বড় নায়েব ও চাকরবাকরদেরও কাউন্ট সেই একই হুকুম দিল।
ডিনারের সময় বাড়িতে ফিরে পেতয়া বাইরে যেসব খবর শুনে এসেছে তাই বলল। ক্রেমলিন-এ সকলকে অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হচ্ছে; যদিও রস্তপচিনের ইস্তাহারে বলা হয়েছে যে দু তিনদিন আগেই সকলকে ডাক দেওয়া হবে তবু ইতিমধ্যেই হুকুম জারি হয়ে গেছে যে সকলকেই সশস্ত্র হয়ে আগামীকাল তিনপাহাড়ে সমবেত হতে হবে; সেখানে একটা বড় রকমের যুদ্ধ হবে।
ছেলের আগ্রহে উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে কাউন্টেসের বুক কেঁপে উঠল। সে বুঝল, এখন যদি ছেলেকে যুদ্ধে না যাওয়ার কথা বলা হয় তাহলে সে সৈনিক, মর্যাদা, পিতৃভূমি প্রভৃতি এমন সব অর্থহীন, পুরুষসুলভ, একগুয়ে কথা বলতে শুরু করবে যার প্রতিবাদ করা যায় না; কাজেই তার আগেই যাত্রার আয়োজন শেষ করে পেতয়াকে তাদের দেখাশুনা করার দায়িত্ব দিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাবার আশায় কাউন্টেস তার কথার কোনো জবাব দিল না; ডিনারের পরেই কাউন্টকে একপাশে ডেকে নিয়ে চোখের জল ফেলে তাকে মিনতি করল, অতিদ্রুত, সম্ভব হলে সেই রাতেই যেন তাদের সকলকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে না পারলে আতঙ্কেই সে মারা যাবে। এখন যে সে সবকিছুতেই ভয় পাচ্ছে সেকথা লুকোবার কোনো চেষ্টাই করল না।
.
অধ্যায়-১৪
মাদাম শোস তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে বাইরে গিয়েছিল। মিয়াসনিৎস্কি স্ট্রিটে একটা মদের দোকানে সে যা দেখে এসেছে সে বিবরণ শুনে কাউন্টেসের ভয় আরো বেড়ে গেল। সেই রাস্তা দিয়ে ফিরবার সময় দোকানের সামনে মাতালদের হৈ-হুঁল্লোড়ের জন্য সে পথ দিয়ে হাঁটতে পারেনি। একটা গাড়ি নিয়ে গলির পথ ধরে বাড়ি ফিরেছে। গাড়ির চালক তাকে বলেছে, সরকারি হুকুম পেয়ে লোকজনরা মদের দোকানের পিপে ভেঙে মদ গিলছে।
ডিনারের পরে রস্ত পরিবারের সকলেই মহা উৎসাহে জিনিসপত্র বাধা-ঘঁদার কাজে লেগে পড়ল। বুড়ো কাউন্টও হঠাৎ কাজে লেগে গেল। সে একবার উঠোন থেকে ঘরে ঢুকছে, আবার ঘর থেকে উঠোনে নামছে, আর সারাক্ষণ এলোমেলো হুকুম চালাচ্ছে আর দাপাদাপি করছে। পেতয়া উঠোনের কাজের তদারকি করছে। কাউন্টের এলোমেলো হুকুমদারির ফলে সোনিয়ার মাথাই গুলিয়ে গেছে, সে যে কি করবে তাই বুঝতে পারছে না। চাকরবাকররা ঘরে ও উঠোনে ছুটোছুটি করছে আর তর্কাতর্কি করছে। নাতাশা সব দেখেশুনে কাজে হাত লাগাল।
কাউন্ট অনেক মূল্যবান বুটিদার ফরাসি পর্দা ও পারসিক কার্পেট দিয়ে ঘর সাজিয়েছিল। নাতাশা কাজে নেমেই দেখল নাচঘরে দুটো বাক্স খোলা পড়ে আছে, একটা বাসনপত্রে প্রায় ভর্তি, আর একটাতে বোঝাই করা হয়েছে কার্পেট। এখন টেবিলের উপর অনেক জিনিস পড়ে আছে এবং ভাড়ার ঘর থেকে আরো জিনিস আনা হচ্ছে। ফলে চাকরদের আরো একটা বাক্স আনতে পাঠানো হয়েছে।
