ডিমরা…ডিমরা এখন মুরগিদের শেখাচ্ছে…কাউন্ট বিড়বিড় করে বলল; খুশিতে তার চোখে জল এসে গেছে; সে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরল। আর স্ত্রীও সলজ্জ দৃষ্টি লুকোবার জন্য তার বুকে মাথা রাখল।
বাপি! মামণি! আমি কি ওদিকটা দেখব? কি বল? নাতাশা শুধাল, এখনো দরকারি জিনিসপত্র প্রায় সবই আমরা সঙ্গে নিতে পারব।
কাউন্ট সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল, আর নাতাশা হরিণীর মতো চকিত চরণে নাচঘর ও বাইরের ঘর পেরিয়ে সোজা উঠোনে নেমে গেল।
চাকরবাকররা নাতাশাকে ঘিরে ধরল, কিন্তু তার অদ্ভুত হুকুম বিশ্বাসই করতে পারল না। শেষপর্যন্ত কাউন্ট নিজে এসে স্ত্রীর নামে ঘোষণা করে দিল যে সবগুলি গাড়ি আহতদের জন্য ছেড়ে দিতে হবে, আর ট্রাংকগুলোকে ভাড়ার ঘরে ফিরিয়ে নিতে হবে।
যেন এই কাজটি আরো আগে না করার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই বাড়ির সবগুলো মানুষই একযোগে আহতদের গাড়িতে তুলে দেবার নতুন কর্তব্যটি পালন করতে সাগ্রহে এগিয়ে গেল। আহতরা নিজেদের টানতে টানতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিবর্ণ অথচ খুশিমুখে গাড়ির চারদিকে জড় হতে লাগল। গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে এই খবর ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের বাড়ি থেকেও আহতরা বেরিয়ে এসে রস্তভদের উঠোনে জমা হতে লাগল। অনেকে বলল, মালপত্র নামাবার দরকার নেই, তারা সেগুলির উপরে বসেই যেতে পারবে। কিন্তু মাল নামাবার কাজ একবার শুরু হয়ে যাওয়ায় আর থামানো গেল না।
নায়েব বলল, আমরা আরো চারজনকে নিতে পারি। তারা আমার গাড়িতেই যাবে, নইলে তাদের দশা কি হবে?
কাউন্টেস বলল, আমার পোশাকের গাড়িটা ওদের দিয়ে দাও। দুনিয়াশা আমার সঙ্গে বড় গাড়িতেই যেতে পারবে।
পোশাকের গাড়িটাকে খালি করে দুই দরোজা পরের বাড়ির সামনে সেটাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল সেখানকার আহতদের তুলে নিতে। চাকরসমেত গোটা বাড়িটাই খুশিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। নাতাশার মন এত বেশি খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে যে তেমনটি অনেকদিন হয়নি।
একটা ট্রাংককে গাড়ির পিছনের পাদানিতে বসিয়ে দেবার চেষ্টায় চাকররা বলল, এটাকে কিসের সঙ্গে বাঁধব? অন্তত একটা গাড়ি রেখে দিতেই হবে।
এতে কি আছে? নাতাশা শুধাল।
কাউন্টের বইপত্র।
ছেড়ে দাও, ভাসিলিচ ওটা তুলে রাখবে। ওটার দরকার নেই।
ফিটনটা যাত্রীতে ভর্তি হয়ে গেছে; কাউন্ট পিতর বসবার জায়গা পাবে কিনা সন্দেহ।
নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, বক্সের উপরে। তুমি বক্সের উপর বসবে পেতয়া, পারবে না?
সোনিয়াও সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত, কিন্তু তার কাজের লক্ষ্য নাতাশার চাইতে আলাদা। যেসব জিনিস ফেলে যাওয়া হচ্ছে সেগুলি গুছিয়ে রেখে কাউন্টেসের নির্দেশমতো সে তার একটা ফর্দ তৈরি করেছে; যথাসম্ভব বেশি জিনিস সঙ্গে নিতেই সে চেষ্টা করছে।
.
