আনন্দে উচ্ছল হয়ে পুনরায় তার আস্তিনটা ছুঁয়ে হেলেন বলল, এই তো সত্যিকারের বন্ধুর কথা। কিন্তু তুমি তো জান, আমি দুজনকেই ভালোবাসি, কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। তাদের দুজনের সুখের জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত।
সেক্ষেত্রে তো তার আর কিছু করার নেই এমনি ভঙ্গিতে বিলিবিন দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিল।
মহীয়সী নারী! সোজা কথায় বললে তো এই কথাই বলতে হয়। এ দেখছি একই সঙ্গে তিনজনকেই বিয়ে করতে চায়। সে ভাবল।
স্পষ্ট কথা বলার খ্যাতি বিলিবিনের আছে। সে প্রশ্ন করল, কিন্তু আমাকে বল দেখি, তোমার স্বামী ব্যাপারটাকে কি চোখে দেখবে? সে কি এতে রাজি হবে?
হেলেন বলল, ওঃ, সে আমাকে কত ভালোবাসে! আমার জন্য সে সব করবে।
এমনকি তোমার সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদও করবে? বিলিবিন রসিকতা করে জিজ্ঞেস করল।
হেলেন হেসে উঠল।
আর একটি মানুষ এই প্রস্তাবিত বিয়ের যুক্তিত্তায় সন্দেহ প্রকাশ করল; সে হেলেনের মা প্রিন্সেস কুরাগিনা। বিবাহ-বিচ্ছেদ এবং স্বামী বেঁচে থাকতে পুনর্বিবাহের সম্ভাবনা সম্পর্কে সে জনৈক রুশ পুরোহিতের পরামর্শ চাইল। পুরোহিত জানাল যে সেটা অসম্ভব এবং ধর্ম-পুস্তকের একটা অংশ দেখিয়ে দিল যেখানে স্বামী বর্তমানে পুনর্বিবাহকে পরিষ্কার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই সব অখণ্ডনীয় যুক্তিতে সুসজ্জিত হয়ে প্রিন্সেস কুরাগিনা একদিন খুব সকালে মেয়ের কাছে গিয়ে হাজির হল।
মনোযোগ দিয়ে মার আপত্তিগুলো শুনে নিয়ে হেলেন ব্যঙ্গের হাসি হেসে ফেলল।
বুড়ি প্রিন্সেস বলল, কিন্তু এখানে তো পরিষ্কার বলা আছে : বিবাহ-বিচ্ছিন্নাকে যে বিয়ে করবে…
হেলেন এবার রুশ ছেড়ে ফরাসি ভাষায় বলে উঠল, আঃ, মামন, বাজে কথা বল না! তুমি কিছু বোঝ না। আমার অনেকরকম দায়-দায়িত্ব আছে।
কিন্তু সোনা…
আঃ মামণি, কেন যে তুমি বুঝতে পারছ না, যে পবিত্র পিতার সবরকম বিধান দেবার অধিকার আছে…।
ঠিক সেইসময় হেলেনের জনৈক সহচরী এসে জানাল, হিজ হাইনেস নাচ-ঘরে এসেছে, তার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
না, তাকে বলে দাও তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই না; তিনি তাঁর কথা রাখেননি, তাই আমি তাঁর উপর প্রচণ্ড চটে গেছি।
কাউন্টেস, সব পাপেরই তো মার্জনা আছে, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সুকেশ এক যুবক বলে উঠল; তার মুখ ও নাক দুইই লম্বা।
বুড়ি প্রিন্সেস সসম্মানে উঠে অভিবাদন করল। যুবকটি কিন্তু তার দিকে নজরই দিল না। মেয়ের দিকে মাথা নেড়ে প্রিন্সেস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
হ্যাঁ, মেয়ে তাহলে ঠিকই বলেছে, বুড়ি প্রিন্সেস মনে মনে বলল। হিজ হাইনেসের আবির্ভাবেই তার সব বিশ্বাস উধাও হয়ে গেল। মেয়েই ঠিক, কিন্তু আমাদের যে যৌবন আর ফিরে আসবে না সেই যৌবনকালে আমরা কেন একথা জানলাম না? অথচ কথাটা কত সহজ। ভাবতে ভাবতে বুড়ি প্রিন্সেস গাড়িতে উঠে বসল।
.
