লোকটি বলল, ক্রেমলিনে আজ সব্বাইকে অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে, কাল প্রত্যেককে পাঠিয়ে দেওয়া হবে তিনপাহাড় ফটকের ওপারে, সেখানে একটা প্রচণ্ড লড়াই হবে।
প্যাট্রিয়াকর্স পন্তে পৌঁছে পিয়ের বাজদিভের বাড়িটা খুঁজে নিল। অনেকদিন এখানে আসা হয়নি। ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ঢোকার শব্দে গেরাসিম বেরিয়ে এল। পাঁচ বছর আগে তঝকে এক ফ্যাকাসে দাড়িহীন বুড়ো লোকটাকেই সে জোসেফ বাজদিভের সঙ্গে দেখেছিল।
বাড়ি আছেন? পিয়ের শুধাল।
যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে তার ফলে সোফিয়া দানিলভনা বাচ্চাদের নিয়ে তঝক জমিদারিতে চলে গেছেন ইয়োর এক্সেলেন্সি।
আমাকে ভিতরে যেতেই হবে, বইগুলো একবার দেখতে চাই, পিয়ের বলল।
দয়া করে ভিতরে আসুন। আমার স্বর্গত মনিবের ভাই মকার আলেক্সিভিচ এখানেই আছেন, কিন্তু আপনি তো জানেন তার অবস্থাও খুব দুর্বল, বুড়ো চাকরটি বলল।
পিয়ের জানে জোসেফ বাজদিভের আধাপাগল ভাই মকার আলেক্সিভিচ একটি পাঁড় মাতাল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি। ভিতরে চল… বলে পিয়ের বাড়ির ভিতরে ঢুকল।
একটি লাল নাক, টাক মাথা, লম্বা বুড়ো লোক বাইরে ঘরে দাঁড়িয়েছিল। তার পরনে ড্রেসিং-গাউন, পায়ে উঁচু রবারের জুতো। পিয়েরকে দেখে রাগে বিড়বিড় করতে করতে সে বারান্দা ধরে চলে গেল।
গেরাসিম বলল, একসময় খুব চালাক-চতুর লোক ছিলেন, কিন্তু ইয়োর অনার তো দেখতেই পাচ্ছেন যে এখন বড়ই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। আপনি কি পড়ার ঘরে যাবেন? পিয়ের মাথা নাড়ল। ঘরটা যেমন সিল মারা ছিল তেমনই আছে। সোফিয়া দানিলভনা বলে গেছেন, আপনার কাছ থেকে কেউ এলে তাকে যেন বইগুলো দিয়ে দেই।
উপকারীর জীবদ্দশায় এই বিষণ্ণ পড়ার ঘরটাতে দুরুদুরু বুকে পিয়ের অনেকবার ঢুকেছে। জোসেফ বাজদিভের মৃত্যুর পরে কারো হাত না পড়ায় ধুলোময়লাতে ঘরটা আরো বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
একটা জানালা খুলে দিয়ে গেরাসিম পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পিয়ের চারদিক ঘুরে দেখল, যে কাবার্ডে হাতে-লেখা পুঁথিগুলি থাকে সেদিকে গেল এবং যে গ্রন্থগুলি একদিন ছিল সংঘের পবিত্রতম বস্তু সেগুলি বের করে নিল। ধূলি-মলিন লেখার টেবিলে বসে পাণ্ডুলিপিগুলি সামনে মেলে ধরল, আবার বন্ধ করল, একপাশে সরিয়ে রাখল, তারপর দুই হাতের মধ্যে মাথাটা রেখে ধ্যানে ডুবে গেল।
গেরাসিম বারকয়েক সতর্কভাবে ঘরে এল; প্রত্যেকবারই পিয়েরকে সেই একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখল।
দু ঘণ্টার বেশি পার হয়ে গেল। পিয়েরের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য গেরাসিম সাহস করে দরোজার কাছে একটু শব্দ করল; কিন্তু পিয়ের তা শুনতে পেল না।
কোয়ানকে কি ছেড়ে দেব ইয়োর অনার?
