বেনিংসেন রুশ দেশপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে তখনো মস্কো রক্ষার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। তার উদ্দেশ্যটা কিন্তু কুতুজভের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার : প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি ব্যর্থ হয় তাহলে বিনা যুদ্ধে সেনাবাহিনীকে স্প্যারো হিলস পর্যন্ত নিয়ে আসার সব দোষ কুতুজভের মাথায় চাপিয়ে দেবে, যদি সফল হয় তাহলে কৃতিত্বটা সে নিজেই দাবি করবে, আর যদি যুদ্ধটা একেবারেই না হয় তাহলে মস্কো ছেড়ে যাবার অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখবে। কিন্তু সে ষড়যন্ত্রের কথা এখন বুড়ো মানুষটার মনে স্থান পেল না।
একটিমাত্র ভয়ংকর প্রশ্ন তার মনকে আচ্ছন্ন করে আছে, কিন্তু কারো কাছ থেকেই সে প্রশ্নের জবাব সে শুনতে পায়নি। তার প্রশ্নটি হল : সত্যি কি আমিই নেপোলিয়নকে মস্কো আসতে দিয়েছি, কিন্তু সে কখনো? কখন সে সিদ্ধান্ত নিলাম? গতকাল যখন প্রাতভকে পিছু হটবার হুকুম দিয়েছিলাম, তখন কি? অথবা আগের দিন সন্ধ্যায় যখন বেনিংসেনকে হুকুম জারি করতে বলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তখন? নাকি আরো আগে?…এই ভয়ংকর ব্যাপারটা কখন স্থির হয়েছিল? মস্কো ছেড়ে চলে যেতেই হবে। সেনাবাহিনীকে পিছু হঠতে হবেই। আর সে হুকুম দিতেই হবে। কিন্তু এই ভয়ংকর হুকুম দেওয়া তো সেনাবাহিনীর অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করারই সামিল। কিন্তু তা তো করা যায় না। তার দৃঢ় বিশ্বাস একমাত্র সেই পারবে রাশিয়াকে রক্ষা করতে, আর তাই সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং জনগণের ইচ্ছায় তাকে প্রধান সেনাপতি মনোনীত করা হয়েছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এই কঠিন পরিস্থিতিতে একমাত্র সেই পারে সেনাবাহিনীকে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে এবং সারা বিশ্বে একমাত্র সেই পারে নির্ভয়ে অপরাজেয় নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, আর তাই সেই হুকুমটা জারি করার কথা ভাবতেই সে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটা কিছু তো করতেই হবে, আর তার চারদিকের আলোচনা যেরকম নিরঙ্কুশ হয়ে উঠছে তাতে এখনই এসব থামাতে হবে।
কয়েকজন জাদরেল সেনাপতিকে সে কাছে ডাকল।
ভালো হোক মন্দ হোক আমার মাথাটাকে নিজের উপরেই নির্ভর করতে হবে। বেঞ্চি থেকে উঠে এই কথা বলে সে ফিলির দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, সেখানেই তার গাড়ি অপেক্ষা করছে।
.
