স্বল্পালোকিত অভ্যর্থনা-ঘরে যারা বসেছিল তারা ফিসফিস করে কথা বলছে। যখনই কেউ মুম্ষ লোকটির ঘরে ঢুকছে বা বেরিয়ে আসছে তখনই তারা দরজা খোলার সামান্য কাঁচ-কাঁচ শব্দ শুনেই চুপ হয়ে যাচ্ছে, আর কৌতূহল ও প্রত্যাশার দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
মানব জীবনের সীমা তো…নির্দিষ্ট; তাকে পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে, বুড়ো পুরোহিত একজন মহিলাকে বলল; মহিলাটি তার পাশেই বসে সরলভাবে তার কথা শুনছিল।
তৈললেপন অনুষ্ঠানের কি বিলম্ব যাচ্ছে না? মহিলাটি শুধাল।
আহা মাদাম, সেটা তো খুব বড় অনুষ্ঠান, টাক মাথার যৎসামান্য জটাধা চুলে হাত বুলোতে বুলোতে পুরোহিত বলল।
ঘরের অপর দিকের কে একজন জিজ্ঞাসা করল, উনি কে? সামরিক শাসনকর্তা স্বয়ং কেমন যুবকের মতো দেখতে।
হ্যাঁ, তার বয়স ষাটের উপর। শুনলাম, কাউন্ট নাকি এখন কাউকে চিনতে পারছেন না? তারা তো তৈললেপন অনুষ্ঠানটা করে ফেলতে চাইছে।
আমি এমন লোকের কথাও শুনেছি যার সাতবার তৈললেপন অনুষ্ঠান হয়েছিল।
মেজ প্রিন্সেস এইমাত্র রোগীর ঘর থেকে এসেছে। কেঁদে কেঁদে তার চোখ লাল হয়ে গেছে। সে ডা. লোরেনের পাশে গিয়ে বসল। ক্যাথারিনের প্রতিকৃতির নিচে টেবিলের উপর কনুইতে ভর দিয়ে ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বসে ছিল।
আবহাওয়া সম্পর্কে একটা প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তার বলল, সুন্দর। আবহাওয়া সুন্দর প্রিন্সেস, তাছাড়া, মস্কোতে থাকলে মনে হয় যেন গ্রামদেশেই আছি।
দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে প্রিন্সেস বলল, সত্যি তাই। তাহলে ওঁকে কিছু পানীয় দেওয়া যেতে পারে কী?
লোরেন ভাবতে লাগল।
ওষুধ খেয়েছেন কি?
হ্যাঁ।
ডাক্তার ঘড়ি দেখল।
এক গ্লাস ফুটানো জলের মধ্যে এক চিমটে লবণ মিশিয়ে দেবেন,; এক চিমটে বলতে কি বোঝায় তাও সে দুটো আঙুলের ডগা দিয়ে বুঝিয়ে দিল।
জনৈক জার্মান ডাক্তার একজন এড-ডি-কংকে বলল, তৃতীয় আক্রমণের পর কোনো রোগী বেঁচে আছে এরকম দেখা যায় নি।
এড-ডি-কং বলল, অথচ কত হিসাবমতো তিনি চলতেন, আর তার শরীরটাও কত ভালো ছিল। তারপর ফিসফিস করে বলল, তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে হবে?
জার্মানটি, হেসে বলল, তার জন্য লোকের অভাব হবে না।
লোরেনের নির্দেশ মতো পানীয় তৈরি করে মেজ প্রিন্সেস ঘরে ঢুকল; দরজায় শব্দ হতেই সকলে আর একবার দরজার দিকে চোখ ফেরাল। জার্মান ডাক্তারটি লোরেনের কাছে উঠে গেল।
জার্মানটি খারাপ উচ্চারণে ফরাসি ভাষায় জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মনে করেন উনি সকাল পর্যন্ত বাঁচবেন?