ওঃ, হ্যাঁ! ধ্যান ভেঙে তৃরিতে উঠে পিয়ের বলল। তারপর গেরাসিমের কোটের একটা বোম ধরে অশ্রুভেজা, রহস্যময় চোখে বুড়ো লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি বলছি কি, কাল যে একটা যুদ্ধ হবে তা কি তুমি জান?
সেইরকমই শুনেছি, লোকটি জবাব দিল।
আমার অনুরোধ, আমি কে সেকথা কাউকে বল না, আর আমি যা বলছি তাই কর।
গেরাসিম বলল, ঠিক আছে ইয়োর এক্সেলেন্সি। আপনি কিছু খাবেন কি?
না, কিন্তু একটা জিনিস আমি চাই। পরিষ্কার জামা-কাপড় আর একটা পিস্তল, অপ্রত্যাশিতভাবেই মুখটা লাল করে পিয়ের বলল।
একমুহূর্ত ভেবে গেরাসিম বলল, তাই হবে ইয়োর এক্সেলেন্সি।
সারাটাদিন পিয়ের একাকি সেই পড়ার ঘরেই কাটাল। গেরাসিম শুনতে পেল সে অস্থিরভাবে ঘরময় পায়চারি করছে আর আপন মনেই কথা বলছে।
সেই ঘরের বিছানাতেই রাতটাও কাটাল।
এ বাড়িতে অনেক বিচিত্র ঘটনা ঘটতে গেরাসিম দেখেছে; তাই পিয়ের এ বাড়িতে থাকাতেও সে বিস্মিত হল না, বরং একজন লোক পেয়ে খুশিই হল। সেদিন সন্ধ্যায়ই বিনা প্রশ্নে সে পিয়েরের জন্য একটা কোচয়ানের কোট ও টুপি এনে দিল এবং কথা দিল যে পিস্তলটা পরের দিন যোগাড় করে দেবে। সন্ধ্যাবেলা মকার আলেক্সিভিচ তার উঁচু রবারের জুতো পরে দরোজা পর্যন্ত এসে করুণ চোখে পিয়েরের দিকে তাকাল। কিন্তু পিয়ের তার দিকে চোখ ফেরাতেই ড্রেসিং-গাউনে শরীরটা ঢেকে লাজুক অথচ ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। গেরাসিমের এনে দেওয়া কোটটাকে উত্তাপের সাহায্যে জীবাণুমুক্ত করে সেটাকে গায়ে চাপিয়ে পিয়ের যখন বুড়োকে সঙ্গে নিয়ে সুখারেভ মার্কেটে যাচ্ছিল পিস্তল কিনতে তখনই তার সঙ্গে রস্তভদের দেখা হয়ে যায়।
.
অধ্যায়-১৯
মস্কোর ভিতর দিয়ে রিয়াজান রোডে পশ্চাদপসরণের কুতুজভের হুকুমনামাটা জারি করা হল ১লা সেপ্টেম্বর রাতে।
প্রথম সেনাদল সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রা করল; সারারাত কোনোরকম তাড়াহুড়া না করে তারা ধীরেসুস্থে পিছিয়ে চলল। অবশ্য ভোরবেলা দরগমিলভ সেতুর নিকটবর্তী শহরের কাছে পৌঁছে তারা দেখতে পেল, তাদের সামনে দলে দলে সৈন্য ভিড় করে সেতু পার হচ্ছে, বিপরীত দিক থেকে উঠে রাজপথ ও গলি আটকে দিচ্ছে, আবার পিছন দিক থেকে অসংখ্য সৈন্য অকারণ তাড়াহুড়ায় ও আতঙ্কে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা সেতুর দিকে, সেতুর উপরে এবং নানা খড়ি ও নৌকোর দিকে ছুটে যাচ্ছে। স্বয়ং কুতুজভ ঘুরপথে গাড়ি হকিয়ে মস্কোর অপরদিকে পৌঁছে গেছে।
২রা সেপ্টেম্বর সকাল নাগাদ বাহিনীর একমাত্র পিছনের অংশটাই রয়ে গেল দরগমিলভের উপকণ্ঠস্থ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। মূল বাহিনী তখন মস্কোর অপর দিকে অথবা মস্কো ছাড়িয়ে চলে গেছে।
