সেসব কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে হেলেন হঠাৎ মোহময়ী হাসি হেসে বলে উঠল : কিন্তু আমি মনে করি, একটি মিথ্যা ধর্ম যে বন্ধন আমার উপর আরোপ করেছিল, সৎ ধর্মকে বরণ করার পরে তা আর আমাকে বেঁধে রাখতে পারে না।
এইভাবে কলম্বাসের ডিমের মতো সরলতার সঙ্গে ব্যাপারটাকে তার সামনে উপস্থিত করায় হেলেনের বিবেক-রক্ষকটি অবাক হয়ে গেল। ছাত্রীটির এই অপ্রত্যাশিত দ্রুত উন্নতি দেখে সে খুশি হল, কিন্তু অনেক পরিশ্রম করে বিতর্কের যে সৌধটি সে গড়ে তুলেছে তাকেও পরিত্যাগ করতে পারল না।
আগে আমাদের পরস্পরকে বুঝতে দিন কাউন্টেস, হেসে কথাটা বলে পাদরি আবার তার মানসকন্যার যুক্তিকে খণ্ডন করতে শুরু করল।
.
অধ্যায়-৭
হেলেন বুঝতে পারল, যাজকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটা খুবই সরল ও সহজ, তার পরিচালকরা যে অসুবিধার সৃষ্টি করছে তার একমাত্র কারণ অযাজকীয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটাকে কীভাবে নেবে সে বিষয়ে তাদের মনে সংশয় আছে।
তাই সে স্থির করল, এ ব্যাপারে সমাজের উপর মহলের মনোভাবটা প্রস্তুত তরা প্রয়োজন। বয়স্ক গণ্যমান্য লোকটির মনে ঈর্ষা জাগাতে সে অপর প্রণয়প্রার্থীকে যেকথা বলেছে সেই কথাই তাকেও বলল, অর্থাৎ সে তাকেও বোঝাল যে হেলেনের উপর যদি কোনো অধিকার পেতে হয় তাহলে তাকে বিয়ে করতেই হবে। যে নারীর স্বামী এখনো বেঁচে আছে তার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব শুনে তরুণতর প্রণয়প্রার্থীর মতোই এই গন্যমান্য ব্যক্তিটিও প্রথমে খুবই হকচকিয়ে গেল, কিন্তু হেলেন যত দৃঢ়তার সঙ্গে তাকে বোঝাল যে ব্যাপারটা যে কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ে করার মতোই সরল ও স্বাভাবিক তখন সেও কিছুটা প্রভাবিত হল। হেলেন যদি তিলমাত্র ইতস্তত ভাব, লজ্জা, বা গোপনীয়তার লক্ষণ দেখাত তাহলেই তার খুঁটি কেঁচে যেত, কিন্তু গোপনীয়তা বা লজ্জার কোনোরকম লক্ষণ না দেখিয়ে সে পিটার্সবুর্গময় তার বন্ধুদের বলে বেড়াতে লাগল যে প্রিন্স ও গন্যমান্য ব্যক্তিটি উভয়েই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছে, কিন্তু সে দুজনইকেই ভালোবাসে বলে কারো মনে আঘাত দিতে ভয় পাচ্ছে।
ফলে সঙ্গে সঙ্গে পিটার্সবুর্গময় যে গুজবটা ছড়াল সেটা হেলেনের স্বামীর সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা নয়, কথাটা হল হতভাগিনী সুন্দরী হেলেন সন্দেহের দোলায় দুলছে যে দুজনের মধ্যে কাকে তার বিয়ে করা উচিত। কাজটা মোটেই সম্ভবপর কিনা সেটা আর এখন কোনো সমস্যা নয়, একমাত্র সমস্যা হচ্ছে কোন বিয়েটা অধিক বাঞ্ছনীয় এবং আদালত সেটাকে কি চোখে দেখবে। এক স্বামী জীবিত থাকতে পুনর্বিবাহ ভালো কি মন্দ তা নিয়ে সাধারণ মানুষ কোনো আলোচনাতেই গেল না, তারা বলতে লাগল, তোমার-আমার চাইতে জ্ঞানী গুণী লোকরা নিশ্চয়ই সে ব্যাপারের একটা মীমাংসা করে ফেলেছে, কাজেই এখন সে সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা মানেই নিজের নির্বুদ্ধিতা এবং সমাজে বসবাসের অনুপযুক্ততা প্রকাশ করা।
