আলোচনা শুরু হল। বেনিংসেন তখন ভাবেনি যে খেলায় তার হার হয়েছে। ফিলিতে একটা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ যে অসম্ভব বার্কলে ও অন্যান্যদের এই অভিমত স্বীকার করে নিয়েও রুশ দেশপ্রেম ও মস্কো-প্রীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে প্রস্তাব করল, রাতারাতি সৈন্যদের ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক, আর পরদনি ফরাসিদের দক্ষিণ ব্যুহকে আক্রমণ করা হোক। দেখা দিল মতবিরোধ, স্বপক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি দেখানো হল। সবকিছু দেখে শুনে মলাশা কিন্তু পরিষদ কথাটার একটা ভিন্ন অর্থই বুঝল। তার মনে হল এটা যেন বুড়ো দাদু ও লম্বাকোটের (অর্থাৎ বেনিংসেনের) মধ্যে একটা ব্যক্তিগত ঝগড়ামাত্র। কথা বলতে বলতে তারা পরস্পরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠছে, অবশ্য মনে মনে সে বুড়ো দাদুর পক্ষেই রইল।
কুতুজভ বলল, দ্ৰজন, কাউন্টের এই পরিকল্পনা আমি সমর্থন করতে পারি না। শত্রুপক্ষের খুব কাছাকাছি থেকে সৈন্য পরিচালনা করাটা সবসময়ই বিপজ্জনক, সামরিক ইতিহাসে এই মতের সমর্থন মিলবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ… দৃষ্টান্তের খোঁজে কুতুজভ একটু থেমে কিছু ভাবল, তারপর বেনিংসেনের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ, হয়েছে, ফ্রিডল্যান্ডের যুদ্ধের কথাই ধরা যাক, কাউন্টের নিশ্চয় স্মরণ আছে যে সে যুদ্ধটা…যে পুরোপুরি সফল হয়নি তার একমাত্র কারণ আমাদের সৈন্যকে নতুন করে সাজানো হয়েছিল শত্রুপক্ষের বড় বেশি নিকটে…
তারপর ক্ষণিকের নীরবতা, কিন্তু সকলেরই মনে হল সে নীরবতা বড়ই দীর্ঘ। আলোচনা নতুন করে শুরু হল, কিন্তু মাঝে মাঝেই থেমে গেল, সকলেই বুঝল যে আর বেশি কিছু বলার নেই। একটা বিরতির সময় যেন কথা বলার জন্য প্রস্তুত হতেই কুতুজভ বড় করে একটা শ্বাস টানল। সকলে তার দিকে তাকাল।
দেখুন ভদ্ৰজন, দেখছি যে ভাঙা বাসনপত্রের দাম আমাকেই দিতে হবে। কথাটা বলে সে ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ভদ্রজন, আপনাদের অভিমত শুনলাম। আপনারা কেউ কেউ আমার সঙ্গে একমত হবেন না। কিন্তু আমার সরকার ও আমার দেশ আমাকে যে কতৃত্ব দিয়েছে তার বলে আমি পশ্চাদপসরণের হুকুম দিলাম।
একথার পরে যে গাম্ভীর্য ও নীরবতার সঙ্গে সেনাপতিরা সেখান থেকে সরে পড়তে লাগল তা দেখে মনে হল যেন একটা শোকযাত্রা শেষ হয়েছে।
মলাশা অনেকক্ষণ থেকেই রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিল, উনুনের পিছন দিক দিয়ে সতর্কভাবে নেমে সেনাপতিদের পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে সে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সেনাপতিদের বিদায় দিয়ে টেবিলের উপর কনুই দুটো রেখে কুতুজভ অনেকক্ষণ বসে রইল, তার মনে সেই একই ভয়ংকর চিন্তা : কখন, কখন মস্কো ছেড়ে যাওয়াটা অনিবার্য হয়ে উঠল? এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা কখনো নেওয়া হল? এজন্য কে দোষী?
অনেক রাতে অ্যাডজুটান্ট শ্লিদার এলে তাকে বলল, আমি তো এটা আশা করিনি, এরকম যে ঘটবে তা তো ভাবিনি।
আপনার একটু বিশ্রাম নেওয়া উচিত প্রশান্ত মহামহিম, শিদার বলল।
কিন্তু না! তুর্কিদের মতো এখনো যে তাদের ঘোড়ার মাংস খাওয়াটা বাকি আছে? মোটামুঠি দিয়ে টেবিলের উপর সজোরে আঘাত করে কুতুজভ সোচ্চারে বলে উঠল। তাই তাদের খেতে হবে, শুধু যদি…
.
