ঠিক সেইসময় ২রা সেপ্টেম্বর সকাল দশটায় পকলোনি পাহাড়ের উপর সৈন্যপরিবৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে সম্মুখে প্রসারিত প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। ২৬শে আগস্ট থেকে ২রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ বরদিনোর যুদ্ধ থেকে ফরাসি বাহিনীর মস্কোতে প্রবেশ পর্যন্ত একটা উত্তেজনাপূর্ণ স্মরণীয় সপ্তাহ ধরে দেখা দিয়েছে সেই অপ্রত্যাশিত হেমন্তের আবহাওয়া যা হঠাৎ এসে সকলকে অবাক করে দেয়, যখন সূর্য নেমে এসে বসন্তকালের চাইতে বেশি উত্তাপ ছড়ায়, যখন বিরল পরিষ্কার আবহাওয়ায় সবকিছু ঝলমল করে চোখকে ধাধিয়ে দেয়, যখন হেমন্তের সুরভিত বাতাস শ্বাস টেনে হৃৎপিণ্ড শক্তিশালী ও তাজা হয়ে ওঠে, যখন রাতগুলি পর্যন্ত আতপ্ত হয়ে ওঠে, যখন সেই অন্ধকারে আতপ্ত রাতে সোনালি তারারা অনবরত আকাশ থেকে খসে পড়ে আমাদের চকিত ও আনন্দিত করে তোলে।
২রা সেপ্টেম্বর সকাল দশটাতেও সেই একই আবহাওয়া চলেছে।
সকালের উজ্জ্বলতায় যাদুর স্পর্শ। পকলোনি পাহাড় থেকে দেখা যাচ্ছে, মস্কো তার নদী, বাগান ও গির্জা নিয়ে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত; তার বুকে যেন বয়ে চলেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা; সূর্যের আলোয় তার গম্বুজগুলো তারার মতো ঝলমল করছে।
বিশিষ্ট স্থাপত্যকীর্তিসমন্বিত এই বিচিত্র শহরটির দিকে তাকিয়ে নেপোলিয়নের মন সেই ঈর্ষাতুর অস্বস্তিকর কৌতূহলে ভরে উঠল যা মানুষ বোধ করে একটা অজ্ঞাতপূর্ব বিপরীত জীবনধারার স্বাদ পেলে। শহরটি যেন তার নিজস্ব জীবনযাত্রার তাগিদে বেঁচে আছে। অনেক দূর থেকেও যে অস্পষ্ট লক্ষণ দেখে মৃত ও জীবিতের পার্থক্য বোঝা যায়, তা দেখেই পকলোনি পাহাড়ে দাঁড়িয়ে নেপোলিয়ন এই শহরটির প্রাণ স্পন্দনকে অনুভব করতে পারল; একটি সুন্দর মহান দেশের শ্বাস-প্রশ্বাস যেন তার নাড়িতে স্পন্দিত হতে লাগল।
মস্কোর দিকে তাকিয়ে প্রতিটি রুশই তাকে মা বলে মনে করে; নগরজননী হিসেবে তার তাৎপর্য ধরতে না পারলেও মস্কোর এই নারী-চরিত্র প্রতিটি বিদেশীর চোখেও ধরা পড়ে; নেপোলিয়নের চোখেও পড়ল।
ঐ তো সেই অসংখ্য গির্জাশোভিত এশিয়ার শহর মস্কো! শেষপর্যন্ত তাহলে এলাম সেই বিখ্যাত শহরে! সময় হয়েছে নিকট এবার। ফরাসিতে কথাগুলি বলে নেপোলিয়ন ঘোড়া থেকে নামল; মস্কোর একখানা মানচিত্র সামনে খুলে ধরবার হুকুম দিয়ে দোভাষী লেরশ্নে দ্য ইদেভিলকে ডেকে পাঠাল।
যে শহরকে শত্রু দখল করেছে সে তো মানহারা কুমারীর মতো, সে ভাবল (মালেনস্ক-এ কথাটা সে তুচকভকে বলেছিল)। সেই দৃষ্টিতেই সে এই অদৃষ্টপূর্ব প্রাচ্য সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্যনীয় বাসনা যে শেষপর্যন্ত পূর্ণ হয়েছে সেকথা ভেবে তার অবাক লাগছে। সকালের পরিক্ষার আলোয় একবার শহরকে দেখছে, একবার মানচিত্রের দিকে তাকাচ্ছে, তার খুঁটিনাটি বিচার করছে, আর তাকে পাবার নিশ্চিত আশ্বাসে মনটা উত্তেজনায় ও ভয়ে দুলে উঠছে।
