কাউন্ট একবার চারদিকে তাকাল। উঠোনে, ফটকে, বাড়ির বাইরের অংশের জানালায় আহত অফিসার ও তাদের আর্দালিদের ভিড়। সকলেই কাউন্টের দিকে তাকিয়ে আছে, বারান্দার দিকে এগিয়ে আসছে।
বড় নায়েব বলল, গ্যালারিতে চলে আসুন ইয়োর এক্সেলেন্সি। এবার বলুন, ছবিগুলোর কি করা হবে?
আহতদের মধ্যে যারা গাড়িতে যেতে চায় তাদের যেন ফিরিয়ে দেওয়া না হয় এই কথা বলতে বলতেই কাউন্ট বড় নায়েবের সঙ্গে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।
পাছে তার কথা কেউ শুনে ফেলে এই ভয়ে কাউন্ট গলা নামিয়ে বলল, আরে, কোনো অসুবিধা নেই, কিছু জিনিস নামিয়ে নিলেই হবে।
নটার সময় কাউন্টেসের ঘুম ভাঙল; তার পুরনো সহচরী মাত্রিনা তিমোফীভনা এসে জানাল, মাদাম শোস খুব রেগে গেছে, কারণ তার ট্রাংকটা গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর কাউন্টের হুকুমমতো আহত সৈন্যদের জায়গা করে দিতে গাড়িতে বোঝাই করা অনেক মালপত্র নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। কাউন্টেস স্বামীকে ডেকে পাঠাল।
এসব কি শুনছি গো? শুনলাম গাড়ি থেকে সব মাল নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
কি জান সোনা, তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম…প্রিয় কাউন্টেস…একজন অফিসার এসে আহতদের জন্য কয়েকটা গাড়ি চাইলেন। যাই বল, আমাদের যা জিনিসপত্র তা তো আবার কিনে নেওয়া যাবে, কিন্তু আহতদের ফেলে গেলে তাদের কি দশা হবে সেটা ভেবে দেখ!…সত্যি তো, আমাদেরই উঠোনে-আর আমরাই তাদের ডেকে এনেছি, তাদের মধ্যে অফিসাররাও আছেন…বুঝতেই তো পারছ গো…তাই আমি মনে করি যে তাদের তুলে নেওয়া হোক…তাড়াতাড়ির কি আছে?
টাকাপয়সার ব্যাপারে কাউন্ট সবসময়ই ভয়ে ভয়ে কথা বলে থাকে। ওদিকে কাউন্টেসও সব সময়ই এ ধরনের ভীরু-ভীরু কথার প্রতিবাদ করে থাকে; এটাকে সে তার কর্তব্য বলেই মনে করে।
কাউন্টেস বলল : শোন কাউন্ট, তুমি এমন বন্দোবস্তই করেছ যে বাড়িটার জন্য আমরা কিছুই পাচ্ছি না, আর এখন তুমি কি না আমাদের-তোমার ছেলেমেয়েদের সব সম্পত্তি ফেলে দিতে চাইছ! তুমি তো নিজেই বলেছ যে আমাদের বাড়িতে যা জিনিসপত্র আছে তার দাম এক লাখ রুবল। এতে আমার মত নেই, মোটেই মত নেই! তোমার যা খুশি কর! আহতদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব সরকারের; সেটা তারাও জানে। লোপুখিনদের বাড়ির দিকে চেয়ে দেখ, দুদিন আগেই সে বাড়ি থেকে সবাইকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। অন্য সকলে তাই তো করে। আর আমরাই বোকার মতো কাজ করি। আমাকে তুমি দয়া দেখাতে না পার, কিন্তু ছেলেমেয়েদের প্রতি কিছুটা সদয় হও।
হতাশভাবে দুই হাত ঘুরিয়ে কাউন্ট কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তার পিছন পিছন এসে নাতাশা বলল, তুমি এসব কি করছ বাপি?
