সামরিক পণ্ডিতরা বলে থাকেন, ফিলি পৌঁছবার আগেই তার সেনাদলকে কালুগা রোডে সরিয়ে নেওয়াই কুতুজভের উচিত ছিল, কেউ নাকি সেরকম প্রস্তাবও তার কাছে করেছিল। কিন্তু একজন প্রধান সেনাপতির কাছে তো একটি মাত্র প্রস্তাব থাকে না, থাকে ডজনখানেক প্রস্তাব, বিশেষ করে কোনো সংকট-কালে তো কথাই নেই। আবার সেসব প্রস্তাবও সমর-কৌশলের দিক থেকে পরস্পরবিরোধীই হয়ে থাকে।
মনে হতে পারে যে সেই সব প্রস্তাবের ভিতর থেকে একটি বেছে নেওয়াই প্রধান সেনাপতির কাজ। কিন্তু তাও সে করতে পারে না। ঘটনা ও সময় তো বসে থাকে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ২৮ তারিখে তাকে বলা হল যে কালুগা রোড পার হয়ে যাওয়া হোক, কিন্তু ঠিক সেইমুহূর্তে একজন অ্যাডজুটান্ট মিলরাদভিচ থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জানতে চাইল, সে ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না পিছু হটে যাবে। সেইমুহূর্তেই তাকে একটা জবাব দিতে হবে। আর পশ্চাদপসরণের নির্দেশ দেওয়া মানেই কালুগা রোড পার হয়ে সরে যাওয়া। সেই অ্যাডজুটান্টের পরেই রসদ-সরবরাহ-অধ্যক্ষ এসে শুধাল, খাদ্য-ভাণ্ডারকেও সঙ্গে নেওয়া হবে কিনা, হাসপাতালের প্রধান এসে জানতে চাইল, আহতদের কোথায় রাখা হবে, সংবাদবাহক পিটার্সবুর্গ থেকে সম্রাটের যে চিঠি নিয়ে এল তাতে দেখা গেল মস্কো ছেড়ে যাওয়া অসম্ভব, প্রধান সেনাপতির যে প্রতিদ্বন্দ্বীটি সব সময় তাকে প্যাঁচে ফেলতে চেষ্টা করছে (মাত্র একটি নয়, সেরকম লোক বেশ কয়েকজন আছে) সে এমন একটা নতুন পরিকল্পনা এনে হাজির করল যেটা কালুগা রোডের দিকে যাবার সম্পূর্ণ বিপরীত, তাছাড়া নিজের শক্তি বজায় রাখবার জন্য প্রধান সেনাপতির নিজেরও তো আহার-নিদ্রার প্রয়োজন আছে। আছে আরো হরেক রকম ঝামেলা। একজন মাননীয় সেনাপতি এসে পুরস্কার-বিতরণের ব্যাপারে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে নালিশ জানাল, জেলার অধিবাসীরা তাদের জন্য রক্ষা-ব্যবস্থার আবেদন করল, স্থানীয় অঞ্চল পরিদর্শন করে এসে জনৈক ইন্সপেক্টর যে প্রতিবেদন পেশ করল সেটা পূর্ববর্তী আর এক অফিসারের প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিপরীত, আর পর্যবেক্ষণরত গুপ্তচর কয়েদি, ও সেনাপতি এসে শত্রুপক্ষের সেনাদলের অবস্থানের ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দাখিল করল। একজন প্রধান সেনাপতির কাজের সমালোচনা করার সময় সাধারণ মানুষ এইসব অনিবার্য পরিস্থিতিকে ভুল বোঝে, অথবা ভুলেই যায়। তাই তারা বলতে পারে যে ১লা সেপ্টেম্বর তারিখে প্রধান সেনাপতি স্বাধীনভাবেই স্থির করতে পারত মস্কো ত্যাগ করে যাওয়া হবে, না তাকে রক্ষা করা হবে। অথচ মস্কো থেকে চার মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত রুশ বাহিনীর সামনে সে রকম কোনো প্রশ্নই ছিল না। সে প্রশ্নের মীমাংসা হল কখন? দ্রিসাতে, স্মোলেনঙ্কে সবচাইতে স্পষ্টভাবে ২৪শে অগস্ট শেভার্দিনোতে আর ২৪ তারিখে বরদিনোতে এবং বরদিনো থেকে ফিলিতে পশ্চাদপসরণের কালে প্রতিটি দিনে, প্রতিটি ঘণ্টায় ও প্রতিটি মিনিটে।
.