সে ভাবতে লাগল : এর কি অন্যথা হতে পারত? এই তো রাজধানী আমার পায়ের তলে পড়ে আছে। কোথায় এখন আলেক্সান্দার, আর কিই বা তিনি ভাবছেন? একটা আশ্চর্য সুন্দর মহান নগরী, আর একটা আশ্চর্য ও মহান মুহূর্ত! কোন আলোয় আমি তাদের কাছে দেখা দেব! নিজের সৈন্যদের কথা মনে করে সে ভাবল, এই তো সেই নারী, এইসব দুর্বল-হৃদয় মানুষদের পুরস্কার। আমার মুখের একটি কথা, আমার হাতের একটি ইশারা, সঙ্গে সঙ্গে জারদের এই প্রাচীন শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ক্ষমা তো বিজিতের মাথায় নেমে আসবার জন্য সদাই প্রস্তুত। আমাকে উদার হতে হবে, সত্যিকারের মহৎ হতে হবে। কিন্তু না, আমি মস্কোতে এসে গেছি এটা সত্য হতে পারে না, হঠাৎ তার মনে হল কথাটা। কিন্তু ওই তো সে আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে, তার সোনালি গম্বুজ ও কুশগুলি সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। কিন্তু আমি তাকে মুক্তি দেব। বর্বরতা ও স্বেচ্ছাচারের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে আমি উৎকীর্ণ করে যাব ন্যায় ও করুণার মহান বাণী। এটাই আলেক্সান্দারকে সবচাইতে বেশি ব্যথা দেবে, তাকে আমি চিনি। (নেপোলিয়নের ধারণা যা কিছু ঘটছে নিজের এবং আলেক্সান্দারের মধ্যে ব্যক্তিগত সংঘর্ষই তার প্রধান তাৎপর্য) ক্রেমলিনের মাথায় দাঁড়িয়ে-হ্যাঁ। ঐ তো ক্রেমলিন–আমি তাদের দেব সঠিক বিধান, তাদের শিখিয়ে দেব সভ্যতার প্রকৃত অর্থ, এমন ব্যবস্থা করব যাতে বয়াররা (জারের প্রধান সহকারীর দল) বংশ বংশ ধরে তাদের বিজেতাকে ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করে। প্রতিনিধিদলকে বলব, যুদ্ধ আমি চাইনি, কোনোদিনই চাই না; আমি যুদ্ধ করেছি শুধু তাদের রাজদরবারের ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে; আলেক্সান্দারকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি; মস্কোতে আমার নিজের এবং আমার জনগণের উপযুক্ত শর্তে সন্ধির প্রস্তাব আমি মেনে নেব। যুদ্ধের সৌভাগ্যকে একজন সম্মানিত নৃপতিকে অসম্মান দেখাবার কাজে লাগাতে আমি চাই না। তাদের ডেকে বলব, বয়ারগণ, আমি যুদ্ধ চাই না, চাই আমার প্রজাবৃন্দের শান্তি ও কল্যাণ। যাই হোক, আমি জানি তাদের উপস্থিতি আমাকে অনুপ্রাণিত করবে, যেমন সব সময়ই করে থাকি তাদের সঙ্গেও সেইভাবেই কথা বলব : স্পষ্টভাবে, প্রভাব বিস্তার করে, মহত্ত্বের সঙ্গে। কিন্তু আমি মস্কোতে পৌঁছেছি–এ কি সত্য হতে পারে? হ্যাঁ, ওই তো সে পড়ে আছে।
