তারা চলে গিয়েছিল কারণ মস্কোতে ফরাসি শাসন চললে অবস্থা ভালো হবে কি মন্দ হবে সে প্রশ্নই তাদের মনে আসেনি। ফরাসি শাসনাধীনে থাকার প্রশ্নই ওঠে না, সেটাই তো সবচাইতে শোচনীয় অবস্থা। বরদিনোর যুদ্ধের আগেই তারা চলে গিয়েছিল, যুদ্ধের পরে তো তাদের গতি আরো বেড়ে গিয়েছিল, যদিও রস্তপচিন মস্কোর রক্ষার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেছিল যে আইবেরিয় ঈশ্বর-জননীর অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেবমূর্তিকে সঙ্গে নিয়েই যুদ্ধযাত্রা করা হবে, এমন একটা বেলুন আকাশে ওড়ানো হবে যা ফরাসিদের ধ্বংস করে ফেলবে, এছাড়া আরো অনেক আজেবাজে কথাই তার ইস্তাহারে লেখা হয়েছিল। তারা জানত যুদ্ধ যা করবার সৈন্যরাই করবে, আর তারা যদি সফল না হয় তাহলে তরুণী মহিলাদের ও গৃহভৃত্যদের মস্কোর তিন পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করালে তাতে কোনো লাভ হবে না, কাজেই তাদের সব বিষয়-সম্পত্তি শত্রুর হাতে ফেলে যেতে যত দুঃখই হোক, যেতে তাদের হবেই। এত বড় একটা সম্পদশালী নগরীকে ধ্বংস হবার জন্য শত্রুর হাতে ফেলে যাবার ভয়ংকর তাৎপর্যের কথা তারা একবারও ভাবল না, কারণ কাঠের অট্টালিকায় সমৃদ্ধ এত বড় একটা নগরী শত্রুর হাতে পরিত্যক্ত হলে তাকে তো অতি অবশ্যই পুড়িয়ে ফেলা হবে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিচার-বিবেচনা মতোই চলে গেল, অথচ তারা চলে গিয়েছিল বলেই এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে পেরেছিল যেটা চিরকালের মতো রুশ জনগণের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবের স্মারক হয়ে থাকবে। পাছে কাউন্ট রস্তপচিনের হুকুমে আটকা পড়ে যেতে হয় এই ভয়ে যে মহিলাটি জুন মাসেই তার নিগ্রো দাসদাসী ও নারী-ভড়াদের সঙ্গে নিয়ে এই ভেবে মস্কো থেকে তার সরাতভ জমিদারিতে চলে গিয়েছিল যে সে তো নেপোলিয়নের চাকরানি নয়, আসলে কিন্তু সেই মহিলাটি সত্যি সত্যি এমন একটা মহৎ কর্ম করেছিল যার ফলে বেঁচে গিয়েছিল সারা রাশিয়া দেশটা। আর কাউন্ট রস্তপচিন তো এই যারা মস্কো ছেড়ে যাচ্ছে তাদের ঠাট্টা করছে, আবার নিজেই সরকারি আপিস সরিয়ে নিচ্ছে, একবার যত রাজ্যের মাতালদের ধরে এনে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে যত সব অকেজো অস্ত্রশস্ত্র, আবার দেবমূর্তিসহ শোভাযাত্রা বের করছে, নয় তো ফাদার অগাস্তিনকে দেবমূর্তি এবং সন্তদের স্মৃতিচিহ্ন সরাতে নিষেধ করছে, মস্কোর সব ব্যক্তিগত গাড়ি আটক করে যে স্মৃতিচিহ্ন সরাতে নিষেধ করছে, মস্কোর সব ব্যক্তিগত গাড়ি আটক করে যে বেলুনটা লেপপিচ তৈরি করছে, একশো ছত্রিশটা গাড়িতে করে সেটাকে বয়ে আনছে, কখনো বা মস্কোতে আগুন ধরিয়ে দেবার ইঙ্গিত করে বলছে যে সে তার নিজের বাড়িতে আগুন ধরিয়েছে, কখনো বা তার অনাথ আশ্রমটি ধ্বংস করার জন্য তীব্র নিন্দা করে ফরাসিদের কাছে চিঠি লিখছে, আবার কখনো মস্কো পুড়িয়ে দেবে বলে বড়াই করে পরক্ষণেই সে কাজের