সকলেই কাজে ব্যস্ত অথচ সে নিজে কিছুই করছে না-এতে নাতাশা লজ্জা বোধ করছে; সকাল থেকে বারকয়েক কাজ করতে চেষ্টাও করেছে, কিন্তু তাতে মন দিতে পারেনি, আর সমস্ত মন দিয়ে সাধ্যমতো কাজ করতে না পারলে কোনো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভবই নয়। চীনামাটির বাসন বাধা-ছাদার সময় সে কিছুক্ষণ সোনিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করতে চেষ্টা করল, কিন্তু একটু পরেই সে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে। পুরনো পোশাক ও ফিতেগুলি দাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে প্রথমটায় বেশ মজাই লাগল, কিন্তু সেকাজটা শেষ হয়ে গেলে তার আর কাজে উৎসাহ রইল না।
দুনিয়াশা, তুমি সব গুছিয়ে বেঁধে ফেল! কি বল সোনা? দুনিয়াশা রাজি হতেই নাতাশা মেঝের উপর বসে পড়ে পুরনো বল-নাচের পোশাকটা হাতে নিয়ে এমন একটা দিবাস্বপ্নের মধ্যে ডুবে গেল যার সঙ্গে তার বর্তমান চিন্তাধারার কোনো সম্পর্কই নেই। পাশের ঘরে দাসীদের কথাবার্তায় তার দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেল, তারা সকলেই বারান্দায় ছুটে যাচ্ছে। নাতাশা উঠে জানালা দিয়ে তাকাল। আহত মানুষে বোঝাই গাড়ির একটা লম্বা সারি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
দোকানি, বুড়ি নার্স, রাঁধুনি, কোচয়ান, পরিচারক, গাড়োয়ান ও খানসামার দল ফটকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আহতদের দেখছে।
একখানা পরিষ্কার ছোট রুমাল মাথার উপর ফেলে দুই হাতে তার দুটো কোণ ধরে নাতাশা রাস্তায় নেমে গেল।
আগেকার গৃহকত্রী মাভ্রা কুজমিনিচনা ভিড় ঠেলে বাকলের মাদুরে তৈরি ছইওয়ালা একটি গাড়ির কাছে গিয়ে ভিতরে শায়িত একটি বিবর্ণ তরুণ অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। নাতাশা কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সলজ্জভাবে থেমে গেল এবং তার কথাগুলি মন দিয়ে শুনতে লাগল; রুমালটা তখনো তার হাতেই ধরা আছে।
সে তখন বলছে, তাহলে মস্কোতে আপনার কেউ নেই? কোনো একটা বাড়িতে থাকতে পারলেই আপনার পক্ষে ভালো হয়…ধরুন আমাদের বাড়িতে…বাড়ির লোকেরা চলে যাচ্ছেন।
অফিসারটি ক্ষীণ গলায় বলল, সে অনুমতি মিলবে কি না জানি না। ঐ আমাদের কমান্ডিং অফিসার আসছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন, বলে সে একজন মজবুত গড়নের মেজরকে দেখিয়ে দিল।
ভয়ার্ত চোখে আহত অফিসারটির দিকে তাকিয়ে নাতাশা তৎক্ষণাৎ মেজরের দিকে এগিয়ে গেল।
শুধাল, আহত লোকরা কি আমাদের বাড়িতে থাকতে পারে?
মেজর একটু হেসে টুপিতে হাত রাখল।
চোখ কুঁচকে হেসে বলল, আপনি কোনটিকে চান মাদময়জেল?
