ওই লোকটি? ও তো একজন ব্যবসায়ী, মানে ওই তো রেস্তোরাঁওয়ালা ভেরেশচাগিন। সেই ইস্তাহারের ঘটনাটা আপনি হয়তো শুনেছেন।
বৃদ্ধ লোকটির কঠিন শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার কোনো লক্ষণ সেখানে আছে কি না দেখে পিয়ের বলল, ওঃ, তাহলে এই সেই ভেরশচাগিন!
অ্যাডজুটান্ট বলল, না, এ লোকটি সে নয়; যে ইস্তাহারটি লিখেছিল এ তার বাবা। যুবকটি এখন কারাগারে; মনে হয় তার কপালে দুঃখ আছে।
তারকা পরিহিত একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোক এবং গলায় ক্রুশ ঝোলানো একজন জার্মান অফিসার বক্তার দিকে এগিয়ে এল।
অ্যাডজুটান্ট বলল, জানেন তো, ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে। ইস্তাহারটি প্রকাশিত হয় দুমাস আগে। কাউন্টকে খবরও দেওয়া হয়। তিনি তদন্তের আদেশ দেন। এখানে গেব্রিয়েল আইভানভিচ তদন্ত করে। ইস্তাহারটি ঠিক তেষট্টি জনের হাত ঘুরেছে। তিনি একজনকে শুধালেন, আপনি এটা কার কাছে পেলেন? অমুকের কাছ থেকে। তিনি আর একজনের কাছে গেলেন। আপনি কার কাছে পেলেন? এইভাবে শেষপর্যন্ত তিনি পৌঁছে গেলেন একজন অর্ধশিক্ষিত ব্যবসায়ী ভেরেশচাগিনের কাছে। অ্যাডজুটান্ট হেসে ফেলল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমাকে এটা কে দিয়েছে? আসলে কিন্তু সে যে ওটা কার কাছ থেকে পেয়েছে সেটা আমরা জানতাম। পোস্টমাস্টার ছাড়া আর কার কাছে পাবে? কিন্তু তাদের মধ্যেও একটা বোঝাপড়া ছিল। সে জবাব দিল : কারো কাছ থেকে নয়; আমি নিজেই লিখেছি। তারা তাকে ভয় দেখাল। জেরা করল, কিন্তু তার এক কথা : আমি নিজেই লিখেছি। কাউন্টকে সেই কথাই বলা হল। তিনি লোকটিকে ডেকে পাঠালেন। এ ইস্তাহার তুমি কার কাছে পেয়েছ? আমি নিজেই লিখেছি। দেখুন, কাউন্টকে তো আপনারা চেনেন, গর্বের হাসি হেসে অ্যাডজুটান্ট বলতে লাগল, তিনি ভয়ংকর রেগে গেলেন,আর লোকটির ধৃষ্টতা, মিথ্যাচার ও একগুয়েমির কতা একবার ভাবুন তো।
পিয়ের বলল, কাউন্ট চেয়েছিলেন সে বলুক যে ক্লচারেভের কাছে পেয়েছে? আমি তো তাই জানি!
