ব্যাপার কি? কি হয়েছে?
কিছু না…না…
সহজ বুদ্ধিতে একটা কিছু আঁচ করে নাতাশা বলল, আমার পক্ষে খুব খারাপ কিছু কি? সেটা কি?
সোনিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, কোনো জবাব দিল না। কাউন্ট, পেতয়া, মাদাম শোস, মাভা কুজমিনিচনা ও ভাসিলিচ বৈঠকখানায় ঢুকে দরোজাগুলো বন্ধ করে দিল। তারপর সকলে বসে পড়ে কিছুক্ষণ নীরবে কাটাল; কেউ কারো দিকে তাকাল না।
প্রথমে উঠে দাঁড়াল কাউন্ট; দেবমূর্তির সামনে শ-চিহ্ন এঁকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অন্য সকলেও তাই করল। তারপর কাউন্ট মাভ্রা কুজমিনিচনা ও ভাসিলিচকে আলিঙ্গন করল; তারা দুজন মস্কোতেই থেকে যাচ্ছে। তারা যখন তার হাত ধরে কাঁধে চুমো খেল কাউন্ট তখন আলতোভাবে তাদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে কিছু সান্ত্বনা। ও স্নেহের বাণী শোনাল। ভজনালয়ে ঢুকে কাউন্টেস দেখল দেয়ালে ঝোলানো একটি দেবমূর্তির সামনে সোনিয়া নতজানু হয়ে বসে আছে।
পেতয়া যেসব লোকদের তরবারি ও ছুরি দিয়েছিল তারা উঁচু বুটের মধ্যে ট্রাউজার খুঁজে দিয়ে, কোমরবন্ধগুলো শক্ত করে এঁটে যারা এখানেই থেকে যাচ্ছে তাদের কাছ থেকে একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছে।
কোথাও যাবার আগে যেমন হয়ে থাকে, অনেককিছুই ভুল হয়েছে বা ভুল জায়গায় রাখা হয়েছে; কাউন্টেসকে গাড়িতে তুলে দেবার জন্য দুটি চাকর গাড়ির পাদানির দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে; আর দাসীরা ছুটাছুটি করে টুকিটাকি জিনিস নিয়ে একবার গাড়ি, কালেচ ও ফিটনের দিকে ছুটে আসছে, আবার বাড়ির ভিতরে যাচ্ছে।
কাউন্টেস বলল, ওরা সবসময় সবকিছু ভুলে যাবে। তুমি কি জান না যে এভাবে আমি বসতে পারি না?
দুনিয়াশা কোনো কথা না বলে দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ মুখে গাড়ির মধ্যে ঢুকে আসনটাকে নতুন করে পাততে লাগল।
মাথা নেড়ে কাউন্ট বলল, আঃ, চাকরগুলোও হয়েছে বটে!
বুড়ো কোচয়ান এফিম বক্সে সোজা হয়ে বসে আছে; চারদিকে কি হচ্ছে না হচ্ছে একবার তাকিয়েও দেখছে না। কাউন্টেস একমাত্র তাকেই ভরসা করে নিজের গাড়িটা চালাতে দেয়। ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতায় সে জানে যে ঈশ্বরের নাম নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দাও! এ হুকুম আসতে এখনো দেরি আছে; সে জানে, হুকুম হবার পরেও আরো দু একবার গাড়ি থামাতে হবে, ভুল করে ফেলে-আসা কিছু জিনিসপত্র আনতে আবার তারা বাড়ির ভিতর ঢুকবে এবং তারপরেও আবার তাকে থামিয়ে কাউন্টেস জানালা দিয়ে মুখ বের করে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে পাহাড় থেকে নামবার সময় তাকে খুব সতর্কভাবে গাড়ি চালাতে বলবে। এসবই তার জানা; তাই ঘোড়াগুলোর চাইতেও বেশি ধৈর্যের সঙ্গে সে অপেক্ষা করতে