বয়ারদের আমার সামনে হাজির কর, দলের লোকদের বলল।
ঝকঝকে পোশাক পরা একজন জেনারেল সঙ্গে সঙ্গে বয়ারদের আনতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
দুঘণ্টা কেটে গেল। নেপোলিয়ন খাওয়া শেষ করে পকলোনি পাহাড়ের উপর সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিনিধিদলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। বয়ারদের কাছে যে ভাষণটি দেবে কল্পনায়ও সেটা স্পষ্ট রূপ পেয়ে গেছে। নেপোলিয়নের ধারণামতে সে ভাষণ মর্যাদা ও মহত্ত্বে পরিপূর্ণ।
মস্কোর প্রতি যে উদারতা দেখাবে বলে সে স্থির করেছে তার দ্বারা সে নিজেই অভিভূত হয়ে পড়েছে। জারদের প্রাসাদে অনুষ্ঠিত যে সমাবেশে রাশিয়ার এবং তার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ একত্র মিলিত হবে, কল্পনায় তার দিন-ক্ষণ পর্যন্ত সে স্থির করে ফেলেছে। মনে মনে এমন একজন শাসনকর্তা নিয়োগ করেছে যে জনগণের হৃদয় জয় করবে। মস্কোতে অনেক দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান আছে জেনে সে মনে মনে স্থির করেছে যে সে সবগুলিতেই সে করুণা বিতরণ করবে। আফ্রিকাতে সে যেমন আরবদের মতো মস্তকাবরণ পরে মসজিদে গিয়ে বসেছিল, তেমনই মস্কোতেও সে জারদের মতোই সকলের উপকার করবে এবং শেষপর্যন্ত রুশদের অন্তরকে স্পর্শ করার উদ্দেশ্যে সে স্থির করল যে এইসব প্রতিষ্ঠানের গায়ে সে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করে দেবে : এই প্রতিষ্ঠানকে আমার আদরের মায়ের নামে উৎসর্গ করা হইল। অথবা শুধু লেখা হবে : Maison de la Mere (মাতৃসদন)। কিন্তু আমি কি সত্যি মস্কোতে এসেছি? হ্যাঁ, ওই তো সে আমার সামনে পড়ে আছে। কিন্তু শহর থেকে প্রতিনিধিদল আসতে এত বিলম্ব হচ্ছে কেন? সে অবাক হল।
ইতিমধ্যে তার দলবলের পিছন দিকে জেনারেল ও মার্শালদের মধ্যে ফিসফিস করে একটা উত্তেজিত আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। প্রতিনিধিদলকে নিয়ে আসতে যারা গিয়েছিল তারা এই সংবাদ নিয়ে ফিরে এসেছে যে মস্কো এখন জনশূন্য, প্রত্যেকেই মস্কো ছেড়ে চলে গেছে। যারা আলোচনা করছে তাদের মুখ বিবর্ণ ও বিচলিত অধিবাসীরা মস্কো ত্যাগ করে চলে গেছে এ সংবাদে তারা শঙ্কিত নয়, তাদের শঙ্কা হচ্ছে ম্রাটের মর্যাদাকে হাস্যকর করে না তুলে কেমন করে তাকে বলা হবে যে বৃথাই সে এতক্ষণ বয়ারদের জন্য অপেক্ষা করে আছে : মস্কোতে এখন পাঁড় মাতাল ছাড়া আর কেউ নেই। কেউ বলল, কোনোরকম একটা প্রতিনিধিদল খাড়া করা হোক; আবার অন্যরা তাতে আপত্তি করে বলল, আগে সাবধানে সুকৌশলে সম্রাটকে তৈরি করে নিয়ে তারপর সত্য কথাই বলা হোক।
তাকে বলতে তো হবেই। কিন্তু ভদ্ৰজনরা…
অবস্থাটা আরো ঘোরালো হয়ে উঠেছে কারণ বড় বড় পরিকল্পনার কথা ভাবতে ভাবতে সম্রাট প্রসারিত মানচিত্রের পাশে ধৈর্যের সঙ্গে পায়চারি করছে এবং উজ্জ্বল গর্বের হাসি হেসে কপালের উপর হাত তুলে বারবার মস্কোর রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।
কিন্তু এ যে অসম্ভব, দলের লোকরা কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল; কিন্তু এটা হাস্যকর এই আসল কথাটা সাহস করে বলতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ প্রতীক্ষায় ক্লান্ত হয়ে সম্রাট তার অভিনেতাসুলভ স্বাভাবিক প্রবৃত্তিবশেই বুঝতে পারল যে অত্যন্ত বেশিক্ষণ বিলম্বিত হওয়ার ফলে সেই মহান মুহূর্তটি তার মহত্ত্বকে হারিয়ে ফেলেছে; সঙ্গে সঙ্গে সে হাত তুলে একটা ইঙ্গিত করল। তারপরেই শোনা গেল কামানের একটা সংকেত-ধ্বনি, আর মস্কোর বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা সৈন্যরা তিভের, কালুগা ও দরগমিলভ ফটক দিয়ে শহরে ঢুকতে শুরু করল। পরস্পরের সঙ্গে রেষারেষি করে দ্রুত, আরো দ্রুত তারা জোর কদমে বা দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, অশ্বক্ষুর থেকে উথিত ধোয়ায় নিজেরাই ঢেকে গেল, সকলের কান-ফাটানো সম্মিলিত কোলাহলে বাতাস ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
সৈন্যদের গতির টানে নেপোলিয়নও তাদের সঙ্গে দরগমিলভ ফটক পর্যন্ত গিয়ে থামল, ঘোড়া থেকে নেমে কামের-কোলেজস্কি প্রাচীরের পাশে অনেকক্ষণ পায়চারি করল প্রতিনিধিদলের প্রতীক্ষায়।
.
