২০শে আগস্ট নাগাদ রস্তভদের পরিচিত প্রায় সকলেই মস্কো ছেড়ে চলে গেল; সকলে অনেক পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তার সোনা-মানিক পেতয়া ফিরে না আসা পর্যন্ত কাউন্টেস কিছুতেই মস্কো ছেড়ে যেতে রাজি হল না। সে এল ২৮শে আগস্ট। যে গভীর মমতায় মা তাকে কাছে টেনে নিল তাতে যোব বছরের অফিসার খুশি হল না। ছেলেকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখার বাসনা গোপন করে রাখলেও পেতয়া মার মনের কথা বুঝতে পারল এবং পাছে সে নিজেও আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, পাছে তার আচরণে মেয়েলিপনা প্রকাশ পায়, এই আশংকায় সে মাকে এড়িয়ে চলতে লাগল, এবং যে কটা দিন মস্কোতে থাকল সে সময়টা নাতাশাকে নিয়েই কাটাতে লাগল; নাতাশার প্রতি চিরদিনই একটা প্রায় প্রেমিকসুলভ ভ্রাতৃস্নেহ সে পোষণ করত।
কাউন্টের চিরাচরিত অব্যবস্থার ফলে ২৮ তারিখে তাদের যাত্রার কোনো আয়োজনই করা হয়নি। সংসারের মালপত্র বয়ে নেবার জন্য রিয়াজান ও মস্কোর জমিদারি থেকে যেসব গাড়ি আসার কথা তারা ৩০ তারিখের আগে এসে পৌঁছল না।
২৮শে থেকে ৩১শে পর্যন্ত সারা মস্কো হৈ-হল্লায় তোলপাড় হয়ে উঠল। প্রতিদিন হাজার হাজার আহত সৈন্যকে বরদিনো থেকে দরগমিলভ ফটক দিয়ে এনে মস্কোর নানা অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল আর হাজার হাজার গাড়ি অধিবাসীদের ও তাদের মালপত্র নিয়ে অন্য সব ফটক দিয়ে মস্কো থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। রস্তপচিনের ইস্তাহার সত্ত্বেও, সেগুলির জন্যই হোক অথবা ছাড়াই হোক, পরস্পরবিরোধী বিস্ময়কর সব গুজব শহরময় ছড়াতে লাগল। কেউ বলছে, কাউকে শহর ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে না; আবার কেউ বলছে, সব দেবমূর্তিগুলিকে গির্জা থেকে বের করে আনা হয়েছে এবং সকলকেই মস্কো ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। কেউ বলছে, বরদিনোর পরে আর একটা যুদ্ধ হয়েছে এবং সেখানে ফরাসিরা হটে গেছে; আবার কেউ বলছে উল্টো কথা-রুশ বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু গুজব যাই রটুক, একটা কথা সকলেই বুঝতে পেরেছে যে মস্কো ছেড়ে যেতেই হবে; কাজেই যত তাড়াতি সম্ভব সরে গিয়ে নিজ নিজ জিনিসপত্র বাঁচাবার চেষ্টা করাই কর্তব্য।
মস্কো দখলের আগের তিনটে দিন রস্তভ পরিবারের সকলেই নানা কাজে ব্যস্ত থাকল। পরিবারের কর্তা কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ অনবরত শহরময় ঘুরে সবরকম গুজব সংগ্রহ করে এনে বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি যাত্রার আয়োজন শেষ করার হুকুম চালাতে লাগল।
কাউন্টেস মালপত্র বাছাধা করা দেখছে, সবকিছুতেই খুঁতখুঁত করছে, সবসময় পেতয়ার পিছন পিছন ঘুরছে, আর সে সর্বদা নাতাশার সঙ্গে থাকছে দেখে ঈর্ষায় জ্বলছে। কাজের কাজ যা সেটুকু করছে সোনিয়া। কিন্তু ইদানীং সেও খুব বিষণ্ণ ও চুপচাপ হয়ে গেছে। নিকলাসের চিঠিতে প্রিন্সেস মারির সঙ্গে তার দেখা হওয়ার সংবাদ পড়ে কাউন্টেস সোনিয়ার সামনেই খুশিমনে বলেছিল যে প্রিন্সেস ও নিকলাসের এই দেখা সাক্ষাতে করুণাময় ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে।
কাউন্টেস বলেছিল, নাতাশার সঙ্গে বলকনস্কির বিয়ের প্রস্তাবে আমি কোনোদিনই খুশি হইনি; আমি সবসময়ই চেয়েছি নিকলাস প্রিন্সেসকে বিয়ে করুক, আর আমি এও জানতাম যে সেটাই ঘটবে। তাহলে কী ভালোই না হয়!