একমাত্র মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা আখসিমভাই সরাসরি একটা বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করে বসল। ভদ্রমহিলা পিটার্সবুর্গে এসেছে তার এক ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। একটা বল-নাচের আসরে হেলেনকে দেখতে পেয়ে তাকে ঘরের ঠিক মাঝখানে থামিয়ে সে রুক্ষস্বরে বলে উঠল : আজকাল দেখছি জীবিত পুরুষের স্ত্রীরাও আবার বিয়ে করছে! আপনি হয়তো ভাবছেন যে একটা নতুন কিছু করলেন। কিন্তু একথা লোকে অনেক আগেই ভেবেছে। সব বেশ্যালয়েই একাজ চলে। কথাকটি বলেই মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা ভয়-দেখানো ভঙ্গিতে হাতের আস্তিন গুটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সকলে মারিয়া দিমিত্রিয়েভনাকে ভয় করলেও পিটার্সবুর্গে তাকে একটি ভাঁড় বলেই মনে করা হয়। কাজেই সকলে তার কথা শুনলেও বিশেষ কোনো গুরুত্ব দিল না।
মেয়ের সঙ্গে দেখা হলেই প্রিন্স ভাসিলি তাকে বলে : হেলেন, তোমাকে একটা কথা বলার আছে, তাকে এককোণে টেনে নিয়ে যায়। কিছু কিছু কথা আমার কানে এসেছে…বুঝতেই পারছ। দেখ সোনা, তোমার ভালো শুনলে তোমার বাবার মনটা যে আনন্দে নেচে ওঠে তা তো তুমি জান…অনেক কষ্ট তুমি পেয়েছ…কিন্তু সোনা, নিজের মনের সঙ্গেই বোঝাপড়া করে নিও। এইটুকুই আমার বলার কথা। নিজের আবেগকে গোপন রেখে মেয়ের গালে গাল রেখে প্রিন্স ভাসিলি সেখান থেকে সরে গেল।
বিলিবিন হেলেনের সেইসব পুরুষ বন্ধুদের একজন যারা কখনো প্রেমিক হতে চায়নি। একটা ছোট ঘরোয়া বৈঠক সে একদিন তার মতামতটা হেলেনকে শুনিয়ে দিল।
হেলেন বলল, শোন বিলিবিন, শাদা আংটি-পরা আঙুলগুলি দিয়ে সে বিলিবিনের কোটের আস্তিন স্পর্শ করল। বোনের মতো ভেবেই আমাকে বলে দাও, আমার কি করা উচিত। দুজনের কাকে?
চোখের পাতায় ভাঁজ ফেলে বিলিবিন একটু চিন্তা করল, তার ঠোঁটে হাসি ফুটল।
বলল, তুমি তো জান এ বিষয়ে আমি একেবারে অপ্রস্তুত নই। সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে তোমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক অনেক ভেবেছি। কি জান, তুমি যদি প্রিন্সকে বিয়ে কর, সে একটি আঙুল বেঁকাল, তাহলে অপরটিকে বিয়ে করার সযোগ চিরদিনের মতো হারাবে, তাছাড়া, আদালতকেও অসন্তুষ্ট করবে। কিন্তু তুমি যদি বুড়ো কাউন্টটিকে বিয়ে কর তাহলে তার শেষের দিনগুলিকে তুমি সুখী করতে পারবে, এবং সেই মহাযানের বিধবা হলেও…প্রিন্স আন্দ্রুর তোমাকে বিয়ে করবে না। বিলিবিন তার কপালটা ঘষতে লাগল।
