তরুণী বিদেশীটি যেদিন প্রথম তাকে তিরস্কার করল সেইদিনই সুন্দর মাথাটি তুলে একটুখানি ঘুরে দৃঢ়স্বরে বলল : পুরুষের উপযুক্ত কথাটা বটে–যেমন স্বার্থপর, তেমনই নিষ্ঠুর! অন্য কিছু আমি আশাও করিনি। একটি নারী আপনার জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে, কষ্ট ভোগ করছে, আর তাই তার পুরস্কার! আমার অনুরাগ ও বন্ধুত্বের জবাবদিহি দাবি করবার কি অধিকার আপনার আছে সিয়? সেই মানুষটি আমার কাছে বাবার চাইতেও বেশি!
প্রিন্স কি যেন বলতে যাচ্ছিল, হেলেন তাকে বাধা দিল।
বলল, দেখুন, হতে পারে তিনি পিতৃসুলভ মনোভাব ছাড়াও আমার প্রতি অন্য কোনো মনোভাব পোষণ করেন, কিন্তু সেজন্য তো তার সামনে আমার বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিতে পারি না। আমি তো পুরুষ নই যে অকৃতজ্ঞতা দিয়ে দয়ার ঋণ শোধ করব! একটা কথা জেনে রাখুন মঁসিয়, আমার অন্তরে যেসব গভীর কথা আছে তার জন্য একমাত্র ঈশ্বর ও বিবেকের কাছেই আমি জবাবদিহি করে থাকি, আকাশের দিকে চোখ রেখে নিজের সুন্দর, উদ্ধত বুকের উপর হাত রেখে সে কথা শেষ করল।
কিন্তু ঈশ্বরের দোহাই, আপনি আমার কথাটাও শুনুন।
আমাকে বিয়ে কর, আমি তোমার দাস হয়ে থাকব!
কিন্তু সে তো অসম্ভব!
আমাকে বিয়ে করে আপনি নিজেকে ছোট করতে পারেন না, আপনি… হেলেন কেঁদে ফেলল।
প্রিন্স তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু হেলেন হতবুদ্ধির মতো কাঁদতে কাঁদতে বলল যে তার বিয়ের পথে তো কোনো বাধা থাকতে পারে না, এরকম ঘটনা তো আগেও ঘটেছে (তৎকালে এরকম ঘটনা খুব কমই ছিল, কিন্তু সে নেপোলিয়ন ও আরো কয়েকজন পদস্থ লোকের নাম করল), সে কখনো তার স্বামীর স্ত্রী হতে পারেনি, তাকে একেবারে বলি দেওয়া হয়েছে।
প্রায় বশংবদ হয়েই প্রিন্স বলল, কিন্তু আইন, ধর্ম…
আইন, ধর্ম…এই ব্যবস্থাটাই যদি তারা না করতে পারে তাহলে কিসের জন্য তাদের আবিষ্কার করা হয়েছে? হেলেন বলল।
এইরকম একটা সহজ কথা তার মনে আসেনি দেখে প্রিন্স অবাক হয়ে গেল, যীশু সমিতির পবিত্র দাদাদের কাছে সে পরামর্শ চাইল, তাদের সঙ্গে তার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল।
কয়েকদিন পরে হেলেন তার স্টোন আইল্যান্ডের পল্লীভবনে যে চমৎকার ভোজ-উৎসবের আয়োজন করল সেখানে এসে হাজির হল মঁসিয় দ্য যোবার্ত। যৌবনোত্তর এই মনোরম মানুষটির মাথাভর্তি বরফ-শাদা চুল, চোখ দুটি উজ্জ্বল কালো, পরনে ভ্রমণের পোশাক। আলোকিত বাগানে বাজনা শুনতে শুনতে যেসুইট ভদ্রলোকটি হেলেনকে বোঝাল ঈশ্বরের প্রতি, খৃস্টের প্রতি, পবিত্র অন্তরের প্রতি ভালোবাসার কথা, এবং এ জগতে ও পরলোকে একমাত্র ক্যাথলিক ধর্ম যে সান্ত্বনা দিতে পারে তার কথা। হেলেন অভিভূত হল, একাধিকবার তার চোখে এবং মঁসিয় দ্য যোবার্তের চোখে জল এল, তাদের গলা কাঁপতে লাগল। এমন সময় নৃত্য-সঙ্গীটি এসে পড়ায় হেলেনের ভবিষ্যৎ বিবেক-রক্ষকের সঙ্গে আলোচনায় ছেদ পড়ল, কিন্তু পরদিন সন্ধ্যায় সিয় দ্য যোবাৰ্ত আবার এল হেলেনের সঙ্গে নিভৃতে দেখা করতে, এবং তারপরে প্রায়ই আসতে লাগল।
