সেই দিনগুলিতে শোনা যেসব কাহিনী তার মনে ছিল বের্গ সে সবগুলিই একে একে বলে গেল। নাতাশা একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সে একটু বিচলিত বোধ করল।
একটু হেসে বলতে লাগল, সবকিছু মিলিয়ে রুশ যযাদ্ধারা যে বীরত্ব দেখিয়েছে তা যেমন কল্পনাতীত, তেমনই বর্ণনাতীত! রাশিয়া আজ মস্কোতে নেই, তার আসন পাতা রয়েছে তার বীর পুত্রদের অন্তরে! তাই নয় কি বাপি?
ঠিক সেইসময় কাউন্টেস ঘরে ঢুকল; তার চোখে-মুখে ক্লান্তি ও বিরক্তির ছাপ। বের্গ লাফিয়ে উঠে কাউন্টেসের হাতে চুমো খেল, তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিল, মাথা নেড়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।
সত্যি বলছি মামণি, রাশিয়ার প্রতিটি মানুষের পক্ষে আজ বড়ই দুর্দিন, বড়ই কষ্টের দিন। কিন্তু আপনি এত উৎকণ্ঠিত হচ্ছেন কেন? এখান থেকে যাবার মতো অনেক সময় হাতে পাবেন…
স্বামীর দিকে ঘুরে কাউন্টেস বলল, চাকরবাকরগুলো যে কি করছে বুঝি না। এইমাত্র বলল, এখনো কিছু তৈরি হয়নি। দেখাশুনা করবার মতো একজন লোক তো চাই। এ সময় মিতেংকা থাকলে কত ভালো হত। কাজ যেন আর শেষ হতে চাইছে না।
কাউন্ট কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল। চেয়ার ছেড়ে দরোজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক সেইমুহূর্তে সম্ভবত নাকটা ঝাড়বার জন্যই বের্গ রুমালটা বের করল। গিটটা চোখে পড়তেই অর্থপূর্ণভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে কি যেন ভাবল।
বলল, আপনার কাছে একটা অনুগ্রহ ভিক্ষা করছি বাপি।
হুম… বলে কাউন্ট থেমে গেল।
বের্গ হেসে বলল, এইমাত্র ইউসুপভ-এর বাড়ির পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসছিলাম, এমন সময় আমার পরিচিত একটি নায়েব ছুটে এসে জানতে চাইল, আমি কিছু জিনিস কিনব কি না। কৌতূহলবশত ভিতরে ঢুকে দেখলাম একটা ছোট সুন্দর কাবার্ড ও একটা ড্রেসিং-টেবিল। আপনি তো জানেন ভেরার ওরকম একটা কাবার্ডের খুব শখ, আর এই নিয়ে আমরা কত ঝগড়া পর্যন্ত করেছি। আর জিনিসটা কী সুন্দর। একটা চোরা ইংলিশ টানা পর্যন্ত আছে! ভেরা অনেক দিন থেকে এরকম একটা জিনিস চাইছে। কি জানেন, আমি ওকে বেশ অবাক করে দিতে চাই। আপনার উঠোনে তো অনেক গাড়ি দেখলাম। ওর একটা আমাকে দিন, লোকটিকে ভালো টাকাই দেব, আর…
কাউন্ট ভুরু কুঁচকে কাশল।
কাউন্টেসকে বল, আমি কোনো হুকুম দেই না।
বের্গ বলল, অসুবিধা হলে থাক; শুধু ভেরার জন্যই জিনিসটা নিতে চেয়েছিলাম।
আঃ, উচ্ছন্নে যাও, তোমরা সবাই উচ্ছন্নে যাও!… বুড়ো কাউন্ট চেঁচিয়ে উঠল। আমার মাথার ভিতরটা ঘুরছে।
কাউন্ট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কাউন্টেস কাঁদতে শুরু করল।
সত্যি মামণি! বড়ই দুর্দিন। বের্গ বলল।
বাবার সঙ্গে সঙ্গে নাতাশাও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল; তারপর কি করবে বুঝতে না পেরে প্রথমে তাকে অনুসরণ করে পরে ছুটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।
পেতয়া ছিল বারান্দায়; যেসব চাকর মস্কো ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে দিচ্ছে। বোঝাই গাড়িগুলো তখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। একটার দড়িগুলো খুলে ফেলা হয়েছে, আর আর্দালির সহায়তায় একজন অফিসার সেই গাড়িটা বেয়ে উঠছে।
পেতয়া নাতাশাকে শুধাল, ব্যাপার কি বল তো?