নাতাশা শান্তভাবে প্রশ্নটারই পুনরাবৃত্তি করল; তার মুখের গম্ভীর ভাব ও চালচলন দেখে মেজরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, একটু ভেবে নিয়ে ইতিবাচক জবাব দিল।
বলল, হ্যাঁ, কেন পারবে না? নিশ্চয় থাকতে পারে।
ঘাড়টা ঈষৎ কাৎ করে নাতাশা দ্রুতপায়ে মাভ্রা কুজমিনিচনার কাছে ফিরে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওরা থাকতে পারে। উনি বললেন থাকতে পারে।
যে গাড়িতে অফিসারটি শুয়েছিল সেটাকে রস্তভদের উঠোনে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। বাকি গাড়িগুলোকে প্রোভাস্কায়া স্ট্রিটের অধিবাসীদের আমন্ত্রণে হয় তাদের উঠোনে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, নয়তো তাদের ফটকের সামনে থামিয়ে দেওয়া হল। দৈনন্দিন জীবনের রুটিন-বাধা কাজের বাইরে নতুন লোকদের নিয়ে একটা কিছু করার সুযোগ পেয়ে নাতাশা খুব খুশি। সে ও মাদ্ৰা কুজমিনিচনা দুজনে মিলে যত পারল তত বেশি আহত সৈনিকদের তাদের উঠোনে নিয়ে আসতে চেষ্টা করল।
মাভ্রা কুজমিনিচনা বলল, আপনার বাবাকে কিন্তু বলা উচিত।
ওসব কথা রাখুন। অসুবিধার কি আছে? একটা দিনের জন্য আমরা বৈঠকখানায় চলে যেতে পারি। আমাদের বাড়ির অর্ধেকটাই ওরা পেতে পারে।
কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখুন। এদের যদি একটা কোণের অংশে চাকরদের ঘরে অথবা নার্সদের ঘরেও রাখি, তাহলেও তো অনুমতির দরকার।
বেশ তো, আমি অনুমতি আনছি।
নাতাশা ছুটে বাড়ির ভিতরে চলে গেল। বৈঠকখানার আধখোলা দরোজা দিয়ে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল। ঘরটা ভিনিগার ও হফম্যান ড্রপ-এর গন্ধে ভর্তি।
মামণি কি ঘুমিয়েছ?
আরে, ঘুম আবার কোথায়?–ঝিমুনি কাটিয়ে জেগে উঠে কাউন্টেস বলল।
মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের মুখটা তার মুখের কাছাকাছি নিয়ে নাতাশা বলল, লক্ষ্মী মামণি! আমি দুঃখিত, তুমি আমাকে ক্ষমা কর, একাজ আর কখনো করব না। তোমার ঘুমটাই ভাঙিয়ে দিলাম! মাদ্রা কুজমিনিচনা আমাকে পাঠিয়ে দিল : ওরা কয়েকজন আহত অফিসারকে এখানে নিয়ে এসেছে। তুমি কি তাদের থাকতে দেবে? কোথাও তাদের যাবার জায়গা নেই। আমি জানতাম তুমি তাদের থাকতে দেবে… এক নিঃশ্বাসে সে কথাগুলি শেষ করল।
কোন অফিসার? কাদের নিয়ে এসেছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কাউন্টেস বলল।
নাতাশা হেসে উঠল; কাউন্টেসের মুখেও মৃদু হাসি।
আমি জানতাম তুমি অনুমতি দেবে…তাহলে ওদের বলি গে, মাকে চুমো খেয়ে নাতাশা দরোজার দিকে এগিয়ে গেল।
হল-এ বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কাউন্ট খারাপ খবর নিয়ে এসেছে।
বিরক্তিভরা গলায় বলল, আমাদের বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে! ক্লাব বন্ধ হয়ে গেছে; পুলিশও চলে যাচ্ছে।
বাপি, কয়েকজন আহত লোককে আমি বাড়িতে ডেকে এনেছি–ঠিক করিনি বাপি? নাতাশা বলল।
কাউন্ট অন্যমনস্কভাবেই জবাব দিল, তা তো বটেই। কিন্তু সেটা তো কথা নয়। ও সব আজেবাজে কাজে মন দেবার সময় এখন নয়, গোছগাছে হাত লাগাও, কাল আমাদের যেতেই হবে, অবশ্য যেতে হবে!…
