প্রায় দশ হাজার আহতকে পিছনে ফেলে সৈন্যরা এগিয়ে চলেছে। সব বাড়ির উঠোনে আহত সৈন্য, জানালায় আহত সৈন্য, রাস্তাভর্তি আহত সৈন্য। কিছু গাড়িতে আহতদের নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়েছে; পথে পথে সেইসব গাড়িকে ঘিরে শোনা যাচ্ছে চেঁচামেচি, শাপশাপান্ত, আর ঘুমোঘুষি। নিজের গাড়িটা এসে পড়ায় একজন পরিচিত আহত জেনারেলকে গাড়িতে তুলে নিয়ে পিয়ের মস্কোর পথ ধরল। পথেই পিয়ের শুনতে পেল তার শ্যালক আনাতোল ও প্রিন্স আন্দ্রুর মৃত্যু-সংবাদ।
.
অধ্যায়-১০
৩০ আগস্ট পিয়ের মস্কো পোঁছল। নগরের ফটকের কাছেই দেখা হল কাউন্ট রস্তপচিনের অ্যাডজুটান্টের সঙ্গে।
অ্যাডজুটান্ট বলল, আমরা তো সর্বত্র আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কাউন্ট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তাঁর ইচ্ছা, একটা গুরুতর কাজের ব্যাপারে আপনি অবিলম্বে তার সঙ্গে দেখা করুন।
বাড়িতে না গিয়ে সেখান থেকেই একটা গাড়ি নিয়ে পিয়ের সোজা চলে গেল মস্কোর প্রধান সেনাপতির সঙ্গে দেখা করতে।
কাউন্ট রস্তপচিন সেইদিন সকালেই তার সকোলনিকির গ্রীষ্মবাস থেকে মস্কো ফিরেছে। বাড়ির প্রথম ঘরটা এবং অভ্যর্থনা-ঘরটা সরকারি কর্মচারীতে ভর্তি। ভাসিলচিকভ ও প্লাতভ ইতিমধ্যেই কাউন্টের সঙ্গে দেখা করে তাকে বুঝিয়েছে যে মস্কো রক্ষা করা অসম্ভব, তাকে শত্রুর হাতে ছেড়ে দিতেই হবে। যদিও মস্কোর অধিবাসীদের কাছে সংবাদটা গোপন রাখা হয়েছে, তবু অফিসাররা–বিভিন্ন সরকারি বিভাগের প্রধানরা–জানে যে অচিরেই মস্কো শত্রুর হাতে পড়বে, কাউন্ট রস্তপনি নিজেও তা জানে; শুধু নিজ নিজ বিভাগের কি ব্যবস্থা তারা করবে সে সম্পর্কে ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব এড়াবার জন্যই তারা শাসনকর্তার কাছে এসেছে।
পিয়ের অভ্যর্থনা-ঘরে ঢুকতেই একজন সামরিক বার্তাবহ রস্তপচিনের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
নানাবিধ প্রশ্নের জবাবে হাত নেড়ে মাত্র একটা হতাশাব্যঞ্জক ভঙ্গি করে সে ঘরটা পার হয়ে গেল।
অভ্যর্থনা-ঘরে বসে পিয়ের ক্লান্ত চোখে বৃদ্ধ ও তরুণ, সামরিক ও অসামরিক, সব অফিসারদেরই দেখতে লাগল। দেখে মনে হল, তারা সকলেই অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত। পিয়ের একটা দলের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের একজনকে সে চেনে।
পিয়েরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তারা আবার গল্প করতে লাগল।
তাদের যদি এখন বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে পরে ফিরিয়ে আনা হয় তাতে তো কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে কেউ কিছু বলতে পারে না।
হাতের একটা ছাপানো কাগজ দেখিয়ে আর একজন বলল, কিন্তু এতে কি লিখেছে সেটা দেখ…
ওটা অন্য ব্যাপার। ওটা জনসাধারণের জন্য দরকার, প্রথম জন বলল।
