সিনিয়র অফিসার চেঁচিয়ে বলল, চলে আসুন, ওখানে যান, ওদের তাড়িয়ে দিন!
চাদর জড়ানো অফিসারটি ঘোড়া থেকে নেমে একজন ভেরিবাদককে ডেকে তাকে নিয়ে ঢাকা বারান্দায় চলে গেল। কয়েকটি সৈনিক দল বেঁধে ছুট দিল। নাকের কাছে গালের উপর লাল তিলওয়ালা একটি দোকানি হাত দোলাতে দোলাতে তার দিকে এগিয়ে এল।
বলল, ইয়োর অনার! দয়া করে আমাদের বাঁচান! ছোটখাট জিনিস খোয়া গেলে আমরা কিছু মনে করি না, আপনারা যা খুশি নিতে পারেন–তাতে আমরা খুশিই হব!…এমন একজন সম্মানিত ভদ্রলোকের জন্য একটুকরো কাপড় আমি এক্ষুণি এনে দিচ্ছি, দরকার হলে দুটো টুকরোও খুশি হয়েই দেব। অবস্থাটা তো বুঝতেই পারছি : কিন্তু এসব কী হচ্ছে-এ যে স্রেফ ডাকাতি; আপনি কি দয়া করে কিছু পাহারা বসাতে পারেন না যাতে আমরা অন্তত দোকানগুলো বন্ধ করতে পারি…
কয়েকজন দোকানি অফিসারকে ঘিরে দাঁড়াল।
কড়া চেহারার একজন রেগে বলল, আঃ, কী বোকার মতো বক! মাথাটাই যখন কাটা যাচ্ছে তখন কি কেউ চুলের লাগি কাঁদে! দয়া করে ভিতরে আসুন ইয়োর অনার!
শুটকো লোকটি চেঁচিয়ে বলল, বকবকই বটে! এখানে আমার তিনটে দোকানে এক লাখ রুবল দামের মালপত্র আছে। সৈন্যরা চলে গেলে কি সেসব বাঁচানো যাবে? আর মানুষগুলোও হয়েছে বটে! ঈশ্বরের মার দুনিয়ার বার।
প্রথম দোকানি অভিনন্দন জানিয়ে বলল, ভিতরে আসুন ইয়োর অনার!
অফিসারটি বিব্রত বোধ করতে লাগল; তার মুখে ইতস্তত ভাব।
এটা আমার কাজ নয়, বলেই সে তাড়াতাড়ি গলিতে পা বাড়াল।
একটা খোলা দোকানের ভিতর থেকে ঘুষোঘুষি ও গালাগালির শব্দ শোনা গেল। অফিসারটি সেখানে আসা মাত্রই মাথা কামানো ধূসর কোট পরা একটি লোককে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হল।
লোকটি ডিগবাজি খেয়ে ব্যবসায়ী ও অফিসারটির মাঝখান দিয়ে ছুটে চলে গেল। দোকানের মধ্যে যেসব সৈন্য ছিল অফিসারটি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠিক সেইমুহূর্তে মস্ক সেতুর উপরকার প্রচণ্ড ভিড়ের ভিতর থেকে একটা ভয়ংকর আর্তনাদ ভেসে এল আর অফিসারটি ছুটে স্কোয়ারের ভিতর ঢুকল।
কি হল? কি হল? সে শুধাল, কিন্তু তার সহকর্মীটি ততক্ষণে সুন্দরী ভাসিলির পাশ কাটিয়ে আর্তনাদ লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে।
অফিসারটিও ঘোড়াও চেপে তার পিছু নিল। সেতুর উপর পৌঁছে দেখতে পেল দুটো কামান দাঁড়িয়ে আছে, পদাতিক সৈন্যরা সেতু পার হচ্ছে, কয়েকটা গাড়ি উল্টে গেছে, আর কতক সৈন্যরা ভয় পেয়েছে, কতক হাসছে। কামানের পাশে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে; তাতে ঘোড়া জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। গলায় কলার পরানো চারটে কুকুর চাকা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা উঁচু করে বোঝাই করা হয়েছে, আর উল্টো করে বসানো একটা বাচ্চাদের চেয়ারের পাশে বসে একটি চাষা স্ত্রীলোক মর্মভেদী চিৎকার করছে। সহকর্মী-অফিসাররা জানাল, জেনারেল এর্মালভ এখানে পৌঁছে যখন জানতে পারল যে সৈন্যরা দোকানে দোকানে ঢুকে পড়েছে, আর নাগরিকরা সেতুর উপরে জট পাকিয়ে ফেলেছে, তখন সে হুকুম দেয় যে সেতুকে লক্ষ্য করে গুলি চালাবার ভান করে কামান দুটোকে সেইদিকে তাক করে বসানো হোক, আর তার ফলেই ভিড়ের লোকজন ও স্ত্রীলোকটি আর্তনাদ শুরু করে দিয়েছে। ভিড়ের লোকরা ধাক্কাধাক্কি করে, গাড়ি উল্টে ফেলে বেপরোয়াভাবে চিৎকার করতে করতে সেতুর মুখটা ফাঁকা করে দিয়েছে, আর তাই সৈন্যরা এখন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
.