নাতাশা বুঝল, বাবা-মা কি নিয়ে ঝগড়া করছে সেটাই সে জানতে চাইছে। কোনো কথা বলল না।
পেতয়াই বলল, বাপি সবগুলো গাড়িই আহতদের জন্য দিতে চাইছে। আর তাই নিয়েই ঝগড়া। ভাসিলিচ আমাকে বলেছে। আমি মনে করি…।
নাতাশা হঠাৎ রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, আমি মনে করি এটা এত ভয়ংকর, এত ঘৃণ্য, এত…কি বলব জানি না। আমরা কি জঘন্য জার্মান?
চাপা কান্নার আবেগে তার গলা আটকে গেল; পাছে রাগটা ধরা পড়ে যায় তাই সে মুখ ঘুরিয়ে ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।
কাউন্টেসের পাশে বসে বের্গ তাকে পরমাত্মীয়ের মতো সান্ত্বনা দিচ্ছে। কাউন্ট পাইপ হাতে নিয়ে ঘরময় পায়চারি করছে। এমন সময় ক্রোধে মুখটা বিকৃত করে নাতাশা ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে দ্রুতপায়ে মার দিকে এগিয়ে গেল।
আর্তকণ্ঠে বলল, এ তো ভয়ংকর! এ তো ঘৃণ্য! এরকম হুকুম তুমি দিতে পার না।
ভীত, বিব্রত চোখে বের্গ ও কাউন্টেস তার দিকে তাকাল। জানালায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে কাউন্ট কান পাতল।
নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, মামণি, এ অসম্ভব; উঠোনে কী হচ্ছে নিজে গিয়ে দেখে এস! তাদের ফেলে রেখে যাওয়া হবে!…
তোমার হল কি? কাদের কথা বলছ? কী চাও তুমি?
কেন, আহত লোকগুলো! এ তো অসম্ভব মামণি! এ তো দানবীয় কাজ।…না, লক্ষ্মী মামণি, এ হতে পারে না। আমাকে ক্ষমা কর লক্ষ্মী মামণি…কিছু বাড়তি জিনিস সঙ্গে গেল কিনা তাতে কি যায় আসে?…একবার শুধু দেখে এস উঠোনে কি হচ্ছে…মামণি!…এ অসম্ভব!…
মুখ না ফিরিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়েই কাউন্ট সব শুনছে। হঠাৎ নাক ঝেড়ে সে মুখটা জানালার আরো কাছে সরিয়ে নিল। কাউন্টেস মেয়ের দিকে তাকাল, মুখটা মায়ের জন্য লজ্জায় আনত, ক্রোধে উচ্ছ্বসিত; স্বামী কেন যে মুখ না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাও বুঝতে পারল; বিব্রত চোখে চারদিকে তাকাল।
কিন্তু হাল না ছেড়েই বলল, আঃ তোমাদের যা খুশি কর! আমি কি কাউকে বাধা দিচ্ছি?
মামণি, লক্ষ্মীটি, আমাকে ক্ষমা কর।
কিন্তু কাউন্টেস মেয়েকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে স্বামীর দিকে এগিয়ে গেল।
ওগো, যা ভালো মনে কর তাই বলে দাও…তুমি তো জান এসব আমি ঠিক বুঝি না, চোখ নিচু করে কাউন্টেস বলল।