অধ্যায়-৩
কুতুজভ এমোলভকে পাঠিয়েছিল ঘাঁটি পরিদর্শনে, সে যখন ফিরে এসে ফিল্ড-মার্শালকে জানাল যে মস্কোর আগে সেখানে যুদ্ধ করা অসম্ভব, তাদের পশ্চাদপসরণ করতেই হবে, তখন কুতুজভ নীরবে তার দিকে তাকাল।
তোমার হাতটা দাও তো, বলে তার নাড়ি দেখে কুতুজভ বলল, তুমি তো সুস্থ নও হে। কি বলছ ভালো করে ভেবে দেখ।
বিনা যুদ্ধে মস্কো থেকে পিছু হটে যাবার সম্ভাবনাকে কুতুজভ মেনে নিতে পারল না।
মস্কোর দর্গমিলভ ফটক থেকে চার মাইল দূরবর্তী পকলোনি পাহাড়ের উপর কুতুজভ গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল। সেনাপতিদের এক বড় দল তাকে ঘিরে ধরল, মস্কো থেকে এসে কাউন্ট রস্তপচিন তাদের সঙ্গে যোগ দিল। দলে দলে ভাগ হয়ে তারা বর্তমান পরিস্থিতির সুবিধা ও অসুবিধা, সেনাদলের অবস্থা, বিভিন্ন পরিকল্পনা, মস্কোর অবস্থা, এবং সাধারণভাবে যুদ্ধসংক্রান্ত সমস্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। যদিও এই উদ্দেশ্যে তাদের ডাকা হয়নি, যদিও কোনো সভাও ডাকা হয়নি, তবু তাদের সকলেরই এটাকে একটা সমর-পরিষদ বলেই মনে হল। সবকিছু নিয়েই প্রকাশ্য আলোচনা চলল। কেউ কোনো ব্যক্তিগত সংবাদ দিলে বা চাইলে তা ফিসফিস করে শেষ করেই আবার সাধারণ আলোচনায় ফিরে গেল। কারো মুখে তামাশার কথা নেই, উচ্চহাসি নেই, এমন কি মৃদু হাসিও নেই। অবস্থানুযায়ী সকলেই বেশ গম্ভীর। আলোচনার সময় বিভিন্ন দল প্রধান সেনাপতির বেঞ্চিটার কাছাকাছিই রইল, যাতে সব কথা সে শুনতে পায়। প্রধান সেনাপতিও মন দিয়ে তাদের কথা শুনতে লাগল, মাঝে মাঝে তাদের কথাগুলি আবার বলতে লাগল, কিন্তু নিজে কোনো আলোচনায় অংশ নিল না, অথবা কোনো মতামতও প্রকাশ করল না।…কুতুজভের মুখের ভাব ক্রমেই গম্ভীর ও বিষণ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। এইসব আলোচনা থেকে একটা কথাই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল : একেবারে আক্ষরিক অর্থেই মস্কো রক্ষা করা অসম্ভব, অর্থাৎ কোনো বুদ্ধিহীন সেনাপতি যদি যুদ্ধের হুকুম দেয় তাহলে গোলমালের সৃষ্টি হবে, কিন্তু যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধে জয়লাভ করা অসম্ভব জেনেও সেনাপতি কেমন করে তাদের সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাবে। যদিও বেনিংসেন তখনো মঙ্কো রক্ষার পক্ষপাতী এবং অন্যরা তাই নিয়ে আলোচনা করছে, তবু সমস্যাটা বিরোধ ও ষড়যন্ত্রের একটা অজুহাত ছাড়া আর কিছুই নয়। কুতুজভ সেটা ভালোই জানে।