অধ্যায়–২২
ইতিমধ্যে শহর জনশূন্য হয়ে গেছে। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। সব ফটক ও দোকানপাটই বন্ধ; শুধু শুড়িখানাগুলো ঘিরে এখানে-ওখানে কিছু চেঁচামেচি ও মাতলামির গান শোনা যাচ্ছে। পথে কোনো গাড়ি নেই। পায়ের শব্দও কদাচিৎ কানে আসে। পোভাস্কায়া নিস্তব্ধ ও জনহীন। রস্তভদের বাড়ির প্রকাণ্ড উঠোনে পড়ে আছে শুধু খড়ের স্তূপ আর ঘোড়ার গোবর; একটা মানুষও চোখে পড়ছে না। বাড়ির মস্তবড় বৈঠকখানায় জিনিসপত্র সবই আছে, কিন্তু মানুষ আছে মাত্র দুটি। উঠোনের দারোয়ান ইগনাৎ আর ভাসিলিচের নাতি ছোকরা-চাকর মিশকা; ঠাকুর্দার সঙ্গে সেও মস্কোতে থেকে গেছে। মিশকা ক্ল্যাভিকর্ডটা খুলে এক আঙুল দিয়ে সেটাকে ঠুকছে। ইগনাৎ দুই হাত আড়াআড়িভাবে বুকের উপর রেখে বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে খুশিতে হাসছে।
হঠাৎ দুই হাতে কিবোর্ডে ঠেকা দিতে দিতে ছেলেটা বলে উঠল, খুব চমৎকার, কি বল ইগনাৎ খুড়ো?
আয়নায় নিজের দন্তবিকাশ দেখে বিস্মিত ইগনাৎ বলল, কী আশ্চর্য!
মাভ্রা কুজমিনিচনা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে বলে উঠল, বেয়াদপি! বেয়াদপি! মোটা জালাটা কী রকম দাঁত বের করেছে দেখ! তুমি কি এই জন্যই এখানে আছ? ওদিকে কিছু পরিষ্কার করা হয়নি, আর ভাসিলিচ খেটে খেটে মারা গেল। একটু সবুর কর!
বেল্টটা ঠিক করতে করতে চোখ নিচু করে ইগনাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ছেলেটি বলল, আমি খুব আস্তে আস্তেই বাজাচ্ছিলাম মাসি।
হাত তুলে মারের ভয় দেখিয়ে মাভ্রা কুজমিনিচনা বলল, তোমাকেও আস্তে আস্তেই কিছু দেব, বাঁদর কোথাকার! যাও, ঠাকুর্দার জন্য সামোভারটা গরম কর গে।
মাভ্রা কুজমিনিচনা ক্ল্যাভিকর্ডের ধুলো ঝেড়ে সেটা বন্ধ করল; দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে প্রধান দরোজায় তালা লাগিয়ে দিল।
