মৌমছি-পালক চাকের উপরের অংশটা খুলে ভিতরটা পরীক্ষা করে দেখে। মধুচক্রের প্রতিটি খোপ মোম দিয়ে ভর্তি করার কাজে ব্যস্ত থাকা মৌমাছির পরিবর্তে এখন সে দেখতে পায় শুধু মধুচক্রের একটা জটিল সুকৌশল গঠন, কিন্তু আগেকার পবিত্রতার স্পর্শ তাতে নেই। সবই উপেক্ষিত, পচা। কালো কালো দস্যু মৌমাছিগুলি দ্রুতপায়ে চোরের মতো মধুচক্রের উপর দিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে, আর ছোট ছাট গৃহিণী মৌমাছিগুলি নিরুৎসাহভাবে বিকৃত দেহ নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দস্যুগুলোকে তাড়াবার কোনো চেষ্টাই করছে না; যেন জীবনের সব বোধ, সব বাসনাই হারিয়ে ফেলেছে। মৌমাছি-পালক মধ্যেকার দুটো বেড়া ফাঁক করে জীবকোষগুলোকে পরীক্ষা করে। আগে যেখানে পিঠে পিঠ লাগিয়ে হাজার হাজার মৌমাছি কালো বৃত্ত রচনা করে রাখত যেন জন্মের গভীর রহস্যকে ঢেকে রাখবার জন্যই, এখন সেখানে সে দেখে শুধু কয়েক শ নিস্তেজ, নিরুৎসাহ মৌমাছির ঘুমন্ত খোলস। নিজেদের অজ্ঞাতেই তারা প্রায় মরতে বসেছে; যে আশ্রয়কে তারা এতদিন রক্ষা করেছে, এখন আর যার কোনো অস্তিত্বই নেই, তারই উপরে তারা বসে আছে। তাদের গায়ে ধ্বংস ও মৃত্যুর গন্ধ। শুধু কয়েকটা মৌমাছি এখনো নড়ছে, উঠছে, শত্রুর হাতের উপর বসবার জন্য কোনোক্রমে উড়ছে, শেষবারের মতো হুল ফুটিয়ে মরবার ইচ্ছাটা পর্যন্ত হারিয়ে গেছে; বাকিগুলো সব মরে গেছে, মাছের আঁশের মতো ঝরে পড়ছে। মৌমাছি-পালক চাকটা বন্ধ করে, তার উপর একটা খড়ির দাগ কাটে, তারপর সময়মতো ভিতর থেকে সবকিছু বের করে এনে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।
মস্কো যখন ঠিক সেইরকম ফাঁকা তখনই ক্লান্ত বিষণ্ণ নেপোলিয়ন কামের-কোলেজস্কি প্রাচীরের সামনে পায়চারি করতে করতে প্রতিনিধিদলের জন্য অপেক্ষা করছে; নেহাৎই আনুষ্ঠানিক ব্যাপার হলেও তার বিবেচনায় এই সৌজন্য রক্ষা করে চলা প্রয়োজন।
মস্কোর কোণে কোণে তখনো কিছু লোক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে; তারা যে কি করছে সেটা না বুঝেই পুরনো অভ্যাসবশত ঘোরাফেরা করছে।
অনেক বিচার-বিবেচনার পরে নেপোলিয়নকে যখন জানানো হল যে মস্কো জনশূন্য, তখন সে সংবাদদাতার দিকে একবার ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই সরে গেল এবং নীরবে পায়চারি করতে লাগল।
আমার গাড়ি! হাঁক দিল।
কর্তব্যরত এড-ডি-কংয়ের পাশে বসে নেপোলিয়ন শহরতলীর দিকে গাড়ি চালিয়ে দিল। নিজের মনেই বলল, মস্কো পরিত্যক্ত! কী অবিশ্বাস্য ঘটনা!
শহরে না ঢুকে সে দরগমিলভ শহরতলীর একটা সরাইখানায় উঠল।
নাটকীয় ঘটনাটি আর ঘটল না।
.