কিছু না! তা দিয়ে তোমার কি দরকার? কাউন্ট রেগে বলল।
নাতাশা বলল, কিন্তু আমি শুনেছি। মামণি আপত্তি করছে কেন?
তা দিয়ে তোমার কি দরকার? কাউন্ট চেঁচিয়ে উঠল।
নাতাশা জানালা পর্যন্ত এগিয়ে এসে ভাবতে লাগল।
বাপি! বের্গ আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসছে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে বলল।
১১.২ রস্তভদের জামাই বের্গ
অধ্যায়-১৬
রস্তভদের জামাই বের্গ এর মধ্যেই কর্নেল হয়েছে; ভলাদিমির ও আন্না সম্মান-পদক ঝুলিয়েছে; এখনো দ্বিতীয় বাহিনীর প্রথম ডিভিশনের সহকারী কমান্ডারের প্রধান কর্মচারীর সহকারীর নির্ঝঞ্ঝাট ও সুখের চাকরিতেই কাজ করে চলেছে।
১লা সেপ্টেম্বর সে সেনাদল থেকে মস্কো এসেছে।
মস্কোতে তার কোনো কাজ ছিল না; কিন্তু যখন দেখল যে সকলেই ছুটি নিয়ে কোনো না কোনো কাজে মস্কো যাচ্ছে, তখন সেও পারিবারিক ও গৃহস্থালির কারণে ছুটি চাওয়াটা দরকার বোধ করল।
কোনো রাজপুত্রের মতো সুদৃশ্য দুটো ঘোড়ায় টানা নিজের ফিটফাট ছোট গাড়িটা হাঁকিয়ে বের্গ শ্বশুরবাড়ি এসে হাজির হল। উঠোনের গাড়িগুলোকে ভালো করে দেখতে দেখতে বারান্দায় পৌঁছে একখানা পরিস্কার রুমাল পকেট থেকে বের করে তাতে একটা গিট দিল।
বাইরের ঘর থেকে অধৈর্য হয়ে পা ফেলে বৈঠকখানায় ঢুকে সে কাউন্টকে আলিঙ্গন করল, নাতাশা ও সোনিয়ার হাতে চুমো খেল এবং তাড়াতাড়ি মামণির স্বাস্থ্যের কথা জিজ্ঞাসা করল।
কাউন্ট বলল, যা দিনকাল পড়েছে তার মধ্যে আবার স্বাস্থ্য? এবার তোমার খবর বল। সেনাদল কি পশ্চাদপসরণ করবে, না কি আর একটা যুদ্ধ হবে?
বের্গ বলল, আমাদের পিতৃভূমির কপালে যে কি আছে তা একমাত্র সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই জানেন বাপি। সেনাদল তো বীরত্বে টগবগ করছে, আর নেতারা সমর-পরিষদের বৈঠকে বসেছেন। কি যে হবে তা কেউ জানে না। কিন্তু মোটামুটিভাবে আপনাকে বলতে পারি বাপি, রুশ বাহিনী যে বীরত্বের মনোভাব, যে প্রাচীনকালের শৌর্যবীর্যের স্বাক্ষর রেখেছে ২৬ তারিখের যুদ্ধে কোনো ভাষায় তার বর্ণনা করা যায় না। আপনাকে বলছি বাপি (একজন জেনারেলের নকল করে বের্গ নিজের বুকে করাঘাত করল, যদিও সেটা করা উচিত ছিল রুশ বাহিনী কথাটা বলার সময়), খোলাখুলিই বলছি যে আমরা সেনাপতিরা প্রায় কিছুই করিনি, বরং তাদের প্রাচীনকালের শৌর্য প্রদর্শনের বেলায় বাধা দিতে পর্যন্ত পারিনি। আপনাকে নিশ্চয় করে বলতে পারি, সেনাদলের সম্মুখে থেকে জেনারেল বার্কলে দ্য তলি সর্বত্রই নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছেন। আমাদের সেনাদলের ঘাটি ছিল একটা পাহাড়ের পাশে। ভাবতে পারেন!