অগস্টের গোড়ার দিকেই হেলেনের ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল; স্বামীকে একখানা চিঠি লিখে জানিয়ে দিল–সে স্থির করেছে এন. এন. কে বিয়ে করবে, সত্যধর্মকে অবলম্বন করেছে, আর তাই অনুরোধ জানাচ্ছে বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলি যেন সুসম্পন্ন করা হয়; পত্রবাহকই সব ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বলবে।
বন্ধু আমার, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তাঁর পবিত্র ও শক্তিমান আশ্রয় তিনি তোমাকে দান করুন–তোমার বন্ধু হেলেন।
এই চিঠি যখন পিয়েরের বাড়িতে পৌঁছল সে তখন বরদিনোর যুদ্ধক্ষেত্রে।
.
অধ্যায়-৮
বরদিনোর যুদ্ধের শেষের দিকে দ্বিতীয়বার রায়েভস্কি কামানশ্রেণী থেকে নেমে এসে পিয়ের একদল সৈন্যের সঙ্গে একটা নালার ভিতর দিয়ে এগিয়ে ড্রেসিং-স্টেশনে পৌঁছল এবং সেখানকার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ও আর্তনাদ-চিৎকার শুনে চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে একদল সৈন্যের দঙ্গলের মধ্যে আটকে গেল।
এখন তার মনের একমাত্র বাসনা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারাদিনের এই মর্মন্তুদ অনুভূতি থেকে বেরিয়ে জীবনের সাধারণ পরিবেশে ফিরে যাওয়া এবং ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকা। তার মনে হল, একমাত্র জীবনের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে গেলেই সে নিজেকে এবং সারাদিন যা দেখেছে ও অনুভব করেছে তাকে বুঝতে পারবে। কিন্তু সে স্বাভাবিক পরিবেশ তো কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়।
যদিও যেপথ ধরে সে চলেছে সেখানে গোলাগুলির হিস-হিস শব্দটা নেই; কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশই চারদিকে ছড়িয়ে আছে। সেই একই যন্ত্রণা, ক্লান্তি, মাঝে মাঝেই অদ্ভুত নিরাসক্ত সব মুখ, একই রক্ত, একই সৈনিকদের ওভারকোট, একই গোলাগুলির শব্দ, দূরাগত হলেও এখনো তারা ত্রাসের সৃষ্টি করে, আর তাছাড়া সেই একই দুর্গন্ধ বাতাস ও ধুলো।
মোঝইস্ক রোড ধরে মাইল দুই হেঁটে পিয়ের পথের পাশে বসে পড়ল।
গোধূলি নেমে এসেছে; কামানের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে চলমান ছায়ার দিকে তাকিয়ে পিয়ের অনেকক্ষণ শুয়ে থাকল। সর্বক্ষণই সে কল্পনা করছে যেন একটা কামানের গোলা প্রচণ্ড শব্দ করে তার দিকে ছুটে আসছে, আর সঙ্গে সঙ্গে সে শিউরে উঠে বসছে। কতক্ষণ যে এইভাবে কাটল তা সে জানে না। মাঝরাতে তিনটি সৈনিক কিছু জ্বালানি কাঠ এনে তার পাশে বসে আগুন জ্বালাতে শুরু করল।
পিয়েরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সৈনিক তিনটি আগুন জ্বালিয়ে একটা লোহার পাত্র তার উপর বসিয়ে দিল এবং কিছু শুকনো পাউরুটি ছিঁড়ে পাত্রের মধ্যে ফেলে দিয়ে তাতে কয়েক ফোঁটা জল ঢেলে দিল। সেই চটচটে খাবারের মধুর গন্ধ ধোয়ার গন্ধের সঙ্গে মিশে গেল। পিয়ের উঠে বসে নিঃশ্বাস ছাড়ল। তার দিকে তাকিয়েই সৈনিক তিনজন খেতে খেতে গল্প করতে লাগল।