একদিন সে কাউন্টেসকে একটা রোমান ক্যাথলিক গির্জায় নিয়ে গেল, সেখানে সে বেদীর সামনে নতজানু হয়ে বসল। মধ্যবয়সী মনোরম ফরাসি ভদ্রলোকটি তার মাথায় হাত রাখল, আর-পরবর্তীকালে হেলেনই বলেছে–তার মনে হল একটা মৃদু হাওয়া যেন তার অন্তরকে স্পর্শ করল। তাকে বলা হল যে এটাই মহতী করুণা।
তারপরে একজন লম্বা ফ্রক-পরা পাদরিকে তার কাছে আনা হল। তার কাছে হেলেন সব অপরাধের কথা বলল, আর পাদরিও তাকে সব পাপ থেকে মুক্তি দিল। কয়েকদিন পরেই হেলেন জেনে খুশি হল যে আসল ক্যাথলিক গির্জায় তাকে ভর্তি করে নেওয়া হয়েছে, আর কয়েকদিনের মধ্যেই পোপ স্বয়ং তার কথা শুনতে পাবে এবং তাকে একটা বিশেষ দলিল পাঠিয়ে দেবে।
কিন্তু চাতুরির খেলায় যেমন সর্বদাই ঘটে থাকে যে একজন বোকাও চতুরতর লোকের উপর টেক্কা মারে, তেমনই হেলেনও বুঝতে পারল যে এসব কিছুরই প্রধান উদ্দেশ্য হল তাকে ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত করে যেসুইট প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্য অর্থ আদায় করা, আর তাই সেও জিদ ধরে বসল যে টাকা-পয়সা দেবার আগেই স্বামীর কাছে থেকে তাকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি নেওয়া হোক। তার মতে, মানুষের কামনা-বাসনাকে পরিতুষ্ট করে কতকগুলি সম্পত্তি রক্ষা করাই হল সব ধর্মের লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যকে মনে রেখেই একদা তার ধর্ম-পিতার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে সে প্রশ্ন করে বসল, তার বিয়েটা তার পক্ষে কতটা বাধ্যতামূলক?
গোধূলির আলোয় তারা দুজন বসে ছিল বৈঠকখানার জানালার ধারে। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে ফুলের গন্ধ। হেলেন যে শাদা পোশাকটি পরে আছে তার ভিতর দিয়ে তার কাঁধ ও বুক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভালো ভালো খাওয়া-পরার ফলে পাদরিটির চেহারার বেশ গোলগাল, চিবুকটি পরিষ্কার করে কামানো, মনোরম কঠিন মুখ, দুইখানি শাদা হাত হাঁটুর উপর ভাঁজ করা, সে হেলেনের খুব কাছাকাছি বসেছে, ঠোঁটে ফুটে উঠেছে সূক্ষ্ম হাসির রেখা, শান্ত ও সানন্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে হেলেনের রূপ, আর আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে নিজের মতামত বোঝাতে বোঝাতে মাঝে মাঝেই তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। হেলেনও একটা অস্বস্তিকর হাসির সঙ্গে তাকিয়ে আছে তার কোঁকড়া চুল ও পরিষ্কার করে কামানো ফোলা-ফোলা ঈষৎ কৃষ্ণাভ থুতনির দিকে, আর প্রতিমুহূর্তেই আশা করছে যে আলোচনাটা একটা নতুন মোড় নেবে। কিন্তু সঙ্গিনীটির রূপ-সুধা পান করতে থাকলেও পাদরিটি কিন্তু নিজের আলোচনার মধ্যেই ডুবে রইল।
