তার দিকে না তাকিয়ে হোট টেবিলটাকে একটু সরিয়ে দিয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলতে লাগল, তারপর আমার নিজের পরিবারের কথাও অবশ্যই ভাবতে হবে। তুমি তো জান কাতিচে, আমরা-তোমরা তিন বোন, মামন্তভ ও আমার স্ত্রী-আমরাই কাউন্টের একমাত্র প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী। আমি জানি, এ সব বিষয় নিয়ে এখন কথা বলা বা চিন্তা করা যে তোমার পক্ষে কত কঠিন তা আমি জানি। আমার পক্ষেও কাজটা সহজ নয়; কিন্তু বোন, আমার বয়স তো ষাট হতে চলল, আমাকে তো সবকিছুর জন্যই তৈরি থাকতে হবে। তুমি কি জান, আমি পিয়েরকেও ডেকে পাঠিয়েছি? কাউন্ট, তার ছবিটার দিকে তাকিয়ে, নিশ্চয় চাইবেন যে তাকেও ডাকা হোক।
প্রিন্স ভাসিলি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রিন্সেসের দিকে তাকাল, কিন্তু সে তার কথাগুলি চিন্তা করছে না শুধুই তাকিয়ে আছে তা বুঝতে পারল না।– প্রিন্সেস জবাব দিল, দেখ দাদা, ঈশ্বরের কাছে আমি শুধু একটি প্রার্থনাই করছি, তিনি যেন ওঁকে করুণা করেন, ওঁর মহান আত্মা যেন শান্তিতে এই পৃথিবী ছেড়ে…
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই, ধৈর্য হারিয়ে তার কথায় বাধা দিয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলে উঠল; টাক মাথাটা ঘষতে ঘষতে যে ছোট টেবিলটাকে সরিয়ে দিয়েছিল, বেশ রাগের সঙ্গে সেটাকেই আবার কাছে টেনে আনল। কিন্তু…অল্প কথায় ব্যাপারটা এই…তুমি নিজেও জান যে গত শীতের সময় কাউন্ট একটা উইল করে তার সম্পত্তির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার আমাদের না দিয়ে, দিয়ে গেছেন পিয়েরকে!
প্রিন্সেস শান্তভাবে জবাব দিল, উইল তিনি অনেক করেছেন। কিন্তু পিয়েরকে তিনি সম্পত্তি দিতে পারেন না। পিয়ের তার অবৈধ সন্তান।
ছোট টেবিলটাকে আঁকড়ে ধরে আরো উত্তেজিতভাবে প্রিন্স ভাসিলি হঠাৎ দ্রুতলয়ে বলতে লাগল, কিন্তু বোনটি, ম্রাটের কাছে যদি এমন একটা চিঠি লেখা হয়ে থাকে যাকে কাউন্ট পিয়েরকে বৈধ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছেন? কাউন্টের রাজসেবার কথা বিবেচনা করে সে অনুরোধ যে মঞ্জুর হতে পারে তা কি বুঝতে পারছ?..।
প্রিন্সেস এমনভাবে হাসল যেন সে সবই জানে, এমন কি বক্তার চাইতে বেশিই জানে।
তার হাতটা ধরে প্রিন্স ভাসিলি বলতে লাগল, তোমাকে আরো বলতে পারি; চিঠিটা লেখা হয়েছিল কিন্তু পাঠানো হয় নি, কিন্তু সম্রাট সেটা জানেন। একমাত্র কথা হল, সেটা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, অথবা হয় নি? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে যে মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যাবে এবং কাউন্টের কাগজপত্র ভোলা হবে তখনই উইল এবং চিঠিটা সম্রাটকে পাঠানো হবে, আর আবেদন অবশ্যই মঞ্জুর হবে। বৈধ সন্তান হিসেবে সবকিছু পাবে পিয়ের।
আর আমাদের অংশ? ব্যঙ্গের হাসি হেসে প্রিন্সেস এমনভাবে প্রশ্নটা করল যেন সেটা ছাড়াও আরো অনেক কিছু ঘটতে পারে।
হায় কাতিচে, এটা যে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার! সেই হবে সবকিছুর আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী, আর তোমরা কিছুই পাবে না। তোমাকে তাই জানতেই হবে, উইল ও চিঠি লেখা হয়েছিল কি না, এবং সেগুলি নষ্ট করে ফেলা হয়েছে কি না। আর সেগুলোর কথা যদি কারো মনে না থেকে থাকে, তাহলে তোমাকে জানতে হবে সেগুলো কোথায় আছে, সেগুলোকে খুঁজে বার করতে হবে, কারণ…
তারপর? ব্যঙ্গের হাসির সঙ্গে প্রিন্সেস তার কথায় বাধা দিল; কিন্তু তার চোখের ভাব একটুও বদলাল না। আমি স্ত্রীলোক, আর তুমি মনে কর আমরা সব মূর্খ; কিন্তু আমি এইটুকু জানিঃ অবৈধ সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে না।…জারজ! শেষের কথাটা যোগ করে সে যেন বোঝাতে চাইল যে এই অনূদিত শব্দটা প্রিন্স ভাসিলির বক্তব্যের অসারতাকে ভালোভাবেই প্রমাণ করে দেবে।
সত্যি নাকি কাতিচে! তুমি বুঝতেই পারছ! তোমার এত বুদ্ধি, অথচ এটা কেন বুঝতে পারছ না যে পিয়েরকে বৈধ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতির অনুরোধ জানিয়ে কাউন্ট যদি সম্রাটকে চিঠি লিখে থাকেন, তাহলে পিয়ের আর পিয়ের থাকবে না, সে হবে কাউন্ট বেজুখভ, আর উইল অনুসারে সেই তখন হবে সবকিছুর উত্তরাধিকারী। আর সেই উইল আর চিঠি যদি নষ্ট করে ফেলা না হয় তাহলে কর্তব্যপরায়ণা হবার সান্ত্বনা ও তার ফলাফল ছাড়া তোমাদের আর কিছুই থাকবে না! এটা একেবারে নিশ্চিত।
আমি জানি উইল করা হয়েছিল, কিন্তু আরো জানি যে সে উইল অসিদ্ধ; আর তুমি দাদা হয়েও আমাকে একটা বুদ্ধ বলে ভাব। প্রিন্সেস বেশ জোর দিয়ে বলল।
অধৈর্য হয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলতে শুরু করল, প্রিয় প্রিন্সেস ক্যাথারিন সেমেনভনা, আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসি নি, একজন আত্মীয়া, সত্যিকারের ভালো আত্মীয়ার সঙ্গে তার স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে এসেছি। আর এই দশমবারের মতো তোমাকে বলছি, সম্রাটের কাছে লেখা চিঠি আর পিয়েরের অনুকূলে তৈরি সেই উইল যদি কাউন্টের কাগজপত্রের মধ্যে পাওয়া যায়, তাহলে তুমি ও তোমার বোনরা কেউই উত্তরাধিকারিণী নও। যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর, একজন বিশেষজ্ঞের কথায় বিশ্বাস কর। এইমাত্র আমি দিমিত্রি অনুফ্রি (পারিবারিক সলিসিটরের) সঙ্গে কথা বলে এসেছি; তিনিও ঐ একই কথা বলেছেন।
এই কথা শুনে প্রিন্সেসের মনের ভাব হঠাৎ বদলে গেল; পাতলা ঠোঁট দুটি সাদা হয়ে গেল, আর চোখের কোনো পরিবর্তন না হলেও কথা বলতে গিয়ে তার গলার স্বর এমন বদলে যেতে লাগল যে সে নিজেও তা আশা করে নি।