লোরেন ঠোঁট বেঁকিয়ে একটা আঙুলকে না-সূচকভাবে জোরে জোরে নাড়তে লাগল।
নিচু গলায় বলল, আজ রাতেই তার পরে নয়। সে যে রোগীর অবস্থা সঠিক বুঝতে পেরেছে এবং বলতে পেরেছে এই আত্মতৃপ্তিকে শিষ্টাচারসম্মত হাসি হেসে সে সরে গেল।
এদিকে প্রিন্স ভাসিলি দরজা কুলে প্রিন্সেসের ঘরে ঢুকল।
ঘরের ভিতরটা প্রায় অন্ধকার; দেবমূর্তির সামনে দুটো ছোট বাতি শুধু জ্বলছে; ঘরময় ফুল ও ধূপের গন্ধ। ছোট ঘোট আসবাব, হোয়াট-নট, ক্যাবার্ড ও ছোট টেবিল ছড়িয়ে আছে। পর্দার ওপাশে একটা উঁচু, সাদা পালকের বিছানা চোখে পড়ছে। একটা ছোট কুকুর ডাকতে শুরু করল।
কে দাদা?
প্রিন্সেস উঠে চুলটা ঠিক করল; অবশ্য তার চুল বেশ পরিপাটিই ছিল। কিছু কি ঘটেছে? সে জিজ্ঞাসা করল। আমার এত ভয় করছে।
ক্লান্তভাবে চেয়ারে বসে পড়ে প্রিন্স আস্তে বলল, না, কোনো পরিবর্তন নেই। আমি এসেছি তোমার সঙ্গে একটু কাজের কথা বলতে কাতিচে। ঘরটা কিন্তু বেশ গরম রেখেছ, সে কথা বলতেই হবে। আরে বস, একটু কথা বলা যাক।
মুখের কঠোর ভাবের কোনো পরিবর্তন না করেই প্রিন্সেস বলল, আমি ভাবলাম বুঝি কিছু একটা ঘটেছে। একটু ঘুমোতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।
প্রিন্সেসের হাতটা ধরে অভ্যাসমতো সেটাকে নিচের দিকে বেঁকিয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলল, তাহলে বোন?
এই তাহলের অর্থ যে দুজনই ভালো বোঝে সেটা বেশ পরিষ্কার বোঝা গেল।
প্রিন্সেসের শরীর বেশ খাড়া ও শক্ত, পায়ের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের লম্বা। সে প্রিন্স ভাসিলির দিকে সোজাসুজি তাকাল; ভাসা-ভাসা ধূসর চোখে আবেগের কোনো চিহ্ন নেই। তারপর মাথাটা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেবমূর্তির দিকে তাকাল। এটা দুঃখ ও ভক্তির লক্ষণ হতে পারে, আমার ক্লান্তি ও আসন্ন বিশ্রামের আশার লক্ষণও হতে পারে। প্রিন্স ভাসিলি এটাকে ক্লান্তির লক্ষণ বলেই মনে করল।
বলল, আর আমি? আমার পক্ষেই কি ব্যাপারটা সহজ বলে মনে কর? ডাক-গাড়ির ঘোড়ার মতো আমিও ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছি। তবু তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতেই হবে কাতিচে, খুব গুরুতর কথা।
সরু হাড় বের-করা হাতে ছোট কুকুরটাকে কোলের উপর ধরে প্রিন্সেস সাগ্রহে প্রিন্স ভাসিলির মুখের দিকে তাকাল; সে স্থির করে ফেলেছে যে প্রথমে কথা বলবে না, তাতে যদি দরকার হয়তো সকাল পর্যন্ত ও অপেক্ষা করে থাকবে।
মনে মনে কিছুটা লড়াই করে প্রিন্স ভাসিলি এবার আসল কথায় এল, আমার প্রিয় প্রিন্সেস ও বোন ক্যাথারিন সেমেনভনা, কি জান এরকম একটা মুহূর্তে সবকিছুই অবশ্য ভাবতে হবে। ভবিষ্যতের কথা, তোমাদের সকলের কথা–সবই ভাবতে হবে।…তুমি তো জান, তোমাদের আমি নিজের ছেলেমেয়েদের মতোই ভালোবাসি!
প্রিন্সেস একইভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল; একটুও নড়াচড়া করল না।