অ্যাডজুটান্ট হতাশ হয়ে বলল, মোটেই না। এছাড়া আরো অনেক পাপকর্মের কৈফিয়ত ক্লচারেভের দেবার ছিল, আর সেই কারণেই তার নির্বাসন হয়েছে। কিন্তু আসল কথা হল কাউন্ট বড়ই বিব্রত হলেন। বললেনও তুমি নিজে কি করে এটা লিখতে পারলে? টেবিলের উপর থেকে তিনি হাম্বুর্গ গেজেটখানা তুলে নিলেন। এই তো সেটা! তুমি নিজে এটা লেখনি, অনুবাদ করেছ মাত্র, আর জঘন্য অনুবাদ করেছ, কারণ তুমি ফরাসি ভাষাটাও জান না, মূর্খ কোথাকার! আর কি মনে করছেন? লোকটি বলল, না, আমি অন্য কোনো কাগজপত্র দেখিনি, নিজেই এটা লিখেছি। আর সেখানেই ইতি ঘটল। কাউন্ট তার বাবাকে ডেকে আনলেন, কিন্তু যুবকটি একতিল নড়ল না। যতদূর মনে হয় তাকে বিচারের জন্য পাঠানো হয় এবং কঠোর পরিশ্রমের শাস্তি হয়। এখন বাবা এসেছে তার হয়ে উমেদারি করতে। কিন্তু ছেলেটা আসলে অকর্মার ধাড়ি! এ ধরনের ব্যবসায়ীর ছেলে যেরকম হয়ে থাকে-নারীঘাতক ফুলবাবুটি। কোথায় কতকগুলি বক্তৃতা শুনেই ভেবে নিয়েছে যে শয়তানও তার সমকক্ষ নয়। ছোকরা ওইরকমই বটে। এখানে স্টোনব্রিজের পাশে তার বাবা একটা খাবারের দোকান চালায়। জানেন তো, সেখানে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের একটা বড় মূর্তি আঁকা আছে; তার এক হাতে রাজদণ্ড, আর অন্য হাতে একটি গোলক। তারপর, কয়েকদিনের জন্য সেই দেবমূর্তিটিকে বাড়ি নিয়ে এল, আর এনে কি করল জানেন? একটা বদমায়েশ চিত্রকরকে খুঁজে পেতে নিয়ে এল…
.
অধ্যায়-১১
এই নতুন কাহিনীর মাঝখানে প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে পিয়েরের ডাক এল।
সে যখন ঘরে ঢুকল কাউন্ট রস্তপচিন তখন মুখটা কুঁচকে হাত দিয়ে কপাল ও চোখ ঘষছিল। একটি বেঁটে লোক কি যেন বলছিল, কিন্তু পিয়ের ঘরে ঢুকতেই সে কথা থামিয়ে বেরিয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে রস্তপচিন বলে উঠল, এই যে মহাবীর, কেমন আছ? তোমার সাহসিকতার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু সেকথা নয়। নিজেদের মধ্যেই বলছি বাপু, তুমি কি ভ্রাতৃসংঘের লোক? পিয়ের চুপ করে রইল। আমি সঠিক খবরই রাখি বন্ধু, কিন্তু এও জানি ভ্রাতৃসংঘে তো কত লোকই যায়, আর যারা মানুষকে বাঁচাবার নামে রাশিয়াকে ধ্বংস করতে চায়, আশা করি তুমি তাদের দলের নও।
হ্যাঁ, আমি ভ্রাতৃসংঘী, পিয়ের জবাব দিল।
তাহলেই ব্যাপারটা বোঝ হে বাপু! আশা করি তুমি জান যে মেসার্স স্পেনস্কি ও ম্যাগনিস্কিকে যথাস্থানে পাঠানো হয়েছে। মিঃ ক্লচারভেরও সেই দশাই হয়েছে। অন্য যারা সলোমনের মন্দির গড়ার অজুহাতে পিতৃভূমির মন্দিরকে ধ্বংস করতে চেয়েছে তাদেরও সেই একই দশা হয়েছে। এসব কাজের স্বপক্ষে যে যথেষ্ট যুক্তি আছে তা তুমি নিশ্চয় বোঝ, আর ক্ষতিকর লোক না হলে পোস্টমাস্টারটিকে আমি নির্বাসনে পাঠাতাম না। এখন আমি জানতে পেরেছি যে তার শহর ছেড়ে যাবার ব্যাপারে তোমার গাড়িটা তুমি তাকে ধার দিয়েছ। এবং নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার জন্য তার কাগজপত্রগুলি নিয়েছ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার কোনো ক্ষতি হোক তা আমি চাই না; আর-যেহেতু তুমি আমার অর্ধেক বয়সের ছেলে-তাই বাবার মতোই তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি এধরনের লোকের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যাও।
কিন্তু ক্লচারভ অন্যায়টা কি করেছে কাউন্ট? পিয়ের জিজ্ঞাসা করল।
