যদিও এখন লোকটি আরো দূরে চলে গেছে তবু রস্তভরা সকলেই পিয়েরকে-বা হুবহু তার মতো দেখতে একটি লোককে-দেখতে পেল; একটা কোচয়ানের কোট গায়ে চড়িয়ে মাথাটা নিচু করে গম্ভীর মুখে হেঁটে চলেছে; পাশে একটি ছোটখাট দাড়িহীন বুড়ো মানুষ; দেখে মনে হয় পরিচারক। বুড়ো লোকটি খেয়াল করল যে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে কে যেন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে; সশ্রদ্ধভাবে পিয়েরের কনুই ছুঁয়ে তাকে কি যেন বলে গাড়িটা দেখাল। পিয়ের চিন্তায় ডুবে ছিল, প্রথমে তার কথা বুঝতে পারল না। পরে বুড়োর নির্দেশমতো গাড়িটার দিকে তাকিয়ে নাতাশাকে চিনকে পারল এবং প্রথম আবেগের টানেই দ্রুতপায়ে গাড়িটার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু ডজনখানেক পা ফেলার পরেই কিছু মনে পড়ায় থেমে গেল।
নাতাশার মুখটা রহস্যময় মমতায় জ্বলজ্বল করতে লাগল।
পিয়েরের দিকে হাত বাড়িয়ে সে চেঁচিয়ে বলল, পিতর কিরিলভিচ, এখানে আসুন! আমরা তাকে চিনতে পেরেছি! কী আশ্চর্য!…আপনি এখানে কি করছেন? আপনার এরকম চেহারা হয়েছে কেন?
চলমান গাড়ি থেকেই নাতাশা হাত বাড়িয়ে দিল। গাড়ির পাশে হাঁটতে হাঁটতেই সে হাতটায় চুমো খেল।
বিস্মিত ও সহানুভূতিপূর্ণ সুরে কাউন্টেস বলল, ব্যাপার কি কাউন্ট?
কি? কি? কেন? এসব প্রশ্ন করবেন না, বলে পিয়ের নাতাশার দিকে মুখ ফেরাল; তার আনন্দে রক্তিম মুখখানি দেখে সে মুগ্ধ হয়ে গেল।
আপনি তাহলে মস্কোতেই আছেন?
পিয়ের ইতস্তত করল।
মস্কোতে? হ্যাঁ, মস্কোতে। বিদায়!
নাতাশা বলে উঠল, হায়, আমি যদি পুরুষমানুষ হতাম! তাহলে ঠিক ওঁর সঙ্গে থেকে যেতাম। কী চমৎকার! মামণি, যদি রাজি হও তো আমি থেকে যাই।
নাতাশার দিকে তাকিয়ে পিয়ের কি যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কাউন্টেস তাকে বাধা দিল।
শুনেছি, আপনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, গিয়েছিলাম, পিয়ের জবাব দিল। কাল আর একটা যুদ্ধ হবে… নাতাশা তাকে বাধা দিল।
কিন্তু আপনার কি হয়েছে কাউন্ট? আপনি যে একেবারেই বদলে গেছেন।…
আঃ, কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না, কিচ্ছু না! আমি নিজেই জানি না। কাল…কিন্তু না! বিদায়, বিদায়!…বড়ই খারাপ সময় চলেছে! সে ফুটপাতে পা বাড়িয়ে দিল।
নাতাশা অনেকক্ষণ জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রইল; একটা রহস্যময় খুশির হাসিতে তার মুখটা ঝলমলিয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-১৮
বাড়ি ছেড়ে আসার পর থেকে শেষের দুটো দিন পিয়ের তার উপকারী মৃত বাজদিভের খালি বাড়িতেই বাস করছে। ব্যাপারটা এইভাবে ঘটেছে।