অধ্যায়–২১
রাত দুটো থেকে বিকেল পর্যন্ত রুশ সৈন্যরা মস্কোর উপর দিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল; আহত সৈন্য ও অবশিষ্ট অধিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে গেল।
সৈন্যদের চলাচলের সবচাইতে বেশি চাপ পড়ল স্টোন, মস্ক ও ইয়াউজা সেতুর উপর।
সৈন্যরা যখন দুদলে ভাগ হয়ে ক্রেমলিনকে ঘুরে যাচ্ছিল, মস্ক ও স্টোন সেতুর উপর ভিড় করছিল, তখন বহুসংখ্যক সৈন্য সেই ভিড় ও যানজটের সুযোগ নিয়ে সেইসব সেতুর উপর থেকে পিছিয়ে এসে নিঃশব্দে চুপি চুপি সরে পড়ল এবং সুন্দরী ভাসিলি গির্জার পাশ দিয়ে ও বরভিৎস্কি ফটকের নিচ দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে রেড স্কোয়ারে ফিরে গেল; সহজাত প্রবৃত্তিই যেন তাদের বলে দিল, সেখানে গেলে তারা সহজেই এমন সব জিনিস হাতাতে পারবে যা তাদের নয়। সস্তা নিলামে যেসব লোক ভিড় করে তারা এসে বাজারের অলিগলি সব ভরে ফেলেছে; কিন্তু কোনো নিলামওয়ালা গলা ছেড়ে খদ্দেরদের সাদর আহ্বান জানাচ্ছে না; কোনো ফেরিওয়ালা সেখানে নেই, নেই ক্রয়েচ্ছ মেয়েদের ভিড়; শুধু ইউনিফর্ম ও ওভারকোট পরা সৈন্যরাই ভিড় করেছে; তাদের হাতে কিন্তু বন্দুক নেই; খালি হাতে তারা নীরবে বাজারে ঢুকছে আর নানারকম বান্ডিল হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও তাদের সহকারীরা বিমূঢ়ভাবে ইতস্তত চলাফেরা করছে। একবার দোকানের তালা খুলছে, আবার লাগাচ্ছে, আর সহকারীদের সহায়তায় যতটা পারছে মালপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। বাজারের সামনে স্কোয়ারের মধ্যে ভেরীবাদকরা জমায়েতের বাজনা বাজাচ্ছে, কিন্তু তা শুনে সৈন্যরা তাদের দিকে এগিয়ে না গিয়ে বরং আরো দূরে সরে যাচ্ছে। দোকানে ও গলিতে সৈন্যদের মধ্যে এমন কিছু লোক দেখা যাচ্ছে যাদের পরনে ধূসর কোট, মাথা কামানো (জেল থেকে ছাড়া পাওয়া বন্দির দল)। দুজন অফিসার ইলিংকা স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। একজনের ইউনিফর্মের উপর চাদর জড়ানো, একটা শুটকো গাঢ় ধূসর রঙের ঘোড়ায় আসীন; অপরজনের গায়ে ওভারকোট, রাস্তায় দণ্ডায়মান। তৃতীয় একজন অফিসার ঘোড়া ছুটিয়ে সেখানে এল।
জেনারেল হুকুম দিয়েছেন, এই মুহূর্তে সব্বাইকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ যে অসহ্য! অর্ধেক সৈন্য সরে পড়েছে।
বন্দুকবিহীন তিনজন পদাতিক সৈন্য ওভারকোটের তলাটা উঁচু করে তুলে বাজারের গলিতে কেটে পড়ছিল; তাদের দেখে অফিসারটি চেঁচিয়ে বলল, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?…কোথায়?…থামো, রাস্কেলের দল!
অপর অফিসার বলল, কিন্তু ওদের আপনি থামাবেন কেমন করে? ওদের তো একত্রে পাওয়াই যাচ্ছে না। অন্যরা পথ আটকাবার আগেই সেনাবাহিনীকে এগিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু এগিয়ে যাবে কেমন করে? ওরা তো ওখানে আটকে গেছে, সেতুর উপর যেন খোটা, গেড়েছে, মোটেই নড়ছে না। বাকিরা যাতে পালাতে না পারে সেজন্য তাদের ঘেরাও করা দরকার নয় কি?