অধ্যায়-৪
আন্দ্রু সাভস্তিরানভের কুঁড়েঘরের একটা অপেক্ষাকৃত ভালো ও বড় অংশে দুটোর সময় সমর-পরিষদের সভা বসল। মস্ত বড় চাষী-পরিবারের পুরুষ, নারী ও বাচ্চারা বারান্দার ওপারে পিছনের ঘরটাতে ভিড় করল। শুধু আর ছয় বছরের নাতনি-প্রশান্ত মহামহিম নিজেই যার পিছে হাত বুলিয়ে দিয়েছে এবং চা খাবার সময় যাকে একটুকরো চিনিও দিয়েছে-সেই মলাশা রইল বড় ঘরটার ইটের উনুনের উপর। উনুনটার উপর থেকেই মলাশা সলজ্জ আনন্দের সঙ্গে সেনাপতিদের মুখ, ইউনিফর্ম ও নানারকম সম্মান-ভূষণের দিকে তাকাতে লাগল, তারা সকলেই ঘরের কোণে দেবমূর্তির নিচে চওড়া বেঞ্চিগুলোতে বসেছে। আর বুড়ো দাদু স্বয়ং মলাশা মনে মনে কুতুজভকে ওই নামেই ডাকে–আলাদা হয়ে বসেছে উনুনের পিছনে অন্ধকারের মধ্যে। একটা ভাঁজ–করা হাতল-চেয়ারে সে একেবারে ডুবে বসেছে, অনবরত গলা ঝাড়ছে, আর বোম খোলা কলারটা টানছে। যারা ঘরে ঢুকছে তারাই একে একে ফিল্ড-মার্শালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সে কারো হাতটা চেপে ধরছে, আবার কারো দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছে। তার অ্যাডজুটান্ট কেসারভ কুতুজভের সামনেকার জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে রেগে হাতটা নাড়াতেই কেসারভ বুঝতে পারল প্রশান্ত মহামহিম চান না যে তার মুখটা দেখা যাক।
একে একে সভায় হাজির হল-এর্মোলাভ, কোরভ ও তল, সকলের সামনে কসেছে বার্কলে দ্য তলি। তার গলায় ঝুলছে সেন্ট জর্জের ক্রশ, মুখটা ম্লান ও অসুস্থ, দুদিন যাবৎ জ্বর হচ্ছে, এখানে শীতে কাঁপছে। তার পাশেই উভরভ ও ছোটখাট দখতুরভ। অপরদিকে বসে আছে কাউন্ট অস্তারম্যান তলস্তয়, নিজের চিন্তায়ই মগ্ন। রায়েভস্কি একবার কুতুজভের দিকে একবার দরজার দিকে অধৈর্য হয়ে তাকাচ্ছে। কনভনিৎসিনের মুখে একটা নরম ধূর্ত হাসি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট মলাশার মুখেও হাসি দেখা দিল।
সকলেই বেনিংসেনের জন্য অপেক্ষা করছে। ঘাটি-পরিদর্শনের অজুহাতে সে আচ্ছা খানাটা শেষ করতে ব্যস্ত রয়েছে। চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত সকলে তার জন্য অপেক্ষা করল, কোনোরকম আলোচনা শুরু হল না।
বেনিংসেন কুঁড়েঘরে ঢুকলে তবে কুতুজভ তার কোণটা ছেড়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে এল, কিন্তু পাছে মোমবাতির আলো মুখে পড়ে তাই বেশি কাছে এল না।
একটি প্রশ্ন দিয়েই বেনিংসেন পরিষদের সভা শুরু করল : আমরা কি বিনা যুদ্ধের রাশিয়ার প্রাচীন ও পবিত্র রাজধানী ছেড়ে যাব, না কি তাকে রক্ষা করব? অনেকক্ষণ সকলেই চুপচাপ। সকলেরই মুখ ভ্রূকুটিকুটিল, শুধু কুতুজভের ঘোৎ ঘোৎ শব্দ ও কাশির দমক সে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছে। সকলের চোখই তার উপর নিবদ্ধ। মলাশাও বুড়ো দাদুর দিকে তাকাল।
বেনিংসেনের কথাগুলির ক্রুদ্ধ প্রতিধ্বনি করে হঠাৎ সে বলে উঠল, রাশিয়ার প্রাচীন ও পবিত্র রাজধানী। আপনার অনুমতি নিয়ে আমি বলতে চাই ইয়োর এক্সেলেন্সি যে একজন রুশের কাছে এ প্রশ্নের কোন অর্থই নেই। (শরীরটাকে সে সামনের দিকে একটু ঝুঁকিয়ে দিল।) এ প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে না, এটা অর্থহীন। যে প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনার জন্য এই ভদ্রলোকদের এখানে ডেকেছি সেটা সামরিক প্রশ্ন। রাশিয়াকে রক্ষা করার প্রশ্ন। বিনা যুদ্ধে মস্কো ছেড়ে দেওয়াই ভালো, না কি একটা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে সেনাবাহিনী এবং মস্কো দুটোই হারাবার ঝুঁকি নেওয়া ভালো? সেই প্রশ্ন সম্পর্কে আমি আপনার অভিমত চাই। কুতুজভ আবার চেয়ারে ডুবে গেল।
