, হাতেও টাকা নেই, তাই কাউন্টের কাছে এসেছিলাম কিছু…
মাভ্রা কুজমিনিচনা তাকে কথা শেষ করতে দিল না।
একমিনিট অপেক্ষা করুন স্যার! ক্ষণিকমাত্র, সে বলল।
অফিসারটি ফটকের হাতল থেকে হাতটা সরিয়ে নিতেই সে পিছনের উঠোন দিয়ে চাকরদের ঘরের দিকে চলে গেল।
উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে অফিসারটি নিজের ছেঁড়া বুটজোড়ার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ঈষৎ হাসল। ভাবল, কী দুঃখ যে খুড়োমশায়ের সঙ্গে দেখা হল না! এই বৃদ্ধাটিও কী ভালো। উনি ছুটে গেলেন কোথায়? আমার রেজিমেন্ট তো এতক্ষণে রঘোঝস্কি ফটকের কাছে পৌঁছে গেছে; রেজিমেন্টকে ধরবার সোজা পথটাই বা কেমন করে খুঁজে পাব? ঠিক সেইসময় একখানা পাকানো ডোরাকাটা রুমাল হাতে নিয়ে মাদ্রা কুজমিনিচনা এসে হাজির হল। কয়েক পা দূরে থাকতেই রুমালের পাক খুলে একখানা পঁচিশ রুবলের শাদা নোট বের করে তাড়াতাড়ি সেটা তার হাতে গুঁজে দিল।
হিজ এক্সেলেন্সি বাড়ি থাকলে অবশ্য আত্মীয় হিসেবে তিনি…কিন্তু এ অবস্থায়…
মাভ্রা কুজমিনিচনার মুখ লাল হয়ে উঠল। অফিসারটি আপত্তি না করে নীরবে নোটটা নিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিল।
মাভ্রা কুজমিনিচনা ত্রুটিস্বীকারের ভঙ্গিতে আবার বলল, কাউন্ট যদি বাড়ি থাকতেন…খৃস্ট আপনার সহায় হোন স্যার! ঈশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন! সে মাথাটা নোয়াল; অফিসারটি বেরিয়ে গেল।
মাথা দুলিয়ে খুশিতে হাসতে হাসতে অফিসারটি পরিত্যক্ত পথ বেয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগল যাতে ইয়াউজা সেতুতেই তার রেজিমেন্টকে ধরতে পারে।
কিন্তু মাভ্রা কুজমিনিচনা অশ্রুভেজা চোখে বেশ কিছুক্ষণ ফটকেই দাঁড়িয়ে রইল; অজ্ঞাত তরুণ অফিসারটির প্রতি মাতৃস্নেহ ও করুণার অপ্রত্যাশিত প্রবাহে তার বুকটা ভরে উঠেছে; বিষণ্ণ অন্তরে সে মাথাটা দোলাতে লাগল।
.
অধ্যায়-২৩
বরবাৰ্কার উপরে অবস্থিত একটা অসমাপ্ত বাড়ির একতলার মদের দোকান থেকে মাতালদের হৈ-হল্লা ও গান ভেসে আসছে। একটা ছোট নোংরা ঘরের টেবিলের চারপাশে বেঞ্চিতে বসে আছে জনাদশেক কারখানার মজুর। আবছা দৃষ্টি ও হাঁ-করা মুখে ঘর্মাক্ত অবস্থায় তারা বেশ কষ্ট করে একটা না একটা গান করে চলেছে। সে গানে কোনো তাল-লয় নেই, গাইতে বেশ কষ্টও হচ্ছে, গান গাওয়ার জন্যই যে গাইছে তাও নয়, তারা যে মাতাল হয়ে বেশ মৌজে আছে সেটা দেখাতেই গান করছে। পরিষ্কার নীল কোটপরা একটি লম্বা সুকেশ ছেলে অন্য সকলের উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁট দুটো পাতলা, চাপা ও বাঁকা না হলে এবং চোখ দুটো স্থির ও বিষণ্ণ না হলে সুন্দর খাড়া নাকের জন্য তার মুখটা বেশ ভালোই দেখাত। একটা কিছু বলার জন্যই সে উঠে দাঁড়িয়েছে; কনুই পর্যন্ত আস্তিন গুটিয়ে সকলের মাথার উপর দিয়ে শাদা হাতটা ঘোরাচ্ছে নোংরা আঙুলগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। কোটের আস্তিনটা বারবার নেমে যাচ্ছে, আর সেও বাঁ হাত দিয়ে সেটাকে বারবার গুটিয়ে নিচ্ছে, যেন যে পেশীবহুল হাতটা সে ঘোরাচ্ছে সেটা খোলা থাকা খুবই দরকারি। গানের ফাঁকে ফাঁকেই বারান্দায় ও ফটকে চিৎকার, লড়াই ও ঘুমোঘুষির শব্দ শোনা যাচ্ছে। লম্বা ছেলেটি হাত নাড়তে লাগল।
হঠাৎ সে বলে উঠল, এসব থামাও! ওখানে লড়াই চলেছে বাছাধনরা! তারপর আস্তিন গোটাতে গোটাতেই বাইরের ফটকে চলে গেল।
কারখানার মজুররা তার পিছু নিল; লম্বা ছেলেটার নেতৃত্বে এই লোকগুলি সকালেই মদের দোকানে ঢুকে মদ খাচ্ছিল; কারখানা থেকে কিছু চামড়া নিয়ে এসেছিল, আর তার বদলেই তাদের সকলকে মদ দেওয়া হচ্ছিল। এদিকে নিকটবর্তী কামারশালা থেকে একদল কামার শুড়িখানায় হৈ-হট্টগোল শুনে ওরা দোকানের দরোজা ভেঙে ঢুকেছে ভেবে তারাও জোর করে ঢুকতে চাইল, আর তাই নিয়ে ফটকে দুই দলের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
