সোনিয়া ও নাতাশা পোশাক না ছেড়ে বসার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
সেই রাতেই পোভাস্কায়ার পথ ধরে আরো একটি আহত লোককে নিয়ে আসা হল। মাভ্রা কুজমিনিচনা ফটকেই দাঁড়িয়েছিল; সেই তাকে রস্তভদের বাড়ির উঠোনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করল। মাভ্রা কুজমিনিচনার মনে হল সে একটি জাদরেল লোক। একটা ভালো ঢাকা গাড়িতে করে তাকে আনা হয়েছে; তার শরীরটা আগাগোড়া এপ্রন দিয়ে ঢাকা। চালকের বক্সের পাশে বসেছিল একটি সম্ভ্রান্ত বৃদ্ধ পরিচারক। গাড়ির পিছন পিছন এল একজন ডাক্তার ও দুটি সৈনিক।
বুড়ি গৃহকত্রী বুড়ো পরিচারকটিকে বলল, দয়া করে এখানে আসুন। মনিবরা চলে যাচ্ছেন, কাজেই পুরো বাড়িটাই খালি হয়ে যাবে।
বুড়ো লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বেশ তো তাই হোক। ওকে যে জীবিত অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে যেতে পারব সে আশা আর করি না! মস্কোতে আমাদের নিজেদের একটা বাড়ি আছে, কিন্তু সেটা তো এখান থেকে অনেক দূরে, আর সে বাড়িতে এখন কেউই নেই।
মাভ্রা কুজমিনিচনা বলল, দয়া করে ভিতরে আসুন, আমার মনিবের বাড়িতে সবকিছুই পাবেন।…উনি কি খুবই অসুস্থ?
পরিচারকটি হতাশার ভঙ্গি করল।
ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব বলে আর আশা নেই! ডাক্তার ডাকতে হবে!
বুড়ো বক্স থেকে নেমে পিছনের গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।
ডাক্তার বলল, ঠিক আছে।
বুড়ো আবার তাদের গাড়িতে ফিরে এল; ভিতরে তাকিয়ে হতাশভাবে ঘাড় নাড়ল, কোচয়ানকে উঠোনে ঢুকতে বলে মাভ্রা কুজমিনিচনার পাশে দাঁড়াল।
বুড়ি বলল, হা প্রভু যিশুখৃস্ট।
আহত লোকটিকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যেতে বলল। মনিবরা কোনোরকম আপত্তি করবেন না…
আহত লোকটিতে দোতলায় তোলা যাবে না। কাজেই নিচের যে ঘটা মাদার শোসকে দেওয়া হয়েছে সেখানেই তাকে তোলা হল।
আহত লোকটি প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কি।
.
অধ্যায়-১৫
মস্কোর শেষের দিনটি এসে পড়ল। হেমন্তের একটি উজ্জ্বল রবিবার। প্রতি রবিবারের মতোই সর্বত্র গির্জায় ঘণ্টা বাজল। শহরের কপালে কি যে আসছে তা এখনো কেউ বুঝতে পারছে না।
শুধু দুটো জিনিস থেকে মস্কোর সামাজিক অবস্থাটার হদিস পাওয়া যাচ্ছে-দরিদ্র জনসাধারণ আর জিনিসপত্রের দাম। কারখানার শ্রমিক, গৃহ-ভৃত্য ও চাষীদের একটা মস্ত বড় দল-কিছু অফিসার, ধর্মীয় মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র ও ভদ্রলোকও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে-খুব সকালেই তিনপাহাড়ে চলে গেছে। সেখানে তারা রস্তপচিনের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল, কিন্তু সে এল না; তখন তাদের দৃঢ় ধারণা হল যে মস্কো পরিত্যাগ করা হবে, আর তারাও শহরের নানা মদের দোকানে ও খাবার দোকানে ছড়িয়ে পড়ল। সেদিনকার দ্রব্যমূল্য থেকেও অবস্থাটা বোঝা গেল। অস্ত্রশস্ত্র, সোনা ও গাড়ি-ঘোড়ার দাম বাড়ছে, আর নোটের মূল্যমান ও নাগরিক প্রয়োজনের জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত কমছে; ফলে দুপুর নাগাদ দেখা গেল, কাপড় ইত্যাদি মূল্যবান জিনিস গাড়িভর্তি করে নিয়ে গিয়ে তার বিনিময়ে দাম পেল গাড়িভাড়ার অর্ধেক; ওদিকে চাষীদের ঘোড়া প্রতি ভাড়া উঠল পাঁচশ রুবল, আর আসবাবপত্র, আয়না ও ব্রোঞ্জের জিনিস বিনামূল্যে বিলিয়ে দেওয়া হতে লাগল।
রস্তভদের সেকেলে বাড়িতে কিন্তু সাবেকি জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। শুধু দেখা গেল, ভূমিদাসদের মস্তবড় দলের মধ্যে তিনজন রাতারাতি উধাও হয়ে গেল, কিন্তু কোনো কিছু চুরি হয়নি; আর জমিদারি থেকে যে ত্ৰিশখানা চাষীদের গাড়ি এসেছিল সেগুলোর দাম অত্যন্ত বেড়ে গেল।
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ আস্তে পা ফেলে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সবে ভোরের দিকে কাউন্টেস একটু ঘুমিয়েছে, পাছে তার ঘুম ভেঙে যায় তাই এই সতর্কতা। লিলাক-রঙের ড্রেসিং-গাউন পরে কাউন্ট বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মালবোঝাই গাড়িগুলো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রী গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে সামনের ফটকে। বড় নায়েব বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটি বুড়ো আর্দালি ও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা একজন তরুণ অফিসারের সঙ্গে কথা বলছে। কাউন্টকে দেখতে পেয়ে বড় নায়েব অর্থপূর্ণ কঠোর অঙ্গভঙ্গি করে তাদের দুজনকেই চলে যেতে বলল।
আরে ভাসিলিচ, সব প্রস্তুত তো? কাউন্ট শুধাল; তারপর টাক মাথায় টোকা দিতে দিতে খুশিমনে অফিসার ও আর্দালিটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। (কাউন্ট নতুন নতুন মুখ দেখতে ভালোবাসে।)
এক্ষুনি ঘোড়া যুততে পারি ইয়োর এক্সেলেন্সি।
আচ্ছা, ঠিক আছে। ঈশ্বরের ইচ্ছায় কাউন্টেসের ঘুম ভাঙলেই আমরা যাত্রা করব। অফিসারটির দিকে ফিরে বলল, কি ব্যাপার মশায়? আপনারা কি আমার বাড়িতেই আছেন না কি?
অফিসারটি আরো কাছে এগিয়ে গেল; হঠাৎ তার মুখটা লাল হয়ে উঠল।
কাউন্ট, আপনি যদি দয়া করে…ঈশ্বরের দোহাই, আপনার গাড়ির এককোণে আমাকে একটু জায়গা দেন। আমার সঙ্গে জিনিসপত্র কিছু নেই…একটা বোঝাই গাড়িতে যেতে পারলে আমি সুস্থ থাকতে পারব…
অফিসারের কথা শেষ হবার আগেই তার আর্দালিও মনিবের হয়ে ওই একই অনুরোধ জানাল।
কাউন্ট তাড়াতাড়ি বলে উঠল, নিশ্চয়, নিশ্চয়! আমি খুশি হব, খুব খুশি হব! ভাসিলিচ, একটা ব্যবস্থা কর তো। দু একটা গাড়ির মাল নামিয়ে ফেল। আরে, তাতে আর কি হল…যা কিছু দরকার করে ফেল।