অধ্যায়-২০
ইতিমধ্যে মস্কো ফাঁকা হয়ে গেছে। কিছু লোক তখনো আছে, হয়তো আগেকার জনসংখ্যার পঞ্চাশ ভাগের একভাগ; তবু ফাঁকা। রানী-মৌমাছিহীন একটা মুমূর্ষ মৌচাক যে অর্থে ফাঁকা।
ভাসা-ভাসা চোখে অন্য যেকোনো মৌচাকের মতো জীবন্ত দেখালেও রানী-মৌমাছিহীন মৌচাকে কোনো জীবন থাকে না।
জীবন্ত মৌচাকের মতোই রানীহীন মৌচাক ঘিরেও মৌমাছিরা চক্রাকারে ঘোরে মধ্যাহ্ন সূর্যের উত্তপ্ত রোদ গায়ে মেখে; অন্য মৌচাকের মতোই দূর থেকে মধুর গন্ধ পাওয়া যায়, মৌমাছিরা ভিতরে-বাইরে একইভাবে উড়তে থাকে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে চাকে তখন আর জীবন নেই। মৌমাছিরা ঠিক আগের মতো ওড়ে না, মৌমাছি-পালকের নাকেও আগের মতো গন্ধ আসে না। মৌমাছি-পালক যখন রুগ্ন, মৌচাকের দেয়ালে টোকা দেয় তখন আগে যেমন মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মৌমাছি তলপেটকে ভয়ংকরভাবে সংকুচিত করে এক সুরে গুঞ্জন করে উঠত, পাখনার দ্রুত ঝটপটানিতে একটা বায়বীয় জীবন্ত শব্দ তুলত, তার পরিবর্তে পরিত্যক্ত মৌচাক থেকে শোনা যায় শুধু বিভিন্ন অংশ থেকে আসা একটা অসংলগ্ন ভোঁ-ভোঁ শব্দ। শান্ত্রী-মৌমাছিরা যেভাবে তলপেটটা তুলে বিপদ-সংকেত জানাত এবং মৌচাকটিকে রক্ষায় জীবন দিতে প্রস্তুত হত এখন আর সেটা দেখা যাবে না। ফুটন্ত জলের মতো স্পন্দিত কর্মব্যস্ততার পরিমিত শান্ত শব্দের পরিবর্তে এখন শোনা যাবে নানা বিশৃঙ্খল বেসুরো শব্দ। মৌচাকের ভিতরে ও বাইরে লম্বা কালো দস্যু-মৌমাছিগুলি মধুতে মাখামাখি হয়ে ভীরু ধীর গতিতে উড়ে বেড়ায়। তারা হুল ফোঁটায় না, ভয়ে কুঁকড়ে সরে যায়। আগে একমাত্র মধুবাহী মৌমাছিরাই চাকের ভিতরে ঢুকত, বেরিয়ে আসত শূন্য দেহে, আর এখন তারা বেরিয়ে আসছে মধুর বোঝাই হয়ে। আগে থাকত একটা পরিষ্কার চটচটে মেঝে, সেখানে বইত মৌমাছিদের পাখার হাওয়া, আর এখন মেঝেতে ছড়িয়ে আছে মোমের টুকরো, বিষ্ঠা, মুমূর্ষ মৌমাছিরা কোনোরকমে পা নাড়ছে, আর মরা মৌমাছিগুলোকেও সরিয়ে দেওয়া হয়নি।