মস্কোতে ফিরে আসার পরে এবং কাউন্ট রস্তপচিনের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন কিছুক্ষণ সে বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে এবং তাকে কি করতে হবে। যখন তাকে জানানো হল যে অভ্যর্থনা-ঘরে যারা তার জন্য অপেক্ষা করছে তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে একটি ফরাসি ভদ্রলোক, আর সে তার স্ত্রী কাউন্টেস হেলেনের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে এসেছে, তখন সহসা একটা বিশৃঙ্খলা ও হতাশার ভাব তাকে একেবারে পেয়ে বসল। তার মনে হল, সব শেষ হয়ে গেছে, সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, কেউ ঠিক নয় বা কেউ ভুল নয়, ভবিষ্যতের কোনো আশা নেই, আর এ পরিস্থিতির হাত থেকেও পরিত্রাণ নেই। অস্বাভাবিকভাবে হেসে বিড়বিড় করে কি যেন বলল, প্রথমে হতাশ হয়ে একটা সোফায় বসে পড়ল, তারপর উঠে অভ্যর্থনা-ঘরের দরোজার কাছে গিয়ে একটা ফোকড়ের ভিতর দিয়ে উঁকি দিল, এবং দুই হাত ঘোরাতে ঘোরাতে এসে একটা বই তুলে নিল। বড় নায়েব দ্বিতীয়বার ঘরে ঢুকে বলল, যে ফরাসি লোকটি কাউন্টেসের চিঠি নিয়ে এসেছে সে একমিনিটের জন্য হলেও একবার দেখা করতে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর বাজদিতের বিধবা পত্নীর কাছ থেকে আগত একজন জানাচ্ছে, যেহেতু বিধবাটি গ্রামে ফিরে যাচ্ছে তাই পিয়ের যেন তার স্বামীর বইগুলোর ভার বুঝে নেয়।
পিয়ের বলল, ও, হ্যাঁ, একমিনিট সবুর কর…না, থাক।…গিয়ে বল, আমি এখনই যাচ্ছি।
কিন্তু লোকটি বেরিয়ে যেতেই পিয়ের টেবিল থেকে টুপিটা নিয়ে অন্য দরোজা দিয়ে পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বারান্দায় কেউ ছিল না। গোটা বারান্দাটা পেরিয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত চলে গেল এবং ভুরু কুঁচকে দুই হাতে কপালটা ঘষে প্রথম চাতাল পর্যন্ত নেমে গেল। হলের দারোয়ান সামনের দরোজাতেই দাঁড়িয়েছিল। পিয়ের যে চাতালে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে একটা দ্বিতীয় সিঁড়ি নেমে গেছে পিছনের ফটকে। সেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে সে উঠোনে চলে গেল। কেউ তাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু সেখানে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল; পিয়ের ফটকের বাইরে পা দিতেই কোচয়ান ও দারোয়ান তাকে দেখে টুপি তুলল। পিয়ের যখন বুঝতে পারল যে সে ধরা পড়ে গেছে তখন সে উটপাখির মতো ব্যবহার করে বসল : উটপাখি যেমন অন্যের নজর এড়াতে ঝোঁপের মধ্যে মাথা গুঁজে দেয়, পিয়েরও তেমনি মাথাটা নুইয়ে দ্রুত পা ফেলে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।
সেদিন যেসব কাজ পিয়েরের হাতে ছিল তার মধ্যে জোসেফ বাজদিভের বই ও কাগজপত্রের সুরাহা করাটাই তার কাছে সবচাইতে দরকারি বলে মনে হল।
একটা গাড়ি ভাড়া করে চালককে বলল প্যাট্রিয়ার্কস পন্তে যেতে; বাজদিভের বিধবা পত্নী সেখানেই থাকে।
বোঝাই গাড়িগুলো সারি বেঁধে চারদিক থেকে অনবরত মস্কো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে দৃশ্য দেখতে দেখতে আর জোড়াতালি-মারা পুরনো গাড়ি থেকে তার মোটা শরীরটা যাতে ছিটকে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রেখে পিয়ের স্কুল-পালানো ছেলের মতো খুশির মেজাজে চালকের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