নাতাশা বলল, সোনিয়া, একটু সবুর কর-এই দুটো বাক্সেই সব ভরা যাবে।
পারবেন না মিস, আমরা চেষ্টা করে দেখছি, খানসামার সহকারীটি বলল।
না, এক মিনিট সবুর কর।
নাতাশা দ্রুত হাতে কাগজে মোড়া ডিস-প্লেটগুলো বাক্সের ভিতর থেকে বের করতে লাগল।
বলল, ডিসগুলো কার্পেটের সঙ্গে এখানে যাবে।
সে কি! শুধু কার্পেটগুলোকে তিনটে বাক্সে ধরাতে পারাই তো মহাভাগ্যের কথা, খানসামার সহকারীটি বলল।
আঃ, দয়া করে থাম! নাতাশা দ্রুত হাতে অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে জিনিসগুলো সাজাতে শুরু করল। এগুলোর কোনো দরকার নেই, কিছু কিয়েভের থালা সে একপাশে সরিয়ে রাখল। এগুলো-হ্যাঁ, এগুলো কার্পেটের মধ্যেই যাবে, চীনেমাটির স্যাক্সনি ডিসগুলি দেখিয়ে বলল।
সোনিয়া তিরস্কারের সুরে বলল, ছাড় তো নাতাশা! আমরাই সব প্যাক করছি!
কিন্তু নাতাশা তার কথা শুনল না। সবকিছু বের করে নতুন করে প্যাক করতে বসল; স্থির করল, কমদামি রুশ কার্পেট ও অপ্রয়োজনীয় চীনেমাটির বাসনগুলি মোটেই নেবে না। বাক্স থেকে সব জিনিস বের করে তারা যখন নতুন করে প্যাক করতে শুরু করল তখন সস্তা দামের জিনিসপত্রগুলো প্রায় সব বাদ দিয়ে দেখা গেল যে মূল্যবান জিনিসগুলো প্রায় সবই দুটো বাক্সেই ধরে গেল। শুধু কার্পেটের বাক্সের ডালাটা কিছুতেই পড়ছে না। আরো কিছু জিনিস হয়তো বাদ দেওয়া যেত, কিন্তু নাতাশা নিজের ইচ্ছামতোই কাজ করতে লাগল। জিনিসগুলো নতুন করে সাজিয়ে বসিয়ে পেতয়া ও খানসামার সহকারীকে বলল ডালাটাকে চেপে ধরতে। নিজেও সাধ্যমতো চাপ দিতে লাগল।
সোনিয়া বলল, যথেষ্ট হয়েছে নাতাশা। দেখছি তোমার কথাই ঠিক, কিন্তু উপর থেকে আর একটা জিনিস বের করে নিলেই তো হয়।
না, কিছুই বের করব না! নাতাশা চেঁচিয়ে বলল। এক হাতে ঘর্মাক্ত মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে অন্যহাতে কার্পেটগুলোকে চেপে ধরে বলল, এবার চাপ দাও পেতয়া! চাপ দাও ভাসিলিচ, জোরে চাপ দাও!
কার্পেটগুলো একটু বসে গেল, আর ডালাটাও বন্ধ হল। নাতাশা খুশিতে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, তার চোখ দুটি জলে ভরে গেল। কিন্তু মুহূর্তমাত্র। সে আবার নতুন করে কাজে হাত দিল, আর এবার সকলেই তার উপর পুরোপুরি ভরসা পেল। এমন কি কাউন্টকে যখন বলা হল যে নাতাশা তার অনেক হুকুম বাতিল করে দিয়েছে তখনো সে মোটেই রাগ করল না।
কিন্তু সকলে মিলে অনেক রাত পর্যন্ত যথেষ্ট খেটেও সব জিনিস প্যাক করে শেষ করা গেল না। কাউন্টেস আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আর কাউন্টও পরদিন সকাল পর্যন্ত যাত্রা স্থগিত রেখে শুতে চলে গেল।
