হঠাৎ তাদের একজন পিয়েরকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে বলুন তো? সে যেন বলতে চাইল : আপনি খেতে চাইলে কিছুটা খাদ্য আপনাকে দিতে পারি, শুধু আপনি একজন সৎলোক কি না সেটা আমাদের জানা দরকার।
সামাজিক দিক থেকে সৈনিকদের যতটা কাছাকাছি আসা যায় যাতে তারা তাকে ভালো করে বুঝতে পারে সেই চেষ্টা করাই দরকার মনে করে পিয়ের বলল, আমি, আমি…আমি একজন অসামরিক অফিসার, তবে আমার লোকজনরা এখানে নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে এসে আমি তাদের হারিয়ে ফেলেছি।
তাই তো! একটি সৈনিক বলল।
অন্য একজন মাথা নাড়ল।
একটু জাবনা খাবেন না কি? বলে প্রথম সৈনিক একটা কাঠের চামচ পরিষ্কার করে মুছে পিয়েরের হাতে দিল।
আগুনের পাশে বসে সেই জাবনা খেতে খেতে পিয়েরের মনে হল আজ পর্যন্ত যত খাবার সে খেয়েছে এটাই তার মধ্যে সবচাইতে স্বাদু। সে লোভীর মতো উপুড় হয়ে খেতে লাগল। আগুনের আলো পড়েছে তার মুখে। সৈন্যরা নীরবে তার দিকে তাকাল।
একজন বলল, আপনি কোথায় যাবেন? আমাদের বলুন!
মোঝইস্ক-এ।
আপনি একজন ভদ্রলোক, তাই না?
হ্যাঁ।
আপনার নাম?
পিতর কিরিলিচ।
ঠিক আছে পিতর কিরিলিচ, আমাদের সঙ্গে আসুন, আমরাই আপনাকে সেখানে নিয়ে যাব।
ঘুটঘুট্টি অন্ধকারের মধ্যে সৈন্যরা পিয়েরকে সঙ্গে নিয়ে মোঝইক-এর দিকে হাঁটতে লাগল।
মোঝইস্ক-এর কাছাকাছি পৌঁছে খাড়া পাহাড় বেয়ে শহরে উঠবার মুখেই মোরগ ডাকতে শুরু করল। তার সরাইখানাটা যে পাহাড়ের নিচে এবং সে যে সেটা পার হয়ে এসেছে সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে পিয়ের সৈন্যদের সঙ্গেই উপরে উঠতে লাগল। তার মনের ভুলো অবস্থাটা তখন এতই বেড়ে গেছে যে মাঝপথে তার সহিসের সঙ্গে দেখা না হলে সরাইখানার কথাটা তার মনেই পড়ত না। পিয়েরের শাদা টুপি দেখেই সহিস তাকে অন্ধকারেও চিনতে পারল।
বলে উঠল, ইয়োর এক্সেলেন্সি! আরে, আমরা তো আপনার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম! আপনি হেঁটে যাচ্ছেন কেন? আর যাচ্ছেনই বা কোথায়?
তাই তো! পিয়ের বলল।
সৈনিকরা থেমে গেল।
একজন বলল, আপনার লোকদের তাহলে পেয়ে গেছেন? আচ্ছা, তাহলে বিদায় পিতর কিরিলিচ-তাই তো?
আর একজনও সেই কথাই বলল, বিদায় পিতর কিরিলিচ।
বিদায়। বলে পিয়ের সহিসকে নিয়ে সরাইখানার দিকে পা বাড়াল।
ওদের কিছু দেওয়া উচিত, এই কথা ভেবে সে পকেটে হাত দিল। কিন্তু ভিতর থেকে কে যেন বলল, না, না দেওয়াই ভালো।
সরাইখানায় একটা ঘরও পাওয়া গেল না; সবগুলিই ভর্তি। পিয়ের উঠোনে নেমে গেল; আপাদমস্তক ঢেকে গাড়ির মধ্যেই শুয়ে পড়ল।
.
