রস্তপচিন চেঁচিয়ে বলল, সেটা আমার জানবার কথা, কিন্তু তোমার প্রশ্ন করবার কথা নয়।
রস্তপচিনের দিকে না তাকিয়েই পিয়ের বলল, নেপোলিয়নের ইস্তাহার প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে, কিন্তু কাজটা যে সেই করেছে তা তো প্রমাণ হয়নি। আর ভেরেশচাগিন…
তাই নাকি? হঠাৎ ভুরু কুঁচকে রস্তপচিন চেঁচিয়ে বলল। ভেরেশচাগিন একটা দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক; তার উপযুক্ত শাস্তি সে পাবে। কিন্তু আমার কাজের সমালোচনা করার জন্য আমি তোমাকে ডাকিনি, ডেকেছি পরামর্শ দিতে ইচ্ছা করলে আদেশও বলতে পার। আমার অনুরোধ, তুমি শহর ছেড়ে চলে যাও, ফ্লচারেভের মতো লোকদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন কর। যে কোনো লোকের মাথার পোকা আমি বের করে দেবই-হঠাৎ তার খেয়াল হল যে বিনা দোষেই সে বেজুখভকে ধমকাচ্ছে; তাই বন্ধুর মতো পিয়েরের হাতখানা হাতে নিয়ে বলল, একটা চরম বিপর্যয়ের মুখে আমরা দাঁড়িয়েছি; যাদের নিয়ে আমাকে কাজ করতে হয় তাদের প্রতি ভদ্রতা দেখাবার মতো সময় আমার নেই। আমার মাথার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় চলছে। আচ্ছা বাপু, বল তো, ব্যক্তিগতভাবে তুমি কি করছ?
চোখ না তুলে, অথবা মুখের চিন্তিত ভাবটা না বদলেই, পিয়ের জবাব দিল, কেন, কিছুই করছি না।
কাউন্টের চোখে ভ্রূকুটি।
বন্ধু হিসেবে একটা উপদেশ দিচ্ছি বাপু। যত তাড়াতাড়ি পার কেটে পড়। এছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই। শুনবার মতো কান যার আছে সেই তো সুখী। বিদায়। ওহো, ভালো কথা, দরোজার দিকে তাকিয়ে পিয়েরকে চেঁচিয়ে বলল একথা কি সত্যি যে কাউন্টেস যীশু সমিতির পবিত্র পিতাদের খপ্পরে পড়েছেন?
পিয়ের জবাব দিল না, ঘর থেকে চলে গেল; এত কষ্ট ও কুদ্ধ সে আগে কখনো হয়নি।
যখন বাড়ি ফিরল তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেদিন সন্ধ্যায় জনা আষ্টেক লোক তার সঙ্গে দেখা করতে এল; একজন কমিটির সেক্রেটারি, তার ব্যাটেলিয়নের একজন কর্নেল, তার নায়েব ও তারও কিছু খাতক। সকলেই কোনো না কোনো কাজ নিয়ে তার কাছে এসেছে। কিন্তু কোনো কথাই পিয়েরের ভালো লাগছে না, ভালো করে বুঝতেও পারছে না, শুধু তাদের হাত এড়াবার জন্যই কোনোরকমে জবাব দিতে লাগল। সকলে চলে গেলে যখন একলা হল তখন স্ত্রীর চিঠিটা খুলে পড়ল।
তারা, কামানশ্রেণীর সৈন্যরা, প্রিন্স আন্দ্রু নিহত…সেই বুড়ো মানুষটি…সরলতাই ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ। কষ্টভোগ করাও দরকার…সব কিছুর অর্থ…প্রস্তুত থাকতে হবে…আমার স্ত্রী বিয়ে করতে যাচ্ছে .ভুলতে হবে, বুঝতে হবে… পোশাক না ছেড়েই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই নায়েব এসে খবর দিল, কাউন্ট রস্তপচিনের বিশেষ দূত হিসেবে একজন পুলিশ অফিসার এসে জানতে চাইছে, কাউন্ট বেজুখভ শহর ছেড়ে চলে গেছে কি না, অথবা যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে কি না।
নানা কাজে ডজনখানেক লোক বৈঠকখানায় পিয়েরের জন্য অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি পোশাক পরে তাদের সঙ্গে দেখা করতে না গিয়ে পিয়ের পিছনের বারান্দা দিয়ে ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
সেইসময় থেকে মস্কোর ধ্বংস শেষ হওয়া পর্যন্ত বেজুখভ পরিবারের লোকজনরা অনেক খোঁজখবর করেও পিয়েরকে আর কখনো দেখতে পেল না, বা সে কোথায় আছে তাও জানতে পারল না।
.
অধ্যায়-১২
১লা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ শত্রুপক্ষ শহরে ঢোকার আগে পর্যন্ত রস্তভরা মস্কোতেই রইল।
অবলেনস্কির কসাক রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে পেতয়া বেলায়া জারক-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর থেকেই কাউন্টেসের মনে ভয় ধরল। জনৈক পরিচিতের দুই ছেলেই যুদ্ধে গেছে, দুইজনই তার আশ্রয় থেকে দূরে চলে গেছে, আজ হোক কাল হোক তিন ছেলের মতোই তারা দুজনই বা যে কোনো একজন মারা যেতে পারেএই চিন্তা সেই গ্রীষ্মকালেই সর্বপ্রথম নিষ্ঠুর সত্যের মতো তার মনে এল। সে নিকলাসকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করল, নিজেই পেতয়ার কাছে চলে যেতে চাইল, বা পিতার্সবুর্গের কাছাকাছি কোথাও তার জন্য একটা চাকরির চেষ্টা করল, কিন্তু কোনোটাই সম্ভব হল না। কাউন্টেস রাতে ঘুমতে পারে না, অথবা ঘুমলেও স্বপ্ন দেখে তার ছেলেরা মরে পড়ে আছে। অনেক শলা-পরামর্শ ও আলাপ-আলোচনার পরে কাউন্ট তাকে শান্ত করার একটা উপায় বের করল। পেতয়াকে অবলেনস্কির রেজিমেন্ট থেকে বদলি করিয়ে মস্কোর কাছে ট্রেনিংরত বেজুখভের রেজিমেন্টে আনার ব্যবস্থা করল। সামরিক চাকরিতে থাকলেও এই বদলির ফলে কাউন্টেসের মনে এইটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে তার একটি ছেলে অন্তত তার পক্ষছায়ায় থাকবে এবং এখান থেকে তার যুদ্ধে যোগদান করার সম্ভাবনাটা অনেক কম। পেতয়ার ফিরে আসার সময় যতই কাছে আসতে। লাগল কাউন্টেস ততই অস্থির হয়ে উঠল। তার কেবলই মনে হতে লাগল যে এত সুখ তার কপালে সইবে না। সোনিয়া, প্রিয় নাতাশা, এমন কি স্বামী কাছে এলেও সে বিরক্ত হয়। ভাবে, তাদের দিয়ে আমি কি করব? পেতয়া ছাড়া অন্য কাউকে আমি চাই না।
অগস্টের শেষ দিকে রস্তভরা নিকলাসের একটা চিঠি পেল। ঘোড়া কিনতে ভরোনেজ প্রদেশে গিয়ে সেখান থেকেই সে চিঠি লিখেছে। কিন্তু চিঠি পেয়েও কাউন্টেসের অস্থিরতা গেল না। একটি ছেলে এখন বিপদমুক্ত হয়েছে জেনে পেতয়ার জন্য তার উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে।