অধ্যায়-১৭
বিকেল দুটোর আগেই রস্তভদের চারখানা গাড়ি পুরো ভর্তি হয়ে সামনের দরোজায় এসে দাঁড়াল। একটার পর একটা গাড়ি আহতদের নিয়ে উঠোন থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল।
যে কালেচ-গাড়িতে প্রিন্স আন্দ্রুকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেটা সামনের বারান্দার পাশ দিয়ে যাবার সময় সোনিয়ার নজর সেদিকে গেল। ফটকে দাঁড়ানো মস্ত বড় উঁচু গাড়িটাতে সোনিয়া তখন একটি দাসীকে নিয়ে কাউন্টেসের জন্য একটা আসন পাতার আয়োজন করছিল।
গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে সে জিজ্ঞাসা করল, ওটা কার কালে?
দাসী জবাব দিল, সে কি, আপনি জানেন না মিস? উনিই তো আহত প্রিন্স; আমাদের বাড়িতেই রাত কাটিয়েছেন, আর আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছেন।
কিন্তু তিনি কে? তার নাম কি?
তিনিই তো আমাদের প্রিন্স বলকনস্কি স্বয়ং। একটা নিঃশ্বাস ফেলে দাসী বলল, সকলে বলছে তিনি মারা যাবেন।
গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে সোনিয়া ছুটে কাউন্টেসের কাছে গেল। শাল ও ওড়না পরে যাত্রার জন্য তৈরি হয়ে ক্লান্ত দেহে কাউন্টেস ঘরের মধ্যেই পায়চারি করছে। যাত্রার আগে সকলে বন্ধ ঘরের মধ্যে সমবেত হয়ে নীরবে একবার প্রার্থনা করবে–এটাই রীতি। কাউন্টেস সেইজন্যই অপেক্ষা করছে। নাতাশা ঘরে নেই।
সোনিয়া বলল, মামণি, মারাত্মক আহত হয়ে প্রিন্স আন্দ্রু এখানেই আছেন। তিনি আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছেন।
কাউন্টেস হতাশ ভঙ্গিতে তাকাল; সোনিয়ার হাতটা চেপে ধরে চারদিক দেখল।
নাতাশা? সে অস্ফুট স্বরে বলল।
এইমুহূর্তে তাদের কাছে এই সংবাদের একটিই মাত্র তাৎপর্য। নাতাশাকে তারা চেনে; এ খবর তার কানে গেলে যে কি ঘটবে সেই ভয়েই এই লোকটির প্রতি তাদের দুজনের সহানুভূতিতেই ভাটা পড়ল।
সোনিয়া বলল, নাতাশা এখনো জানে না, কিন্তু তিনি আমাদের সঙ্গেই যাচ্ছেন।
তুমি বলছ সে মরতে বসেছে?
সোনিয়া মাথা নাড়ল।
সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাউন্টেস কেঁদে উঠল।
ভাবল, ঈশ্বর যে কখন কি করেন তা আমাদের বুদ্ধির অগোচর। সর্বশক্তিমানের অদৃশ্য হাত ক্রমেই যেন ঘটনাবলীর ভিতর দিয়ে প্রত্যক্ষগোচর হয়ে উঠছে।
উত্তেজিত মুখে ঘরে ঢুকে নাতাশা শুধাল, আচ্ছা মামণি, সবই তো প্রস্তুত। ব্যাপার কি?
কাউন্টেস বলল, কিছু না তো। সব প্রস্তুত হয়ে থাকলে এবার আমরা যাত্রা করি।
নিজের মুখের উত্তেজনা লুকোবার জন্য কাউন্টেস ওড়না দিয়ে মুখটা ঢেকে দিল। সোনিয়া নাতাশাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল।
নাতাশা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