লাগল। শেষপর্যন্ত সকলে উঠে বসল, গাড়ির সিঁড়িগুলো ভাজ করে তুলে দেওয়া হল, দরোজা বন্ধ করা হল, একজনকে পাঠানো হল একটা বক্স আনতে, আর কাউন্টেস মাথা বের করে যা বলার ছিল তাই বলল। এফিম ইচ্ছা করেই টুপিটা তুলে কুশ চিহ্ন আঁকতে লাগল। সহিস ও অন্য চাকররাও তাই করল। টুপিটা মাথায় বসিয়ে এফিম বলল, ঈশ্বরের নাম নিয়ে যাত্রা কর। শুরু কর! ঘোড়াগুলো নড়ে উঠল, গাড়ির চাকায় শব্দ হল, গাড়িটা দুলে উঠল। সহিস চলতি গাড়িতে লাফিয়ে উঠল; একটা ঝাঁকুনি খেয়ে উঠোন পেরিয়ে গাড়িটা অসমান রাস্তায় পড়ল; অন্য গাড়িগুলো দুলতে দুলতে পিছু নিল; গাড়ির একটা শোভাযাত্রা পথ ধরে এগিয়ে চলল। বাড়ির উল্টো দিকের গির্জার পাশ দিয়ে যাবার সময় গাড়ি, কালেচ ও ফিটনের সব যাত্রীরাই ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল। যারা মস্কোতেই থেকে গেল। তারা যাত্রীদের বিদায় জানাতে গাড়িগুলোর দুই পাশে হাঁটতে লাগল।
কাউন্টেসের পাশে বসে পরিত্যক্ত, বিক্ষুব্ধ মস্কোর অপসৃয়মান দেয়ালগুলির দিকে তাকিয়ে নাতাশার মনে আনন্দের যে অনুভূতি জাগল এর আগে সেরকম অনুভূতি তার জীবনে কদাচিৎ এসেছে। মাঝে মাঝে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একবার পিছনে তাকাচ্ছে, একবার সামনে সারিবদ্ধ আহতদের দিকে তাকাচ্ছে। সেই সারির একেবারে সামনে আছে প্রিন্স আন্দ্রুর দুই-তালা কালেচ-গাড়িটা। সে গাড়ির মধ্যে কে আছে তা সে জানে না, কিন্তু যতবার সারির দিকে তাকাচ্ছে ততবারই ওই কালেচটা তার চোখে পড়ছে। সে জানে যে গাড়িটা তার সামনেই আছে।
কুদ্রিনোতে অনুরূপ আরো কয়েকটি গাড়ির শোভযাত্রা এল নিকিৎস্কি, প্রেমিয়া ও পদনভিনস্ক স্ট্রিট থেকে। সদভায়া স্ট্রিট ধরে এগোবার সময় সবগুলো যাত্রী-গাড়ি ও মালগাড়ি দুটো সারি বেঁধে পাশাপাশি এগিয়ে চলল।
সুখারেভ জলের গম্বুজটা ঘুরে যাবার সময় নাতাশা হঠাৎ সানন্দ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল : আরে! মামনি, সোনিয়া, দেখ, তিনি যাচ্ছেন!
কে? কে?
দেখ! হ্যাঁ, সত্যি বলছি, ঐ তো বেজুখভ! কোচয়ানের লম্বা কোট পরিহিত একটি দীর্ঘকায় লোককে দেখিয়ে নাতাশা বলল। লোকটির চালচলন দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ছদ্মবেশে চলেছে। সঙ্গে ফ্রীজ-কোট পরা একটি ফ্যাকাসে-মুখ, দাড়িবিহীন বুড়ো লোক।
নাতাশা বলল, হ্যাঁ, ঠিক বেজুখভ; কোচয়ানের কোট গায়ে, সঙ্গে একটি অদ্ভুত-দর্শন বুড়ো। সত্যি, তাকিয়ে দেখ!
না, সে নয়। কী বাজে বকছ?
নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, মামণি, আমার মাথাটা বাজি, নির্ঘাত! সে! আমি নিশ্চিত বলতে পারি। থাম, থাম! সে কোচয়ানকে লক্ষ্য করে বলল।
কিন্তু কোচয়ান থামতে পারল না, কারণ মেশচানস্কি স্ট্রিট থেকে আরো অনেক গাড়ি এসে পড়ল, আর তারা সকলেই রস্তভদের রাস্তা আটকে না থেকে এগিয়ে যেতে বলল।