অধ্যায়-৯
বালিশে মাথা রাখতে না রাখতেই পিয়ের ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু হঠাৎ যেন বাস্তবেই ঘটছে এমনই স্পষ্টভাবেই তার কানে এল কামানের বুমবুমবুম, অর্ধবৃত্তাকার গোলার শিস, আর্তনাদ ও চিত্তার, নাকে লাগল রক্ত ও বারুদের গন্ধ, আর আতঙ্ক ও মৃত্যু-ভয় তাকে চেপে ধরল। সভয়ে চোখ খুলে জোব্বার ভিতর থেকে মাথাটা বের করল। উঠোনটা চুপচাপ। শুধু কে একজন আর্দালি কাদার ভিতর দিয়ে ফটক পার হয়ে এসে সরাইওয়ালার সঙ্গে কি যেন কথা বলল। তার উঠে বসার শব্দে চমকিত হয়ে কয়েকটা পায়রা পিয়েরের মাথার উপর থেকে উড়ে গেল। দুটো চালাঘরের কালো ছাদের মাঝখান দিয়ে পরিষ্কার তারাভরা আকাশটা দেখা যাচ্ছে।
আবার মাথাটা ঢেকে সে বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সেসব কিছুই নেই। হায়রে, ভয় কী ভয়ংকর চিজ, আর কীরকম লজ্জাজনকভাবে আমি তার কাছে ধরা দিলাম। কিন্তু তারা…তারা তো সারাক্ষণই ধীর, স্থির ছিল…শেষ পর্যন্ত…।
পিয়েরের মনে তারা মানে সেইসব যারা কামানশ্রেণীতে কর্মরত ছিল, যারা তাকে আহার্য দিয়েছে। তারা, পূর্বে অপরিচিত সেইসব সৈন্যদের মুখ স্পষ্ট হয়ে তার সামনে ভেসে উঠল।
ঘুমিয়ে পড়তে পড়তেই পিয়ের ভাবতে লাগল : যদি সৈনিক হতাম, স্রেফ একজন সৈনিক! সম্পূর্ণভাবে সকলের সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাদের মতোই চিন্তা-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া। কিন্তু আমার বাইরের মানুষটার এই অকারণ খোলসটা, এই শয়তানি বোঝাটা ঝেড়ে ফেলব কেমন করে? একসময় ছিল যখন এসবই করতে পারতাম। বাবার কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারতাম অথবা দলখভের সঙ্গে দ্বৈতযুদ্ধের পরে আমাকে সৈনিকের কাজ দিয়ে পাঠানোও হতে পারত। পুরনো দিনের অনেক স্মৃতি তার মনের মধ্যে ভিড় করে এল।
ঘোড়ার সাজ পরানোর সময় হয়েছে ইয়োর এক্সেলেন্সি! ইয়োর এক্সেলেন্সি! এখনই ঘোড়ার সাজ পরাতে হবে। সময় হয়ে গেছে ইয়োর এক্সেলেন্সি!…
সহিস তাকে ডাকছে। সূর্যের আলো এসে পড়েছে পিয়েরের মুখে। সরাইখানার নোংরা উঠোনটার দিকে সে তাকাল। মাঝখানে পাম্পের কাছে সৈনিকরা তাদের শুটকো ঘোড়াগুলোকে জল খাওয়াচ্ছে, গাড়িগুলো ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে মুখটা ঘুরিয়ে চোখ বুঝে সে আবার গাড়ির মধ্যেই বসে পড়ল। না, এসব আমি চাই না, এসব দেখতে ও বুঝতেও চাই না। স্বপ্নে যে দেখেছিলাম তাকে আমি বুঝতে চাই। আর এক সেকেন্ড স্বপ্নটা চলতে থাকলেই তো সব বুঝতে পারতাম।
সহিস, কোচয়ান ও সরাইওয়ালা এসে পিয়েরকে বলল, একজন অফিসার খবর এনেছে যে ফরাসিরা মোঝায়েস্ক-এর কাছে পৌঁছে গেছে, আর আমাদের সৈন্যরা সেখান থেকে সরে যাচ্ছে।
পিয়ের উঠল; ঘোড়ার সাজ পরিয়ে পথে তাকে তুলে নিতে বলে সে পায়ে হেঁটে শহরের পথে বেরিয়ে পড়ল।