নিন্দা করছে, কখনো হুকুম দিচ্ছে সব গুপ্তচরদের তার কাছে এনে হাজির করা হোক, আবার কখনো সেকাজ করার জন্য লোকজনদের তিরস্কার করছে, একবার সব ফরাসি অধিবাসীদের মস্কো থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে, আবার মস্কোতে গোটা ফরাসি উপনিবেশের কেন্দ্রমণি মাদাম অবার্ত চামেকে থাকবার অনুমতি দিচ্ছে, কিন্তু পরক্ষণেই শ্রদ্ধেয় প্রবীণ পোস্টমাস্টার ক্লিউচারভেকে বিনা দোষে গ্রেপ্তার করে নির্বাসিত করার হুকুম দিচ্ছে, এই ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য লোকজনদের তিন পাহাড়ে সমবেত করছে, আবার একটি লোককে খুন করবার জন্য তাদের হাতে তুলে দিয়ে পিছনের ফটক দিয়ে নিজেই সরে পড়ছে, একবার ঘোষণা করছে যে মস্কোর পতন হলে সেও আর বেঁচে থাকবে না, আবার যুদ্ধের ব্যাপারে তার নিজের মনোভাব নিয়ে অ্যালবামে কবিতা লিখছে ফরাসি ভাষায় (জন্মেছিলাম তাতার হয়ে/হতে চেয়েছিলাম রোমান/ফরাসিরা আমাকে বলত বর্বর,/আর রুশরা–জর্জেস দা)-(জর্জেস দা মলিয়েরের নাটকের একটি প্রধান চরিত্র)–কি যে ঘটছে তার কিছুই এই লোকটি বুঝত না, সে শুধু চাইত এমন কিছু করতে যাতে লোককে অবাক করে দেওয়া যায়, চাইত দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজ করতে, ছোট ছেলের মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনিবার্য ঘটনা নিয়ে ছেলেখেলা করতে–মস্কো ত্যাগ করে তাকে জ্বালিয়ে দিতে–আর সর্বদা চেষ্টা করত তার দুর্বল হাতে জনমতের প্রচণ্ড স্রোতকে কখনো দ্রুততর করতে, আবার কখনো আটকে দিতে, অথচ নিজেই ভেসে যেত সেই স্রোতের টানে।
.
অধ্যায়-৬
দরবারের সঙ্গে ভিলনা থেকে পিটার্সবুর্গে ফিরে হেলেন খুবই কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ল। পিটার্সবুর্গে থাকতে সাম্রাজ্যের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত জনৈক গণমান্য ব্যক্তির বিশেষ অনুগ্রহ সে পেত। ভিলনাতে থাকার সময় একজন তরুণ বিদেশী প্রিন্সের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। সে যখন পিটার্সবুর্গে ফিরে এল তখন সেই গণ্যমান্য ব্যক্তিটি এবং প্রিন্স দুজনই সেখানে উপস্থিত, আর দুইজনই নিজ নিজ অধিকারে অটল। হেলেনের সামনে দেখা দিল নতুন সমস্যা-কাউকে আঘাত না দিয়ে কেমন করে দুজনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা যায়।
অন্য যে কোনো নারীর পক্ষে যেটা কঠিন, এমন কি অসম্ভব বলে মনে হতে পারত, কাউন্টেস বেজুখভা কিন্তু তাতে মোটেই বিচলিত বোধ করল না, অত্যন্ত চতুরা নারী হিসেবে তার যে খ্যাতি আছে সেটা আকরণে নয়। সে যদি লুকোছাপা করত, অথবা কৌশলে এই অসুবিধাজনক অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চাইত, তাহলে পরোক্ষে নিজের দোষ স্বীকার করে সে নিজেরই বিপদ ডেতে আনত। কিন্তু যে কোনো মহাপুরুষের মতোই হেলেনও খুশি মতো কাজ করতে পারে, তাই সে এমন একটা ভাব দেখাতে শুরু করল যেন সে ঠিক কাজই করছে, আর দোষ যা কিছু তা অন্যরা করছে।