ওটা কি? পিয়ের শুধাল।
ওঃ, এটা একটা নতুন ইস্তাহার।
পিয়ের সেটা নিয়ে পড়তে লাগল।
প্রশান্ত মহামহিম (কুতুজভ) তাঁর দিকে অগ্রসরমান সেনাদলের সঙ্গে যোগ দিতে মোঝায়েস্ক-এর ভিতর দিয়ে এগিয়ে এমন একটা জায়গায় শক্ত ঘাঁটি গেড়েছেন, যেখানে শত্রুপক্ষ তাকে শীঘ্র আক্রমণ করতে পারবে না। এখান থেকে আটচল্লিশটি কামান ও গোলাবারুদ তাঁকে পাঠানো হয়েছে; প্রশান্ত মহামহিম বলেছেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও তিনি মস্কোকে রক্ষা করবেন, এমন কি পথে পথে যুদ্ধ করতেও তিনি প্রস্তুত। ভাইসব, আদালত বন্ধ হয়ে গেলেও আপনারা বিচলিত হবেন না; শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করতে হবে; শয়তানদের সঙ্গে শয়তানি ব্যবহারই আমরা করব। সময় হলে শহর ও গ্রামের সব ছেলেদেরই আমার দরকার হবে, দুই একদিন আগেই আমি ডাক পাঠাব, কিন্তু এখনই তাদের দরকার হচ্ছে না। তাই আমি চুপ করে আছি। সেদিন একটা কুড় লও দরকার হবে, একটা বর্শাও কাজে লাগবে, কিন্তু সবচাইতে ভালো একটা তিন-ফলা ত্রিশূল : একটা ফরাসি এক আঁটি যইয়ের চাইতে বেশি ভারি নয়। কাল ডিনারের পরে ঈশ্বর-জননীর আইবেরিয় মূর্তি নিয়ে আমি ক্যাথারিন হাসপাতালে আহতদের কাছে যাব, সেখানে তাদের জন্য সংগ্রহ করব আশীর্বাদী জল। সেই জল তাদের দ্রুত আরোগ্যলাভ করতে সাহায্য করবে। আমি নিজেও এখন ভালো আছি; একটা চোখে ঘা হয়েছিল, কিন্তু এখন দুই চোখেই দেখতে পাচ্ছি।
পিয়ের বলল, কিন্তু সৈন্যরা আমাকে বলেছে যে শহরে যুদ্ধ করা অসম্ভব; অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে…
বটেই তো! আমরাও তো সেই কথাই বলছিলাম। প্রথম বক্তা বলল।
পিয়ের শুধাল, আমার একটা চোখে ঘা হয়েছিল, এখন দুই চোখেই দেখতে পাচ্ছি–একথার মানে কি?
অ্যাডজুটান্ট হেসে বলল, কাউন্টের চোখে অঞ্জনি হয়েছিল; আমি যখন তাকে বললাম যে লোকজনরা ব্যাপারটা। জানতে চাইছে তখন তিনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। ভালো কথা কাউন্ট, হঠাৎ একটু হেসে সে পিয়েরকে বলল, আমরা শুনেছি আপনার একটা পারিবারিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে, কাউন্টেস মানে আপনার স্ত্রী…
পিয়ের নিরাসক্ত গলায় বলল, আমি কিছু শুনিনি; কিন্তু আপনারা কি শুনেছেন?
দেখুন, মানুষ তো অনেক সময় অনেক কিছু বানিয়েও বলে। আমি যা শুনেছি তাই বলছি।
কিন্তু আপনি কি শুনেছেন?
সেই একই হাসি হেসে অ্যাডজুটান্ট বলল, দেখুন, লোকে বলছে, কাউন্টেস, মানে আপনার স্ত্রী নাকি বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। আমি অবশ্য আশা করি যে কথাটা একদম বাজে…
অন্যমনস্কভাবে চারদিকে তাকিয়ে পিয়ের বলল হয়তো তাই। আচ্ছা, ওই লোকটি কে? একটি বেঁটে বুড়ো লোককে দেখিয়ে সে বলল। লোকটির পরনে একটা পরিষ্কার নীল রঙের চাষীদের ওভারকোট, বরফ শাদা লম্বা দাড়ি ও ভুরু, লালচে মুখ।