অধ্যায়-৫
ঠিক সেই সময়ে বিনাযুদ্ধে পশ্চাদপসরণের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে, অর্থাৎ মস্কো থেকে লোকাপসরণ ও মস্কো-দহন যখন চলছে সেই ঘটনার মূল উস্কানিদাতা হয়েও রস্তপচিনের আচরণ কিন্তু তখন চলেছে কুতুজভ থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত পথে।
বরদিনোর যুদ্ধের পরে বিনাযুদ্ধে মস্কো থেকে সৈন্য অপসারণ যেমন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, ঠিক ততখানি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল মস্কো পরিত্যাগ ও মস্কো-দহন।
কোনোরকম যুক্তি দিয়ে নয়, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে এবং আমাদের পিতৃপুরুষের মধ্যে যে অনুভূতি নিহিত রয়েছে তার অনুপ্রেরণাতেই প্রতিটি রুশ এটা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত।
মস্কোতে যা ঘটেছে স্মোলেনস্ক থেকে শুরু করে রাশিয়ার সব শহরে ও গ্রামেও তাই ঘটেছে, অথচ রস্তপচিন তার ইস্তাহার নিয়ে কোথাও যুদ্ধে নামেনি। নিরাসক্তভাবেই সাধারণ মানুষ শত্রুর জন্য অপেক্ষা করেছে, কোনোরকম হাঙ্গামা করেনি বা পরস্পর খেয়োখেয়ি করেনি, সংকট-মুহূর্তেও ভাগ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। শত্রু কাছাকাছি এসে পড়লেই ধনীরা বিষয়-সম্পত্তি ফেলে পালিয়েছে আর গরীবরা সেখানেই থেকে গেছে এবং যা কিছু ছিল সব পুড়িয়ে দিয়েছে, ধ্বংস করেছে।
এটাই যে ঘটবে, চিরকালই ঘটবে, প্রতিটি রুশ মানুষের মনে সেই ধারণাই ছিল এবং আজও আছে। এই চেতনা এবং মস্কো বেদখল হবার একটা আশংকা ১৮১২ সালের মস্কোর রুশ সমাজের মনে ছিল। জুলাইতে এবং অগস্টের শুরুতে যারা মস্কো ছেড়ে চলে গিয়েছিল তারাই প্রমাণ করেছে যে এরকম একটা আশংকা তাদের ছিল।
তাদের বলা হয়েছিল, বিপদ থেকে পালিয়ে যাওয়া লজ্জার ব্যাপার, একমাত্র ভীরুরাই মস্কো থেকে পালাচ্ছে। রস্তপচিন তার সৈন্যদের বুঝিয়েছে যে মস্কো ছেড়ে যাওয়াটা লজ্জার ব্যাপার। ভীরু বদনাম নিতে তারা লজ্জা বোধ করত, মস্কো ছেড়ে যেতে তারা লজ্জা পেত, তবু তারা মস্কো ছেড়ে গিয়েছিল কারণ তারা জানত যে তাছাড়া উপায় নেই। কেন তারা গেল? একথা মনে করা অসম্ভব যে বিজিত দেশসমূহে নেপোলিয়ন যে ত্রাসের সঞ্চার করেছে তার বিবরণ শুনিয়ে রস্তপচিন তার সৈন্যদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সর্বপ্রথম যারা মস্কো ছেড়ে চলে গিয়েছিল তারা সকলেই শিক্ষিত ও ধনী মানুষ, তারা তো ভালো করেই জানত যে ভিয়েনা ও বার্লিন এখনো অক্ষতই রয়েছে, নেপোলিয়নের দখলে থাকার সময় সেখানকার অধিবাসীরা তো মনোহর ফরাসিদের সঙ্গে মিলেমিশে বেশ মনের সুখেই দিন কাটিয়েছে, রুশরা, বিশেষ করে রুশ মহিলারা তো তখন ফরাসিদের খুবই পছন্দ করত।