সোনিয়া বোঝে যে সেটাই ঠিক : নিকলাস একটি ধনবতী মহিলাকে বিয়ে করলে তবেই রস্তভদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে, আর সেদিক থেকে প্রিন্সেসই যোগ্য পাত্রী। কিন্তু তার পক্ষে ব্যাপার বড়ই তিক্ত। তবু নিজের সব দুঃখ-কষ্ট-সত্ত্বেও সারাদিন সেই যাত্রার উদ্যোগ-আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। কাউন্ট আর কাউন্টেস তো হুকুম করেই খালাস। পেতয়া ও নাতাশা তো সারাদিন ছুটোছুটি করেই বেড়াচ্ছে; কাজে সাহায্য করার বদলে তারা বরং বাধার সৃষ্টি করছে। মনে মনে তারা দুজনই খুব খুশি। তাদের খুশির একটা বড় কারণ যুদ্ধটা মস্কোর দিকে এগিয়ে আসছে, শহরের ফটকে-ফটকেই যুদ্ধ হবে, সকলকেই অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হচ্ছে, সকলেই পালাচ্ছে কোথাও না কোথাও চলে যাচ্ছে; মোটকথা একটা অসাধারণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে আর সেটা সব সময়ই উত্তেজক, বিশেষত যুবক-যুবতীদের কাছে।
.
অধ্যায়-১৩
৩১ আগস্ট শনিবার রস্তভদের বাড়ির সে এক লণ্ডভণ্ড অবস্থা। দরোজাগুলো হাট করে খোলা, আসবাসপত্র হয় বের করে নেওয়া হচ্ছে নয়তো এ-ঘর থেকে ও-ঘর করা হচ্ছে, আয়না ও ছবিগুলো সব নামিয়ে ফেলা হয়েছে। ঘরময় ট্রাংক ভর্তি, খড়, প্যাকিংয়ের কাগজ ও দড়ি ইতস্তত ছড়ানো। চাষী ও গৃহ-ভৃত্যরা মালপত্র নিয়ে ভারি কার্পেটের উপর দিয়ে থপথপ করে হাঁটছে। উঠোনে চাষীদের গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে; কতকগুলি উঁচু করে বোঝাই হয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়ে গেছে, কতকগুলি এখনো খালি।
কাউন্ট সকালেই বেরিয়ে গেছে। হৈ-হট্টগোলে কাউন্টেসের মাথা ধরেছে; ভিনিগারের পট্টি মাথায় লাগিয়ে সে নতুন ঘরে শুয়ে আছে। পেতয়া বাড়ি নেই; বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেছে; তার সঙ্গে একযোগে অসামরিক বিভাগ থেকে সোজা সামরিক বিভাগ বদলির জন্য চেষ্টা করছে। সোনিয়া নাচঘরে কাঁচের ও চীনেমাটির বাসনপত্র প্যাক করার তদারকি করছে। চারদিকে ছড়ানো পোশাক, ফিতে ও স্কার্ফের মধ্যে একটা পুরনো বল-নাচের পোশাক হাতে নিয়ে নাতাশা মেঝেতে বসে আছে।
